kalerkantho

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ত্ স্য গ ন্ধা

মত্স্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মত্স্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

উঠে বসলেন পরাশর। তাঁর দেহ ভারমুক্ত। মেজাজ হালকা। ফুরফুরে। এতক্ষণ দুর্বহ এক বোঝা তাঁকে চেপে রেখেছিল। মত্স্যগন্ধার বিবরে তেজোবিন্দু নিঃসরণের পর তাঁর দেহ আর মন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন। কিছুক্ষণ আগে যে স্বাদ তিনি গ্রহণ করলেন, তা তাঁর কাছে অনাস্বাদিতপূর্ব। এর আগে কোনো নারীর দেহলগ্ন হননি তিনি। গোটাটা জীবন পঠনে-পাঠনে কাটিয়েছেন। মন্ত্র উদ্গাতা তিনি। যাগ-যজ্ঞে-মন্ত্র নির্মাণে সময় ব্যয় করেছেন। নানা কারণে নানা অনুষ্ঠানে তাঁর চারপাশে নারীরা সন্নিবেশিত হয়েছে। কিন্তু কারো দিকে তেমন চোখে তাকাননি কখনো। আজ কী হলো কে জানে, জীবনের এই পড়ন্তবেলায় মত্স্যগন্ধার দিকে তাকালেন। এ তাকানো স্বাভাবিক নয়। তাঁর এই তাকানোর সঙ্গে কামের মিশেল ঘটে গেছে। মত্স্যগন্ধাকে কাছে টানার আগে তার মধ্যে কাম আর বিবেকের তুমুল যুদ্ধ চলেছে। এই যুদ্ধে তাঁর অর্জিত সদজ্ঞান পরাজিত হয়েছে। কামের কাছে তিনি পরাস্ত হয়েছেন।

কিন্তু এটা কি সত্যি পরাজয়? একজন পুরুষের নারী কামনা করা কি অন্যায়। পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, সবার মধ্যেই তো দেহ কামনা জাগরূক। পশুপাখি-কীটপতঙ্গ কেউই এর বাইরে নয়। তিনি নিজে প্রাণীদের একজন। তাই তাঁরও দেহলোলুপতা অন্যায় নয়। পুরুষ তিনি। তাঁর মধ্যে দেহ-উতরোল থাকা স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন তিনি আজ। মত্স্যগন্ধাকে কাছে টেনে তিনি কোনো অন্যায় করেননি। এক অফুরান অবর্ণনীয় অমৃত স্বাদ পেয়েছেন তিনি। তৃপ্ত তিনি। পরমভাবে সন্তুষ্ট। আচ্ছা, মত্স্যগন্ধা কি তৃপ্ত? সন্তুষ্ট?

চট করে মত্স্যগন্ধার দিকে তাকালেন ঋষিবর। দেখলেন, মত্স্যগন্ধার নিমীলিত চোখ। মত্স্যগন্ধা বিরক্ত না তৃপ্ত বুঝতে পারলেন না পরাশর।

আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। শরতের আকাশ। নির্মেঘ। তবে একেবারেই মেঘহীন নয়। মাঝে মাঝে সাদা মেঘের ভেলা। ধীরে-সুস্থে এপার থেকে ওপারে ভেসে যাচ্ছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। কখনো জোড়ায় জোড়ায়, কখনো ঝাঁক বেঁধে। ঝকঝকে নীল আকাশ। উদাসী চোখে এসব দেখে গেলেন ঋষি। তারপর চোখ ফেরালেন যমুনাজলে। জল স্রোতহীন। ভাটার সময় হয়ে এসেছে। জোয়ার-ভাটার সন্ধিক্ষণে স্রোত থমকে দাঁড়ায়। থম মেরে থাকা যমুনার বুকে তরিটি ঘুরে যাচ্ছে। ডান থেকে বাঁ দিকে, আবার বাঁ থেকে ডান দিকে। ছোট ছোট ঢেউ নৌকাটির তলায় এসে বাড়ি খাচ্ছে। অতি মৃদু শব্দ ক্রমাগত ঋষির কানে এসে বাজছে। এবার জলের ওপর স্পষ্ট দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন পরাশর। দেখলেন—যমুনার জলে গোধূলি সূর্যের হলদে আর লালচে আভার মিশেল। লাল-নীল আর হলুদ রঙের মিশ্রণে যমুনার জল এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করেছে। ঋষি পরাশর এ রকম জলরূপ আগে কখনো দেখেননি। তাঁর কাছে মনে হলো—এ এক স্বর্গীয় শোভা। তিনি নিজের মধ্যে অভূতপূর্ব এক শিহরণ অনুভব করতে থাকলেন।

ধীরে ধীরে পরাশরের কাছে চারপাশের দৃশ্যাবলি অস্পষ্ট হয়ে এলো। তাঁর চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে থাকল নৌকাটির পাটাতনে পড়ে থাকা নিমীলিত চোখের মত্স্যগন্ধার দেহটি। তিনি অভিনিবেশে মত্স্যগন্ধার দিকে তাকালেন।

কিছু একটা বলতে চাইলেন পরাশর। বললেন না। এবার তিনি দৃষ্টি ফেললেন নদীপারের দিকে। দেখলেন, নদীতীর অদূরে নয়। গোত্তা খেতে খেতে ছোট্ট নৌকাটি প্রার্থিত নদীকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে। সমীরণ তখন দক্ষিণ থেকে উত্তরে বইছে। উত্তরপারেই পরাশর নামবেন।

নিথর দেহটির দিকে পরাশর ডান হাতটি বাড়ালেন। কী ভেবে হাতটি গুটিয়ে নিলেন ঋষি।

বললেন, ‘জানি বাসবী, তুমি জেগে আছ। তোমাকে আমার দুটি কথা বলার ছিল।’

মত্স্যগন্ধা চোখ খুলল না। দেহটিও তার চুল পরিমাণ নড়ল না। তার দেহটি যেন দেহ নয়, এক খণ্ড নির্জীব নিরেট পাথর। শ্বাস-প্রশ্বাসে তার উন্নত কুচযুগল শুধু মৃদুলয়ে ওঠানামা করছে।

চোখ সরালেন ঋষি। কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘আমি গৃহী নই। কিসে নারী খুশি হয়, জানি না আমি। আমার কৃতকর্মে তুমি সুখ পেয়েছ কী বেদনা, বোঝার অভিজ্ঞতা নেই আমার।’ থামলেন পরাশর।

মত্স্যগন্ধার কোনো ভাবান্তর হলো না। আগের মতোই নির্জীব-নিস্তব্ধ সে। এবার ঋষি অপরাধী কণ্ঠে বললেন, ‘প্রত্যেক পুরুষ কামের অধীন। অন্য রিপুকে পরাস্ত করা সম্ভব হলেও প্রথম রিপুকে পরাজিত করা সহজ নয়। হ্যাঁ, তপস্বীরা পারে। কিন্তু আমি পারলাম না। এ আমার অক্ষমতা বাসবী।’

মত্স্যগন্ধার চোখের পাতা একটুখানি নড়ে উঠল। আবেগাপ্লুত পরাশর তা দেখতে পেলেন না।

‘তুমি এবার চোখ মেলে তাকাও পুষ্পগন্ধা। জানি, তুমি আমার কথা উত্কর্ণ হয়ে শুনছ।’ দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন ঋষি। কাঁধের উত্তরীয় দিয়ে মুখমণ্ডল মুছে নিলেন। জটায় দু-হাত আলতো করে বোলালেন।

‘কথা দুটির প্রথমটি হলো—যদি অপরাধ করে থাকি ক্ষমা কোরো।’ পরাশরের কথা শুনে মত্স্যগন্ধার শরীরটা কেঁপে উঠল। চোখ খুলতে ইচ্ছা করল মত্স্যগন্ধার। কিন্তু লজ্জা বলল—ছি, মত্স্যগন্ধা! তোমার সর্বস্ব লুণ্ঠনকারীর সামনে তুমি চোখ খুলবে কেন? তোমার দুচোখজুড়ে ঘৃণার যে তীব্র আগুন, তা যে ঋষিকে পুড়িয়ে মারবে! চোখ খুলল না মত্স্যগন্ধা। দুচোখের পাতা আরো জোরে চেপে ধরল সে।

ঋষি বললেন, ‘তোমার কাছে দ্বিতীয় অনুরোধ—তোমার গর্বে যদি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়, তাকে মানুষ কোরো। ও ঋষি বশিষ্টের উত্তরাধিকারী। মহামতি শক্তির রক্তধারা তার শিরা-উপশিরায় বহমান।’ গম্ভীর হয়ে কী যেন ভাবলেন একটু। তারপর জলদগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি—ওই পুত্রের মধ্য দিয়ে মানবসমাজে এক নতুন সভ্যতার সূচনা হবে।’ বলে মত্স্যগন্ধার দিকে আর তাকালেন না পরাশর।

ত্বরিত উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দ্রুত পায়ে তরিটির পশ্চাদ্ভাগের দিকে গেলেন। বইঠাটি নিজ হাতে তুলে নিলেন। আনাড়ি হাতে বইঠা চালাতে শুরু করলেন তিনি। নৌকাটি এদিক-ওদিক মাথা নাড়তে নাড়তে কিনারার দিকে এগিয়ে চলল।

একটা সময় নৌকাটির আগা পারে লাগল। নৌকাটির গায়ে হালকা একটা কাঁপন তৈরি হলো। অনভ্যস্ত পরাশর জলে ছিটকে পড়তে পড়তে সামলে নিলেন। বইঠাটি গুটিয়ে রাখলেন। তারপর একপা-দুপা করে নৌকার আগার দিকে এগিয়ে গেলেন। এক লাফে নৌকা থেকে নেমে গেলেন পরাশর।

নৌকার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালেন। গাঢ় চোখে শেষবারের মতো মত্স্যগন্ধার দিকে তাকালেন ঋষি। মৃদু অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, ‘যাঁরা সারা জীবন ব্রত-নিয়ম, সদাচার, তপস্যা করেন, তাঁরাও তো মানুষ পুষ্পগন্ধা। রক্ত-মাংসের তৈরি ইন্দ্রিয়বৃত্তিসম্পন্ন মানুষ। তাঁদেরও কখনো কখনো ফুল-পাখি-নদীর দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে। বসন্ত হাওয়া তাদের মনেও দোলা দিতে পারে। ইন্দ্রিয়দ্বার রুদ্ধ করা শুষ্ক রুক্ষ মনের কোনো মুনি যদি বসন্তের উতল হাওয়ায় আন্দোলিত হন, তাহলে কি তা অপরাধের? আজকে আমার যে আচরণ, তা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। নাকি সেটা পরম দোষের? জানি—ইন্দ্রিয়াধীন সাধারণ মানুষ বড়ই মজার। তারা নিজেদের ইন্দ্রিয়ের আহার জোটাতে অক্লান্ত। এটা তাদের চোখে দোষের নয়; কিন্তু কোনো সাধু পুরুষের সংযমের ক্ষণিক বিচ্যুতি ঘটলে তারা হাহাকার করে ওঠে। ঋষিদের সারা জীবনে জ্ঞানতপস্যা ওই সব মানুষের কাছে এক মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে যায়।’ হাঁপিয়ে উঠলেন পরাশর। স্বভাবত একনাগাড়ে এত কথা বলেন না ঋষি। আজকে বললেন। আজকে যে তাঁকে কথায় পেয়ে বসেছে।

পেছন ফেরার আগে বরাভয়ের ডান হাতটা তুললেন পরাশর। বললেন, ‘আমি আবার আসব তোমার কাছে পুষ্পগন্ধা। আমার ঔরসজাত সন্তানটিকে দেখার বড় বাসনা আমার।’

কোমর ভেঙে উপুড় হলেন পরাশর। নৌকার আগাটি ধরে জোরে একটা ঠেলা দিলেন। মত্স্যগন্ধাসমেত সেই ছোট্ট তরিটি কূল থেকে অকূলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। পেছন ফিরলেন ঋষি পরাশর। মত্স্যগন্ধা, তার শরীর, তার তরঙ্গায়িত মন, যমুনার নীল জল, ডিঙিটি, বইঠা ফেলার ছলাতছল ধ্বনি ধীরে ধীরে পরাশরের কাছে অতীত হতে শুরু করল। এখন তাঁর কাছে মূল্যবান ভবিষ্যতের মুহূর্তগুলো। দ্রুতপায়ে তিনি সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। নির্জন ঘাট। লোকালয় অনেক দূরে।

নৌকার পাটাতনে চিত হয়ে শুয়ে আছে মত্স্যগন্ধা। স্খলিত বসন। আলুলায়িত দেহ। নারীদেহের যে প্রত্যঙ্গগুলোয় একসময় টান টান সতেজতা ছিল, সেখানে এখন শিথিলতা। দেহসুষমা ফ্যাকাসে, ম্লান। চোখের পাতায়, গণ্ডদেশে পুরুষস্পর্শের চিহ্ন স্পষ্ট। মনোলোভা যে ঊরুবিভঙ্গ, সেখানে ছন্দের খামতি। দেখেই বোঝা যায়—এ দেহ বিপর্যস্ত। গাছে শোভিত একটি গোলাপকে হাত দিয়ে কচলালে গোলাপের যে অবস্থা দাঁড়ায়, মত্স্যগন্ধাকে দেখে সেই কচলানো গোলাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ঋষি পরাশর একজন অজ্ঞ অকুশলী মালি যেন, বাগান পরিচর্যায় তিনি অপারঙ্গম।

মত্স্যগন্ধার মনজুড়ে বিষাদ, দেহজুড়ে বিপন্নতা। পাশ ফিরতে গেল মত্স্যগন্ধা। দেহটি ব্যথায় কনকনিয়ে উঠল। বিপুল বিক্রমশালী এক ঝঞ্ঝা তার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। পরাশরের আনাড়ি দেহে কাম ও শক্তির প্রবল উপস্থিতি। সেই শক্তির ঝড় বইয়ে দিয়েছেন তিনি মত্স্যগন্ধার দেহ-আঙিনায়।

এখন মত্স্যগন্ধার চোখ দুটি উন্মীলিত। নিষ্পলক চোখ দুটি ঊর্ধ্বাকাশে স্থির। আঁধার ঘনায়মান। আকাশে, যমুনাজলে আলো আর আঁধারের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। এই দ্বন্দ্বে অন্ধকারের জয় নিশ্চিত। কিন্তু আলোও সহজে পরাস্ত হতে রাজি নয়। এ রকম বাতাবরণে নৌকাটি গোত্তা খেয়ে যাচ্ছে। নৌকাটিতে ভাটার টান লেগেছে। প্রায় স্থির তরিটি এবার মৃদুমন্দ তালে চলতে শুরু করেছে।

শুয়ে শুয়েই সে আকাশকে বলল, ‘হে আকাশ, তুমি সর্বদর্শী। তোমারই তলায় এই পৃথিবীর সব প্রাণী। তাদের সব কাজকর্ম তোমার দৃষ্টির অধীন। আমার সঙ্গে পরাশর আজ যে ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন, তা তুমি প্রত্যক্ষ করেছ। অসহায় আমি, শক্তিহীন। মুনিকে বাধা দিতে পারার মতো বল আমার শরীরে নেই। তাই আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি। মুনিটি এমন, এই প্রক্রিয়ায় আমার সম্মতি আছে কি না তেমন করে ভাবলেন না। নিজের দেহশক্তি প্রয়োগ করে আমার সর্বস্ব কেড়ে নিলেন। শুধু যে কেড়ে নিলেন, তা তো নয়। রেখে গেলেন তার চেয়ে বেশি। তাঁর বলাত্কারের চিহ্ন আমার দেহজুড়ে। কিন্তু বাহ্যিক চিহ্ন সাময়িক। আমার দেহে অঙ্কিত আঁচড়-খামচির চিহ্ন একদিন মিলিয়ে যাবে; কিন্তু জরায়ুতে রেখে যাওয়া শুক্রাণুর উপস্থিতি আমি মুচব কী করে? এখন কী করব আমি? বলো তুমি আমায়। যমুনাজলে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেব?

অতি ধীরে উঠে বসল মত্স্যগন্ধা। ককিয়ে উঠল সে। হামাগুড়ি দিয়ে নৌকাটির কাছার কাছে গেল। নদীজলে ঝুঁকে পড়ল। জলে ডান হাতটা নামিয়ে দিল সে। তার হঠাত্ মনে হলো—আঁজলা ভরে সারা মুখে জলের ঝাপটা দিলে বুঝি মুখমণ্ডলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কলঙ্কচিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

দুই হাত বাড়িয়ে মুখে-গলায়, চোখে-কপালে জলের ঝাপটা দিয়ে যেতে লাগল মত্স্যগন্ধা।

এই কাজটি কতক্ষণ ধরে করে গেছে, হিসাব রাখেনি মত্স্যগন্ধা। একটা সময়ে সে স্পষ্ট চোখে চারদিকে তাকাতে পারল।

নৌকার কিনারায় হেলান দিয়ে বসল মত্স্যগন্ধা। তার চোখ চলে গেল বহমান জলধারার ওপর। তার মনে পড়ল সেই আপ্তবাক্যটি—নদীজল ও নারী কখনো অপবিত্র হয় না। কারণ তারা সর্বদা বহমান। ক্ষিপ্তকণ্ঠে সে চিত্কার করে উঠল, ‘মিথ্যা, সব মিথ্যা। এ শুধু ছলনাবাক্য। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য পুরুষরা এই কথাটি প্রচার করেছে। এই বাক্যটি চাতুরীতে পূর্ণ, রহস্যময় ও অর্থহীন।’ তার এই চিত্কার যমুনার বাতাসে বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলল। সেই প্রতিধ্বনি দ্বিগুণ তেজোময় হয়ে মত্স্যগন্ধার কণ্ঠে ফিরে এলো।

মত্স্যগন্ধা আবার বলতে শুরু করল, ‘নদীজল স্থানান্তরিত হয়। স্রোতের টানে বর্জ্যমিশ্রিত জল সামনের দিকে এগিয়ে যায়। মিশে যায় সে অপার জলরাশির সঙ্গে। তাতে কলুষিত জল দোষমুক্ত হয়। কিন্তু নারী তো নদী নয়! তার দেহ তো নদীজলের মতো বহমান নয়। সে তো সমাজে বাস করে। সমাজ নামের গণ্ডির মধ্যে তার জীবনযাপন। সমাজবিধি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। তার দেহ আর মন জুড়ে কলুষতার যে চিহ্ন অঙ্কিত করে রেখে গেছেন পরাশর, তা তো অদৃশ্যমান নয়। কৈবর্তপাড়ার মানুষদের চোখে তা তো স্পষ্ট হয়ে উঠবে একদিন না একদিন। কী হবে তখন? কী করব তখন আমি?’

উঠে দাঁড়াল মত্স্যগন্ধা। ধীর পদক্ষেপে নৌকার পাছার দিকে এগিয়ে গেল। বইঠাটি হাতে তুলে নিল।



মন্তব্য