kalerkantho


বন্ধুত্বের জন্য সমতা চাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বন্ধুত্বের জন্য সমতা চাই

অঙ্কন : মাসুম

বোঝা যায়, সমাজে অগ্রগতির যত ধ্বনি ও লক্ষণই পাওয়া যাক, মেয়েরা নিরাপদে নেই, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও নয়। আগের দিনে আমরা স্ত্রী-স্বাধীনতার কথা বলতাম, এখন বলি নারীমুক্তির কথা। ধারণার দিক থেকে সেটা একটা অগ্রগতি বটে। স্ত্রী নয়, নারী; স্বাধীনতা নয়, মুক্তি—চিন্তাটা এভাবে এগিয়েছে। কিন্তু যে আসেনি সেটা সত্য। এ বিষয়ে আমরা বলছি; কিন্তু বলার কথা আরো রয়েছে, সহজে শেষ হবে বলেও মনে হয় না, কেননা নারীমুক্তির প্রশ্নটা শুধু যে পুরুষ ও নারীর সাম্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত তা নয়; যুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র, ঐতিহ্য ও আদর্শের সেই বিন্যাসের সঙ্গেও, যা পুরুষকে প্রভুর আসনে বসিয়ে রেখেছে। ছলে-বলে-কৌশলে এই প্রভুত্ব রক্ষিত হচ্ছে, ভেঙেও ভাঙছে না।

নারীমুক্তির প্রশ্নে একটা জিজ্ঞাসা পুরনো ও যুক্তিসংগত। সেটা এই যে নারী বলে আসলে কি কিছু আছে, নাকি সে পুরুষের হাতে তৈরি একটি ভাবমূর্তি মাত্র? এই মূর্তি পুরুষই তৈরি করেছে তার ইচ্ছা, রুচি ও প্রয়োজনের মাপে। যে জন্য নারী কখনো উর্বশী, কখনো লক্ষ্মী, কখনো ম্যাডোনা, কখনো বা প্যান্ডোরা কিংবা ইভ। নারীসুলভ কতগুলো বিশেষ গুণ আছে বলে উচ্চৈঃস্বরে বলা হয়, যেমন নমনীয়তা, শান্ত স্বভাব, সাংসারিক দায়িত্ব পালন, মাতৃত্ব, যেগুলোর—সব কটিই মেয়েদের তুলনায় পুরুষের জন্য অধিক উপকারী বলে প্রমাণিত। সব মিলিয়ে এই বাস্তবতাই সত্য যে মেয়েরা মেয়ে হয়ে জন্মায় না, জন্মানোর পরই তারা মেয়ে হয়।

একটা জৈব বৈজ্ঞানিক পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে, যেটা কেন্দ্রীভূত এই সত্য যে সন্তান ধারণের ক্ষমতা শুধু মেয়েদেরই রয়েছে, ছেলেদের নেই। এই পার্থক্যই আবার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায় বৈষম্যের। সন্তান ধারণের ওই বিশেষ ক্ষমতা পরিণত হয় নারীর জন্য দুর্বলতায়। ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়তো এমনটা ঘটবে যে সন্তান সৃষ্টিতে নারীর ভূমিকা তেমন মুখ্য রইবে না, এখন যেমনটা রয়েছে। তার ফল কী হবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব না; কিন্তু ওই বৈষম্যটা দূর হলেই যে অন্য সব বৈষম্যের পাহাড়-পর্বত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাবে, তা বোধ করি বলা যায় না। অন্য পার্থক্যগুলোও কম জোরদার নয়; কিন্তু আমরা এই যে পার্থক্য পার্থক্য করছি, বলছি মেয়েরা অন্য রকম, তারা কার থেকে পৃথক, কোন মানদণ্ডে ভিন্ন? পুরুষের। পুরুষই নিরিখে, সেই মানদণ্ডেই মেয়েরা পৃথক, তারা অন্য রকমের। পুরুষের প্রভুত্ব নারীকে উত্সাহিত করে নিজের বিশিষ্টতাকে অতি উচ্চমূল্য দিতে, তাকে যতটা পারা যায় বিকশিত করতে। সন্তান ধারণ ও সন্তান পালন তো বটেই, সৌন্দর্যের একটি জ্ঞানতত্ত্বও তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, মাতৃত্বের ও সৌন্দর্যের কারণেই মেয়েরা ক্ষমতাবান। অথচ এ দুই তথাকথিত ক্ষমতা বৃদ্ধিতে মেয়েরা যতই ব্যস্ত হয়, ততই তারা পিছিয়ে পড়ে পুরুষের তুলনায় এবং ততই শক্ত হয় পুরুষের প্রভুত্ব। নারীর বন্দিত্ব, তার ওপর নিপীড়ন, তার বঞ্চনা। এসব বাস্তবতা মিলে একটি আদর্শগত আধিপত্যের অদৃশ্য কিন্তু কঠিন বলয় গড়ে উঠেছে, যেটি না ভাঙলে নারীমুক্তি অসম্ভব। অন্য শৃঙ্খল ভাঙার পরও আদর্শের শৃঙ্খলটা থাকে, কেননা সেটি একটি সংস্কৃতি।  বৈজ্ঞানিক পরিচয়ে নারী বলে চিহ্নিত শিশুটি তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক জলাশয়ে নিক্ষিপ্ত হয় এবং বুঝে ফেলে যে এখানে টিকতে হলে তাকে ওই জলের সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে চলতে হবে—অর্থাত্ সাঁতরাতে শিখতে হবে, নইলে ডুবে মরাটা অবধারিত। নিচে নাকি আবার কুমির আছে লুকিয়ে!

সৌন্দর্যজ্ঞানতত্ত্বটিও পুরুষেরই সৃষ্টি। পুরুষ তার সুবিধার মাপে ওটি তৈরি করেছে এবং মেয়েরা সেটি মেনে নিয়েছে। মেনে নিয়েছে ওই যে সাঁতরানো, তারই অংশ হিসেবে। মেয়েরা কিসে সুন্দর হয়, সে ধারাণাটাও পুরুষের কারখানায়ই উত্পন্ন বটে। যেমন—ধরা যাক, নগ্ন নারীদেহের সৌন্দর্য। এটি শিল্পকলায় একভাবে আসে, বাণিজ্যে আরেকভাবে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নারীদেহের ব্যবহার হচ্ছে বৈকি। দেখছে কে? দেখছে পুরুষ। মেয়েরাও দেখে নিশ্চয়ই, তারাও উপভোগ করে; কিন্তু দেখে পুরুষের দৃষ্টিতেই। শিল্পকলায় পুরুষের নগ্ন দেহের উপস্থিতি যে নেই তা নয়, আছে; কিন্তু তা তুলনায় কম। কিন্তু সেই দেহকে ততটা সুন্দর কখনোই বলা হয়নি, নারীর দেহকে যতটা সুন্দর বলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। শিল্পকলায় স্বেচ্ছা-নগ্নতা আর বাণিজ্যের হুকুমে কাপড় খুলে ফেলা—এ দুয়ের মধ্যে তফাতটা পরিষ্কার; জোছনা রাতের সঙ্গে অমাবস্যায় গাঢ় অন্ধকারের মতোই আমরা বলব। কিন্তু একটা ব্যাপার তো একই। সেটি এই যে দুটির কোনোটিতেই নারী বিষয়ী নয়, দুটিতেই সে বিষয় বটে। অন্যরা তাকে দেখছে, যেমন আকাশের চাঁদকে দেখে কিংবা বনের হরিণকে। হয়তো সে নিজেও দেখছে নিজেকে; কিন্তু দেখছে পুরুষের চোখে। অন্য মেয়েরাও দেখছে তাকে; কিন্তু দেখছে ওই যে পুরুষের চোখে, সেই চোখ দুটি দিয়েই।

এটা তো গেল নন্দনতত্ত্বের জগত্, বাণিজ্যের জগতের ব্যাপার তো একেবারেই আলাদা। নারীদেহ সেখানে কখনো বা পণ্যের বিজ্ঞাপন, কখনো বা নিজেই পণ্য। তার সার্থকতা অন্যের কামনা-বাসনা জাগানোয়। মেয়েরা মডেল হচ্ছে, সেই সাজে সাজছে, যা পুরুষ এবং পুরুষের দেখাদেখি মেয়েরাও পছন্দ করে। সবটাই ক্রেতা ধরার কায়দা। শ্রেণিটা এখন বেশ বড় হয়েছে; কিন্তু তারা সিনেমা হলে যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। তারা না যাওয়ায় যারা যায়, তাদের টানার ও টেনে ধরে রাখার জন্য যৌনতার মালমসলা ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাতেও কুলাচ্ছে না। যার দরুন অনেক সিনেমা হল এরই মধ্যে নিষ্প্রদীপ হয়ে গেছে, অনেকগুলো নিবু নিবু।

আমি নিজে দেখিনি, তবে বিজ্ঞাপন দেখে, কাগজে পড়ে অনুমান করতে পারি চলচ্চিত্রে কী ঘটছে। অনুমান আমার এক সহপাঠী বন্ধুও করছেন। তাঁর সঙ্গে আমি কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়েছি। এখনো যোগাযোগ রয়েছে। ছাত্রজীবনে তাঁকে ভীষণ বিষণ্ন্ন মনে হতো, এখনো মনে হয়। যেন পীড়িত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সেই ভাবটা এখনো ধরে রেখেছেন এবং সেদিন তাঁর পীড়া ও দুশ্চিন্তা আমাকেও স্পর্শ করল, যখন তিনি বললেন আমাকে যে চলচ্চিত্রের দুর্বৃত্তপনা তো এখন আর সিনেমা হলে আটক নেই, চলে এসেছে ঘরের ভেতরেও, নাটকের ছদ্মবেশে। সাহিত্যের ছাত্র তিনি, আমার মতোই। স্মরণ করলেন যে সাহিত্যের দোকানে, বিশেষ করে কমেডিতে কতগুলো সহজ পণ্য থাকে, যেগুলো নাট্যকাররা সরবরাহ করে সহজে বাজিমাত করতে চাইত। লোক হাসাত। যেমন—তোতলা, খোঁড়া, কানে খাটো, টাকওয়ালা—এ ধরনের মানুষকে নিয়ে আসত; কৌতুকের প্রয়োজনে বা প্রেমিক-প্রেমিকার অবৈধ প্রেমের দৃশ্যে স্বামীর কিংবা বৈধ দৃশ্য পিতার প্রবেশ ঘটাত। একালে দেখা যাচ্ছে, চলচ্চিত্রের সস্তা পণ্য হচ্ছে নারী নির্যাতন। মেয়েটিকে নিয়ে গুণ্ডারা টানাটানি করছে, তার জামাকাপড় খুলে পড়ছে, ধর্ষণ একেবারে অত্যাসন্ন, এই সময়ে হঠাত্ দেখা গেল নায়ক চলে এসেছে। সে গুণ্ডাদের মেরে হটিয়ে দিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করল, ততক্ষণে তার জামাকাপড় ভগ্নাংশে পরিণত হয়ে গেছে। জয় হলো সত্যের। কিন্তু দর্শক যা প্রাণভরে দেখল সেটা উদ্ধার নয়, সেটা হচ্ছে পীড়ন। সিনেমা হলে দর্শক নায়কের বীরত্ব দেখতে যায়নি। গিয়েছে নায়িকার দুর্দশা দেখতে এবং নিজের অজান্তে সে নায়ক নয়, পরিণত হয়েছে ধর্ষকে। প্রযোজক-পরিচালক ওটা জানে, যে জন্য তার মনোযোগও ওই নির্যাতনের দৃশ্যগুলোর ওপরই, উদ্ধারের দৃশ্যের ওপর নয়। আমার বন্ধু বললেন, এসব ছায়াছবির মধ্য দিয়ে যে বাণীটি প্রেরণ করা হচ্ছে, সেটি এই যে মেয়েদের জন্মই হয়েছে ধর্ষিত হওয়ার জন্য। নারীর বিপদ এবং তার উদ্ধারে এখন টেলিভিশনের নাটকেও চলে এসেছে। চলে এসেছে এমনকি মুক্তিযুদ্ধের নাটকীয় উপস্থাপনায়ও।

 মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দিকটি হচ্ছে যুদ্ধ। হানাদাররা মেয়েদের ওপর যে নির্যাতন করছে, তা তাদের চরিত্রকে যেমনভাবে উন্মোচিত করছে, তেমন উন্মোচন আর কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘটেনি। কিন্তু ওই নির্যাতন যে আমরা বাঙালিরা ঘটতে দিয়েছি, সেটা আমাদের জন্য গৌরবের ব্যাপার নয়। গ্লানির ব্যাপার বটে। আমার বন্ধুর বক্তব্য, জয়ের দিকটা না দেখিয়ে মেয়েরা লাঞ্ছিত হচ্ছে—ওই দৃশ্য দেখিয়ে নিজেদের আমরা গৌরবান্বিত তো করছিই না, উল্টো দর্শকদের কাছে এই বক্তব্য তুলে ধরেছি যে নির্যাতিত হওয়াই বুঝি মেয়েদের বিধিলিপি। চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা যা দেখাচ্ছে ব্যবসার স্বার্থে, টেলিভিশনে নাট্য প্রযোজকরা মাত্রার দিক থেকে না হলেও গুণের দিক থেকে সেই একই জিনিস দেখিয়ে চলেছে, শিল্প সৃষ্টির নাম করে। ওরা দেখাচ্ছে টাকার লোভে, এরা দেখাচ্ছে শিল্পবোধের অভাবের কারণে। আমার বিষণ্ন বন্ধুটি নাটক দেখেন, যা বলেছেন অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছেন। তিনি অ্যারিস্টটলের বক্তব্যও স্মরণ করিয়ে দিলেন আমাকে। মনে নেই, অ্যারিস্টটল কী বলেছেন নাটক সম্পর্কে? বলেছেন যে নাটকে প্লট, চরিত্র, ভাবনা, বচন ও সংগীত থাকবে। থাকবে দৃশ্যসজ্জাও, কিন্তু দৃশ্য হচ্ছে সব উপাদানের মধ্যে নিকৃষ্টতম। হত্যাকাণ্ড দেখানোর জন্য মঞ্চকে রক্ত দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়াটা কসাইয়ের পক্ষে স্বাভাবিক হতে পারে, নাট্যকারের পক্ষে একেবারেই অসংগত। বন্ধুটির বক্তব্যও সেটিই। ইঙ্গিতে যিনি বোঝাতে না পারেন, তিনি আবার শিল্পী কিসের? আমার বক্তব্যও তাঁর বক্তব্যের মতোই। চলচ্চিত্রে, মঞ্চে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়—যেখানেই হোক, যাঁরা নারীর লাঞ্ছনা প্রদর্শন করেন, তাঁরা নারীর সম্ভ্রম বৃদ্ধি করছেন কিংবা তাঁর নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছেন বলে যতই আত্মপ্রসাদ লাভ করুন না কেন, বাস্তবে যাকে উত্সাহিত করছেন, তা হচ্ছে সম্ভ্রমহানির বৃদ্ধি ও নিরাপত্তার অবনতি।

কথা প্রসঙ্গে অনেক বছর আগে বিটিভিতে বীরাঙ্গনাদের কয়েকজনের দুর্ভোগের বিবরণমূলক একটি অনুষ্ঠানের কথা উঠল। আমি দেখিনি, সহপাঠী বন্ধুটি দেখেছেন। তিনি আপত্তি করলেন। ওই একই আপত্তি। ওই বিবরণে অভাব ছিল শিল্পের; নাটকীয়তা বেদখল হয়ে গেছে অতি নাটকীয় বর্ণনার অসংবৃত তত্পরতায়। ফলে প্রযোজকের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি। দর্শকদের অনুভূতিতে ঘৃণার পরিবর্তে গ্লানি সৃষ্টি হয়েছে। হয়তো ওই বোধটিও নতুন করে সমর্থিত হয়েছে যে এই পোড়া দেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো একটি কঠিন বিড়ম্বনা এবং নির্যাতনই তার অনিবার্য বিধিলিপি।

ওই যে ‘বীরাঙ্গনা’ নামকরণ, ওতেও কিন্তু আমার আপত্তি আছে। গভীর আপত্তি। যুদ্ধে লাঞ্ছিত মেয়েদের ওই নাম দিয়ে যাঁরা ভেবেছেন লাঞ্ছিতদের সম্মানিত করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যের প্রশংসা করা গেলেও বিচার-বুদ্ধির প্রশংসা করা যাবে একজন নারীর পক্ষে লাঞ্ছিত হওয়া যে গৌরবের ব্যাপার নয়, গ্লানির ব্যাপার—এটা যাঁরা বোঝেন না, নিজেদের তাঁরা নারীর যত বড় বন্ধুই মনে করুক, আসলে তাঁরা অসংশোধনীয় রূপে পুরুষতান্ত্রিক। অথবা বলা যায়, তাঁরা নারীর তেমন বন্ধু, বিশ্বব্যাংক যেমন বন্ধু গরিব মানুষের। বন্ধু সেজে প্রভুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বীরাঙ্গনা বলে যাদের চিহ্নিত করে দিলেন, তাদের পক্ষে ওই মর্যাদা বহন করা ততটাই কষ্টকর হওয়ার কথা, যতটা পীড়াদায়ক হয়েছিল যিশুখ্রিস্টের জন্য, যে কাঠের গায়ে তিনি পেরেক বিদ্ধ হয়েছিলেন, সেই কাঠটি বহন করা। যিশু অসামান্য, তিনি ত্রাণকর্তা, এই মেয়েরা তো আপনার-আমার মতোই সাধারণ মানুষ, তাদের গলায় ওই বীরাঙ্গনা উপাধির বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া কেন? ওইভাবে চিহ্নিত মেয়েটি সমাজের কাছ থেকে বড়জোর করুণা পেতে পারে, সম্মান কখনোই পাবে না। আর দুর্বৃত্তরা? তারা তো ধরেই নেবে যে হানাদারদের হাতে যে মেয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে, তার কোনো অধিকার নেই ‘দেশপ্রেমিক’ পুরুষদের হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার। নিগূঢ়ার্থে বঞ্চিত করার।

আসলে পুরুষতান্ত্রিকতার ঐতিহ্য ও অভ্যাস এতই গভীরে প্রোথিত যে প্রভুত্ব করার লুকানো ইচ্ছার বাইরে গিয়ে নারীর প্রকৃত বন্ধু হওয়াটা খুবই কঠিন। ঔপন্যাসিক ডি এইচ লরেন্স মেয়েদের খুব ভালোভাবে জানতেন, প্রমাণ আছে তাঁর লেখায়; কিন্তু তিনিও বোঝা গেছে শেষবিচারে পুরুষতান্ত্রিকই ছিলেন। যেমন ছিলেন মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাসী কবি জন মিল্টন। আর নারীমুক্তির প্রশ্নটি যে শুধু মেয়েদের ব্যাপারে তা তো নয়, ব্যাপার সমগ্র সমাজের। এটা খুবই যথার্থ বক্তব্য যে সমাজে মেয়েদের অবস্থান দেখেই বলে দেওয়া যায়, সমাজটি কতটা উন্নত অর্থাত্ মানবিক। এই মানবিক মুক্তির জন্য নারীবাদী আন্দোলন চলছে। নারীবাদীরা সবাই যে সমস্যাটিকে অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে তা নয়, পার্থক্য আছে। কারো ধারণা, পুরুষতান্ত্রিকতার জবাব দিতে হবে নারীতান্ত্রিকতা দিয়ে। যেমন—আমাদের একজন লেখিকা অনেক বছর আগে একটি কবিতায় বলেছেন, পুরুষ যেমন মেয়ে ভাড়া করে, তিনিও তেমনি ছেলে ভাড়া করে আনবেন, শোধ নেবেন। এটি যে কোনো সমাধান নয়, সে তো বলাই বাহুল্য। কারো ধারণা, পুরুষের সমান হতে হবে। জামাকাপড়ে, আচার-আচরণে তো বটেই, স্বাধীনতায়ও। এদের বক্তব্য যা ইচ্ছা তা-ই করব। কিন্তু সেটি তো স্বাধীনতা নয়, উচ্ছৃঙ্খলতা বটে। যা ইচ্ছা তা-ই নয়, যা ভালো তা-ই করা দরকার।

 সর্বোপরি প্রয়োজন হচ্ছে পুরুষ ও নারীর মধ্যে প্রভু ও প্রজার সম্পর্কের জায়গায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। সেটি খুবই কঠিন কাজ। কেননা বন্ধুত্বের জন্য সমতা চাই। কোনো একটি ক্ষেত্রে নয়, বহু ক্ষেত্রে। মেয়েরা দেবী হতে চায় না, যেমন চায় না প্রজা হতে। কিন্তু কে করবে সমতা প্রতিষ্ঠার এই কাজ? ব্যক্তিই করবে; কিন্তু একা নয়, করবে সংঘবদ্ধ হয়ে। উদারনীতিকরা ভাবতে ভালোবাসেন যে ব্যক্তিই পারবে। ব্যক্তির ক্ষমতায় এই অতিরিক্ত আস্থাই হচ্ছে উদারনীতির কেন্দ্রীয় দুর্বলতা। আসলে সংঘবদ্ধতা ছাড়া শক্তি নেই। কবি টি এস এলিয়ট বিংশ শতাব্দীর নর-নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে যান্ত্রিকতা প্রবেশ করেছে, তা নিয়ে মর্মস্পর্শী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সমাধান কী, তা বলতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। তিনি উদার নন, রীতিমতো রক্ষণশীল। তাই তাঁর ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কবিতায় উপনিষদের উদ্ধৃতি দিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, আসুন আমরা সবাই পরস্পরের জন্য নিজেকে দান করি, সহানুভূতি জানাই এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু কাজ তাতেও হবে বলে মনে করার কারণ নেই। শুধু মেয়েদের নয়, সংঘবদ্ধ হওয়া চাই নারী-পুরুষ সবার, কেননা প্রশ্নটা সমাজের একাংশের মুক্তির নয়, সমগ্র সমাজের মুক্তিরই। আর সামাজিক বন্ধন যে শুধু বস্তুগত তা নয়, আদর্শিকও বটে। ওই আদর্শিক বন্ধনের কথাটিও যেন না ভুলি। সাঁতার আমরা কাটতেই থাকব, যতক্ষণ না ডাঙায় উঠছি।

অনুলিখন : শ্যামল চন্দ্র নাথ



মন্তব্য