kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

প্রতিরোধ, দ্রোহ ও পরাজয়ের মর্মভেদী চিত্রকল্প আঁকেন য়োসা

দুলাল আল মনসুর   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিরোধ, দ্রোহ ও পরাজয়ের মর্মভেদী চিত্রকল্প আঁকেন য়োসা

রিও বার্গাস য়োসা পেরুর ঔপন্যাসিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, প্রবন্ধকার এবং প্রফেসর। লাতিন আমেরিকার তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখকদের অন্যতম তিনি। লেখক জীবনের প্রথম থেকেই দেশে ও দেশের বাইরে পাঠকদের কাছে আদৃত হয়েছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। ২০১০ সালে পেয়েছেন নোবেল পুরস্কারও। নোবেল কমিটি উল্লেখ করে, ‘ক্ষমতার কাঠামোর মানচিত্রাঙ্কন এবং ব্যক্তির প্রতিরোধক্ষমতা, দ্রোহ ও পরাজয়ের মর্মভেদী চিত্রকল্পের জন্য’ তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

তিনি হতাশা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন লেখালেখিকে। ব্যক্তির স্বাধীনতা তাঁর কাছে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ বিষয়। লেখার মাধ্যমেই গণতন্ত্রের রক্ষকের ভূমিকা পালন করেন তিনি। কর্তৃত্ববাদের মূলে আঘাত করেন বলে সমাজন্ত্রের সমর্থকরা এমনকি রক্ষণশীলরাও তাঁকে শত্রু মনে করে। তাঁর কাছে শ্রদ্ধার বিষয় হলো মনের দৃঢ়তা ও শুদ্ধতা : মনের ভেতরের বিশ্বাস, বিশ্বাসের প্রকাশ এবং বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ—সব কিছুতে তিনি ঐক্য মেনে চলার পক্ষপাতী। তাঁর এ রকম মানসিক বিশ্বাসের কারণে ব্যক্তিগত জীবন এবং লেখালেখির জীবনের পথ অনেক কঠিনও হয়েছে।

ছেলেবেলার প্রথম অধ্যায় কেটেছে পরম সুখে। পরিবার ও মায়ের মধ্যবিত্ত সমাজের লোকদের চোখে আদরের ছিলেন তিনি। তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর বাবা স্বর্গে থাকেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতি রাতে বাবার ছবিতে চুমু খেতেন। জন্মের আগেই মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান বাবা আর্নেস্তো বার্গাস। ১৯৪৬ সালে মা-বাবার পুনর্মিলন হওয়ার পর শুরু হয় মারিওর কঠিন জীবন। মা-বাবা তখন লিমায় বসবাস শুরু করেন। আগের পরিবার এবং সমাজের অনেক মানুষকে ফেলে এসে ছোট পরিবারের পরিবেশ ভালো লাগে না। তখনই তাঁর ব্যাপক পড়াশোনার শুরু। ভিক্টর হুগো, চার্লস ডিকেন্স, বালজাক প্রমুখের লেখা পড়তে থাকেন। কষ্টকর জীবনের বাস্তবতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবেও বই পড়েন। কারণ সামান্য অজুহাতে বাবা মারিওকে বেদম মার দিতেন। বাবার কাছে ক্ষমা চাইলেও রেহাই পেতেন না। বাবা এ রকম সময়ে মারিওকে সেনাবাহিনীতে পাঠানোর ভয়ও দেখাতেন। রাতে নিজের রুমে শুয়ে ঘুমাতে পারতেন না মারিও। তখন বাবার হাতের মারের স্মৃতির চেয়ে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট করার স্মৃতিটাই তাঁর জন্য অসহ্য হয়ে উঠত। বাবার স্বৈরাচারী আচরণের বিপরীতে কবিতা এবং কথাসাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়। বাবা ছিলেন সাহিত্যের ঘোর বিরোধী। সাহিত্য সম্পর্কে বাবার মতামত ছিল : সাহিত্য হলো জীবনে ব্যর্থতার পাসপোর্ট; না খেয়ে মরার রাস্তা দেখিয়ে দেয় সাহিত্য। আর উপন্যাস হলো মাতাল ও সমকামীদের সৃষ্টি। মারিওর ১৪ বছর বয়সে বাবা তাঁকে লিওনসো প্রেডো মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন ছেলেকে মানুষ করার জন্য। এ প্রসঙ্গে মারিও বলেন, ‘বাবা বরং আমার প্রথম উপন্যাসের রসদ গোছানোর ব্যবস্থাই করে দিয়েছিলেন।’ সাহিত্যে আশ্রয় নিয়ে তিনি বাবার স্বৈরাচারী আচরণের জবাব দেন। 

মারিওর ওপর প্রথম দিকের প্রভাববিস্তারী লেখকদের মধ্যে ছিলেন মার্টিন আদান, কার্লোস ওকেন্দো দে আমাত, সেজার মোরোর মতো পেরুর অপেক্ষাকৃত কম বিখ্যাত লেখকরা। তবে কম নামকরা হলেও এঁরা সবাই নতুনত্বের সন্ধানী ছিলেন। নিজের সময়ের শহুরে জীবনের বহুমুখী অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য মারিও তাঁদের লেখার মধ্যে নতুন কাঠামো এবং বর্ণনাকৌশল খুঁজতেন। তবে তিনি শুধু পেরুর অগ্রজদের কাছেই লেখার কৌশল খোঁজেননি, পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার কথাসাহিত্যিকদের লেখার মধ্যে পছন্দের উপাদান ও কৌশল খুঁজেছেন। তাঁর কলাকৌশলের মধ্যে সার্ত্রে এবং ফ্লবেয়ারের ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়। মারিওর ব্যাপক কথোপকথনের নমুনায় সার্ত্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আর ফ্লবেয়ারের শৈল্পিক স্বাধীনতার প্রশংসা বরাবরই করেছেন মারিও। ফ্লবেয়ারের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে ‘দ্য পার্পেচুয়াল অর্গি’ নামে বইও লিখেছেন তিনি। মারিওর প্রিয় লেখকদের অন্যতম উইলিয়াম ফকনার। বলা যায়, তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন ফকনার। তাঁর মতে, ফকনার আধুনিক উপন্যাসের সৃষ্টিকৌশলকে নিখুঁত অবস্থায় নিয়ে গেছেন। হেমিংওয়ে, কামু, সার্ত্রে, ফ্লবেয়ার, মার্কেস প্রমুখের প্রতি রয়েছে তাঁর শৈল্পিক শ্রদ্ধাবোধ।

 



মন্তব্য