kalerkantho

ধর্মের ভাই ধর্মের বাপ

নাসিমা আনিস

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ধর্মের ভাই

ধর্মের বাপ

অঙ্কন : মানব

বাল্যে কি কৈশোরে তাকে আমরা ভাই সম্বোধন করিনি তো! এখন করছি, বস্তুত তার মৃত্যুর কিছুকাল আগে থেকে ভাই সম্বোধনে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। তার আগে আমরা কিছু বছর কিছুই ডাকিনি, তার আগে ফজল, শুধুই ফজল। যে মায়ের রান্না করে, বাবার শখের গরু পালে, ভুলচুক হলে যাকে বাবা অকথ্য গালাগাল করতে পারে, তাকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভাই ডাকার কোনো কারণ আমাদের তখন মনেই আসেনি! বাল্যে কি কৈশোরে ফজল ভাই না বলার জন্য দায়ী আমাদের অভিভাবকদ্বয়, তাঁরা বলেননি সে আমাদের বাড়ির কাজের সাহায্যকারী হলেও বয়োজ্যেষ্ঠ, তাকে ভাই ডাকা কর্তব্য। ফজল ভাই নিজে যখন নানা হয়ে গেছে, তারও বহুকাল আগে আমাদের অভিভাবকদের ছত্রচ্ছায়া থেকে নব্বই ভাগ মুক্ত হয়েছে, তখন সে তারই মতো কারো মারফত মনোবেদনার কথা জানিয়েছিল। যে এ সংবাদ বয়ে এনেছিল, তাকেও বাবা চাকরি দিয়েছিলেন, সে-ও নানা-দাদা হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু সে আমাদের বাসায় কখনো থাকেনি তো তাকে আমরা মোতালেব ভাই বলেই ডেকেছি প্রথম থেকে। এই মোতালেব ভাই-ই ফজল ভাইয়ের মনোবেদনার বাহক, কি না ‘বুড়া হইয়া গেলাম, তারা আমারে নাম ধইরা ডাকে!’

 মা মাস্টারের মেয়ে ছিলেন, বাবা চাকুরে ছিলেন, তথাপি এ ঘটনা ঘটার কী কারণ! কারণ, সে সময় কাজের লোকের সহজপ্রাপ্যতা, আর তাদের মুনিবের প্রতি অগাধ ভক্তিশ্রদ্ধা, বংশপরম্পরায়! আজকের দিনের তুলনায় যা নিঃসন্দেহে কিংবদন্তিতুল্য।

ষাটের দশকে রোজার মাসে ফজল ভাই জগন্নাথ হল ক্যান্টিনে আমাকে আর ভাইয়াকে বরফ চিনিয়েছে, হলের ছেলেদের কাছ থেকে সিগারেটের প্যাকেট কুড়িয়ে এনে তাস বানানো শিখিয়েছে, আতস আলী মামার দেওয়া তারাবাতি জ্বালানো শিখিয়েছে, এক আনা দিয়ে ছয়টা কমলা রঙের কালিজিরা বিচ্ছুরণ বিস্কুট কিনে খাওয়াও শিখিয়েছে; কিন্তু সেই শিশু বয়সে তাকে ভাই বলা শেখায়নি, নিশ্চয়ই শেখানোর সাহস পায়নি!

সেই ফজল ভাইকে একদিনে বাবা কার্জন হলে পাম্পম্যানের চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছেন, দেশ স্বাধীনের বছর দু-এক আগে। যুদ্ধের আগেই সে দু-এক ছেলে-মেয়ের বাপ। বউ-বাচ্চা গ্রামে থাকে। চাকরি পাওয়ার পরও বাসায় আসে আমাদের গ্রামের আতপ চাল, মুড়ির টিন, মাছের টিন, আর শিম-বরইয়ের বস্তা নিয়ে। আমাদের প্রতি তার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি।

ফজল ভাইয়ের চাকরি হয়ে গেলেও আমাদের বাসায় তার যাতায়াত কখনো সীমিত হয়নি। প্রতি মাসে, কখনো সপ্তাহে বাড়ির এটা-ওটা নিয়ে আসে। খবর আনে দাদা-দাদি, চাচা-চাচির, ছেলে-মেয়েদের, বাড়ির কারো জন্ম কি মৃত্যু সংবাদ।

পঁচিশ মার্চ ইকবাল হলের পাশের আবাসিক ভবনে সারা রাত আমরা যুঝেছি, মৃত্যুর অপেক্ষা করেছি, পঁচিশ মার্চ রাত না এলে জানতামই না মৃত্যু আগমন কেমন! বীভত্স, দানবীয়, পৈশাচিক! একটাও খাঁটি শব্দ নয় পরিস্থিতি বোঝাতে! আর কামানের গোলার তীব্রতা! ভোরের দিকে কামান দাগানো বন্ধ হলে আমরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই, সব কিছু অবশ হয়ে আসে। ঘুমের মধ্যেই আঁতকে আঁতকে উঠি, এই বুঝি আবার শুরু হবে। ছাব্বিশে মার্চ মহা-আতঙ্কের দিন! মাঝেমধ্যে গোলাগুলির শব্দ, আর মিলিটারিদের জোড়ায় জোড়ায় মার্চপাস্ট হলের আর বাসার সামনে দিয়ে। বাইরে ঝলমলে রোদেলা দিন আর আমরা বিষণ্ন, আতঙ্কিত। বাসার বারান্দায় বস্তিবাসী মানুষের আগুন থেকে বাঁচানো বোঁচকাবাঁচকি, রান্নাঘর তাদের দখলে, রাঁধে খায়, খাওয়াতে চেষ্টা করে। আর মৃত্যুর হিসাব করে, কে গুলি খেয়ে, কে পুড়ে!

সাতাশ মার্চ কারফিউ ছাড়লে ফজল ভাই আসে বাসায়। এক দিনে তার বয়স বেড়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই সে কান্না জুড়ে দেয়, আমরা কত জন মারা গেলাম! কাঁদতে কাঁদতে সে মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়। মা দুদিন ধরে বিষণ্নচিত্তে বিহ্বল হয়ে এঘর-ওঘর করছিলেন আর বারবার বলছিলেন, একমুহূর্তও এ বাসায় থাকব না। সেই মা ফজল ভাইয়ের কান্নায় সংবিত্ ফিরে  পেলেন।—চোখ খোল ফজল, দেখ ওরা সবাই বাঁইচা আছে! ফজল ভাই সে রকমই কেঁদে চলেছে। বাবা নিজের ঘর ছেড়ে এলেন, তিনি আমাদের আজকের অবস্থার জন্য দায়ী। তিনি মায়ের কথা শোনেননি। মায়ের মামাতো ভাই ফুলার মামা, যিনি রেডিও পাকিস্তানে কাজ করতেন, তিনি তেইশ তারিখে মাকে বলে গেছেন ঢাকা ছাড়তে; কিন্তু বাবা শুনে বলেছিলেন, আমরা সিভিলিয়ান, আমাদের কী করবে! বাবা ফজল ভাইয়ের কান্না থামালেন ধমক দিয়ে—চোখ খুইল্যা দেখ, সব্বাই বাঁইচা আছে, আল্লাহ এখনো বাঁচায় রাখছে!

ফজল ভাই ইচ্ছা করলে একা মানুষ নিজ প্রাণ নিয়ে সহজেই গ্রামে চলে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকা না-থাকা চিন্তা তাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিল। সাতাশ মার্চ আমাদের মহাবিপজ্জনক পলায়নযাত্রায় সে না থাকলে আমাদের দু-একজন অন্তত হারিয়ে যেত। ফতুল্লায় যখন এলোপাতাড়ি গুলি, ফজল ভাই-ই আমাদের গাড়ি থেকে টপাটপ নামিয়ে ভেড়ার পালের মতো শীতলক্ষ্যায় ভাসমান জেটিতে লুকাতে সাহায্য করল। জেটি থেকে ডিঙি নৌকার বাচ্চা ছেলেটাকে ধর্মের ভাই ডেকে দূর থেকে কাছে টেনে এলো, নৌকা থেকে মধ্য শীতলক্ষ্যায় দাঁড়িয়ে থাকা স্টিমার, আবার স্টিমারে মাত্র পনেরো মিনিট, গুলির হামলা হলে কিয়ত্কাল পরেই আবার আলুর নৌকাকে ধর্মের বাপ বলে তাতে আমাদের নামিয়ে নেওয়া। নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লার বিপজ্জনক সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর বারবার কানে ধ্বনিত হচ্ছিল—তুমি আমার ধর্মের ভাই, তুমি আমার ধর্মের বাপ! দুদিন নৌকায় ভেসে ভেসে কত কত ভয়াবহতার ভেতর দিয়ে গজারিয়া পৌঁছানো! মাঝখানে এক রাত কাঠপট্টির করিম চেয়ারম্যানের বাড়িতে, শত শত মানুষ তাঁর সেবা নিচ্ছে, অকল্পনীয়! পথে প্রবল ঢেউয়ে মাঝনদীতে বইঠা ভেঙে যাওয়া, মাঝির নাবালক ছেলের পানিতে পড়ে যাওয়া, মাঝি হাল ছেড়ে ছেলের জন্য আর্তনাদ করতে থাকলে নৌকা মাঝনদীতে চরকার মতো ঘুরতে থাকা..., বাবা বললেন, নদীতে মৃত্যু, হায়...। নদীর দেশের মেয়ে মা; বললেন, মাঝিকে বলেন হাল ধরতে, ছেলে ঠিক উঠে আসবে! ওই অবস্থায় ফজল বাবার গাল খেয়ে চলেছে, বেচারা! আমরা বাবার ওপর রাগ করি না, ফজল ভাইয়ের জন্যও খারাপ লাগে।

দেশ স্বাধীনের পর ফজল ভাই নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসে। আমরাও সব ফিরে এসেছি। কার্জন হলের পাম্পম্যান ফজল, পরে আমাদের ফজল ভাই। পানি ছাড়ে আবাসিক ছাত্রদের হলে। একবার পানির কারণে ছাত্রদের পেট খারাপ হলে তিনতলায় নিয়ে পিটিয়ে নিচে ফেলে দেয় ছাত্ররা। কপাল ভালো, সে পড়েছিল পাতাবাহারের ঝাড়ে। মারা যায়নি। ভরা সে বর্ষায় গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে থাকে এক মাস। বাবা খোঁজখবর নেন। 

শক্তপোক্ত ফজল ভাই এতটাই কাহিল হয়ে পড়ে যে সেই স্বাস্থ্য আর সে ফিরে পায় না। আমাদের বাসায় আসা কমে আসে। মাসে হয়তো একবার, গ্রাম থেকে ফিরে এসে। চালের বস্তা আলুর-বস্তার বদলে টাকা নিয়ে আসে নগদ, বাবাই বলেছেন। কার্জন হল থেকে আমাদের জহুরুল হক হলের কাছের আবাসিক ভবনে সে আসত ধীর পায়ে, মাঠের মাঝখানটার দূর্বা ওঠা পথ ধরে। এসে হাঁপাত। দেখতাম, বাবাও আর আগের মতো শুধু শুধু বকতেন না। বেঁচে এসেছে সে এই যথেষ্ট—বাবা বলতেন। এসএসসি পরীক্ষার্থী বড়পা কখনো বিস্ময় নিয়ে বলত, ফজল, তুমি দৌড় দিতে পারলা না, মানুষ তিনতলা থেকে ফেলে দেয় কেমনে!

 তত দিনে ফজল ভাই একটি মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। মেয়ের বাড়ি গেলে মুরগি জবাই করে খাওয়ায়, ঢাকায় চাকরি করে বলে বিয়াই-বিয়ান বেশ তোয়াজ করে—এই গল্প করার সময় তার মুখ আলোয় ভরে যায়। এখনো দুটি মেয়ে বিয়ের বাকি, ছেলেটা গ্রামের স্কুলে যায়। ছেলেকে শিক্ষিত করার তার খুবই ইচ্ছা। নিজ স্বাস্থ্য ছাড়া মোটামুটি সে সুখী মানুষ।

এর মধ্যে আমাদের দাদার ক্যান্সার ধরা পড়লে বাবা চিকিত্সা দিয়ে রেডিও থেরাপি শেষ করে ফজল ভাইকে দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দেন। তার কিছুদিন পর দাদিরও ক্যান্সার। তাকেও বাবা ঢাকায় এনে একই চিকিত্সা দেন। ফজল ভাইয়ের অংশগ্রহণ ছাড়া এসব সম্ভব নয়। বিশেষত ভরসাহীন চিকিত্সা শেষে প্রতি মাসে তাদের চাক্ষুষ খবর সে-ই এনে দেয়। এনে দেয় আলু বেচা, ধান বেচা কি সরিষা বেচা টাকা। সে সময় একটা ঘটনা ঘটে—টাকা দেওয়ার সময় একটা পাঁচ শ টাকার নোট কম। মা বিস্ময় নিয়ে বললেন, কম কেন, ফজল? ফজল অম্লান বদনে বলে, লঞ্চ থেকে উইড়া গেল চাচিআম্মা। গুনতাছিলাম, এমন একটা বাতাস, উইড়া গেল! ধরতে গেলে তো বাকিগুলাও যাইত!

আমরা দূর থেকে মায়ের অভিব্যক্তি দেখি, মা আঁতকে উঠে বলেন, না না, ঠিক আছে, একটা গেছে যাক।

বাবার কাছে টাকা দেওয়ার দিন তার শেষ হলো, প্রায়ই ‘উইড়া যায়, পইড়া যায়’ কি কখনো ‘ও আল্লাহ, দাদায় না গুইন্যা দিল, কম কেরে!’

মা এই কথাগুলো বাবাকে বলেন গম্ভীর গলায় কিছুটা বিরক্তি নিয়ে, ফলত বাবা ব্যাপারটা আমলে নিতেন না। তরল গলায় বলতেন, ওর সেই যে গাঁটের থেইক্যা এক আনা যাওয়া, মনে নাই! এখন পাঁচ শয় আইসা ঠেকছে!

ষাটের দশকে জগন্নাথ হলের বাংলোয় থাকতে ও বাজার করত, প্রতিদিনই সে বাজার থেকে ফিরে বলত, ও চাচিআম্মা, আমার গাঁটের থেইক্যা এক আনা গেছে!

 সেই সময় মোতালেব ভাই আসে পানির কল সারাই করতে। মাকে বলে, চাচিআম্মা, একটা কথা, এমন কিছু না...

 মা বলেন, কে কী কয়?

ওই ফজল ভাই, বয়স হইছে, আপারা-ভাইয়েরা নাম ধইরা ডাকে! এমন কিছু না... একটু কষ্ট পায়!

মা আমতা আমতা করে, দুই আপার তো বিয়া হইয়া গেছে, আচ্ছা, আর বলবে না। ওরে বইলো মনে দুঃখ না রাখতে।

তার পরও কিছুকাল ফজল ভাইকে কিছু না বলা, তারও পর ফজল ভাই বলা। কী খুশি যে হতো! সম্মানবোধে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বিনা কারণে প্রচুর কথা বলত।

স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পর আবার প্রবল বর্ষায় ফজল ভাইয়ের মৃত্যু হয় ডায়রিয়ায়, একা ঘরে মাঝরাতে, কার্জন হলের পাম্পম্যানের কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু। সে বুঝতেই পারেনি, সামান্য পায়খানায় তার মৃত্যু হতে পারে! আমাদের সঙ্গে তো এখনো তার কথা হয়, ফজল ভাই, এইটা কেমনে সম্ভব, ডায়রিয়ায় কেউ মরে! রিকশা একটা নিয়া মহাখালী গিয়া পড়তে পারলেই তো বাঁচতে!

বাবা স্বভাববশত বকছেন, তোর আর বুদ্ধিসুদ্ধি হইলো না রে ফজলা, ডায়রিয়ায় মরলি তুই, বেকুব কাহাকার!

আর মায়ের মনে পড়ে পঁচিশে মার্চ, ছাব্বিশ কি সাতাশ, ফতুল্লা, শীতলক্ষ্যার জেটি, প্রাণপণে ধর্মের ভাই, ধর্মের বাপ ডেকে নৌকা জোগাড় করে আমাদের নিরাপদ করা। নাকি সে-ই ছিল সত্যিকার ধর্মের বাপ কি ছেলে!  প্রায়ই যার গাঁট থেকে চলে যেত আনা আনা পয়সা, গভীর মমতায়!

 

মন্তব্য