kalerkantho


বই আলোচনা

কুয়াকাটা থেকে মারাকেশ : পাহাড়, মরু ও সমুদ্রের গল্প

দীপংকর গৌতম   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



কুয়াকাটা থেকে মারাকেশ : পাহাড়, মরু ও সমুদ্রের গল্প

কুয়াকাটা থেকে মারাকেশ,নিজামুল হক বিপুল, প্রকাশক : বেহুলাবাংলা, মূল্য : ২৭৫ টাকা

 

 

 

নিজামুল হক বিপুল। ১৯৯২ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। এই সাংবাদিক সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ান। দেশ থেকে দেশান্তর। দেশের সৌন্দর্যের লীলাভূমি বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেছেন। নিসর্গের প্রতি সংগত কারণেই তাঁর টান মজ্জাগত। সুযোগ পেলেই তাই বেরিয়ে পড়েন দূর দিগন্তে নীঃসিম নীলিমায়। যেসব লেখা এর আগে লিখেছেন সাংবাদিক আবিদা নাসরিন কলি সম্পাদিত অনলাইন ‘প্রাণের বাংলা’য়। তারই কয়েকটি লেখার সম্মিলিত প্রকাশ তাঁর একটি বই। দীর্ঘ সৈকত আর সাজানো বেলাভূমির মনোহর সাগরতীর কক্সবাজার—কক্সবাজারকে তিনি ভিন্ন দৃষ্টিতে সাগরকন্যা কুয়াকাটা, মেঘের রাজ্য হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন পাঠকের সামনে। যদিও তাঁর প্রথম লেখাটিতে সবুজকন্যা সাজেক নিয়ে। বাংলার দার্জিলিংখ্যাত সাজেকের চারদিকে সারি সারি পাহাড় আর মাঝেমধ্যে সাদা তুলার মতো মেঘমালা। যেন সবুজের রাজ্যে সাদা মেঘের হ্রদের পারে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। নিশ্চয়ই ভাবছেন, স্বপ্নের মতো সুন্দর এ রকম দৃশ্য বাস্তবে আদৌ কি দেখা যাবে? আর দেখা গেলেও হয়তো যেতে হবে বহু দূরে কোনো অজানা দেশে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেই রয়েছে এ রকম এক মেঘপুরী যার নাম সাজেক ভ্যালি। বিস্তারিত বিবরণে উঠে এসেছে সাজেক। বাদ পড়েনি চান্দের গাড়িও। অসাধারণ বর্ণনায় উঠে এসেছে—নদীতে সূর্যের প্রতিবিম্ব, পারে সারি সারি গ্রাম, অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগরকন্যা কুয়াকাটা, যা পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত। ধান-নদী-খালের জনপদ বরিশাল যেখানে শেষ, সেখানে সাগরের গর্জন, নারকেল জিঞ্জিরার মোহনীয় দৃশ্যময় জনপদ কুয়াকাটা। কুয়াকাটা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। সমুদ্রের পেট চিরে সূর্য উদয় হওয়া এবং সমুদ্রের বক্ষে সূর্যকে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করা নিঃসন্দেহে দারুণ ব্যাপার।

এ সৈকতের পূর্ব দিকে এগুলোই প্রথমে দেখা যাবে নারকেল বাগান, প্রাণবন্ত আকৃতির ঝাউ বাগান। বন বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ঝাউগাছ লাগিয়ে সমুদ্রসৈকতের শোভা বর্ধন করা হয়েছে। সমুদ্রসৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুপাড়ায় প্রতিবছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত জেলেরা প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে তোলে শুঁটকিপল্লী। এ শুঁটকিপল্লীতে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে শুঁটকিতে রূপান্তরিত করে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। ফাতরার চর, লাল কাঁকড়ার এলাকা—সবই দর্শনীয় এলাকা।

বিচিত্র লেখাটি কালচারের শহর মারাকেশকে নিয়ে। জলবায়ু সম্মেলনকে ধরে মারাকেশ ভ্রমণ লেখকের। সেখানকার ইতিহাস অনেক বিস্তৃত ও ঘটনাবহুল। বিশেষত এটলাস হয়ে সাহারা, কাসভায় কিছুক্ষণ, উটের পিঠে আসীন হওয়ার আনন্দ যেভাবে বিধৃত হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, লেখার পরতে পরতে ভ্রমণের জায়গাগুলো সহজে চিহ্নিত করা সহজ।

এটলাস পর্বত থেকে নেমে আসা ওউজুদ জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত মারাকেশ। চমত্কার হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলে গাড়ি। এখানকার মাটি ধূসর লাল। বাড়িঘরের রংও একই। ছোট ছোট পাথর আর মাটির পাহাড়ে বিস্তৃত খালি প্রান্তর। কোথাও সবুজ, কোথাও ধূসর। মাঝেমধ্যে বিশাল বিশাল অলিভ বাগান ও মাঝেমধ্যে গড়ে ওঠা বাড়িঘর। দেশের সরকার অলিভ ও কৃষির ওপর জোর দিয়েছেন, অধিবাসীর ৪৫ শতাংশ কৃষি, পশু চরানো ও মত্স্য শিকারে জড়িত। কৃষিই দেশের তৃতীয় বৃহত্ আয়ের উত্স। প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযে ভরা বেনি মেল্লাল, আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্ জলপ্রপাত ওউজুদের পাশ দিয়ে আমাদের চলে যাওয়া—সে এক ভিন্ন অনুভূতি। এই ভ্রমণ বইয়ের আনন্দটা অন্য জায়গায়। মারাকেশ বা আফ্রিকার গল্প পড়ে যখন পাঠক ভাববে বই শেষ, তখনই ভেসে উঠবে ইউরোপের দেশগুলোর বর্ণনা। শিল্পের দেশ ফ্রান্স, রাজধানী প্যারিস, আইফেল টাওয়ারের নিচে হিমে ভিজে জবুথবু আবার দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার মুখোমুখি—এ তো বনলতা সেনের মতো আরেক বিস্ময়। বাংলা অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত ভার্সাই, প্রাচীন সভ্যতার শহর রোম, সেখানকার ট্রেন জার্নির এপাশ-ওপাশ, উঠে এসেছে ভিয়েনা, পোল্যান্ড, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রাসাদের বিবরণ। অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ও এড়িয়ে যাননি লেখক। উল্লেখযোগ্য কিছুই বাদ পড়েনি এ লেখায়। আল্পস-জুরিখের বরফের হিমের স্পর্শ মেলে এ লেখায়। ছোট পরিসরে বিশাল ভ্রমণের এ অভিজ্ঞতা ভ্রমণপিপাসুদের উজ্জীবিত করবে। ‘চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ। পাহাড়ের পর পাহাড়, একেবারে চূড়া থেকে সমতল পর্যন্ত বরফে ঢাকা।’ (পৃষ্ঠা ৮৭) এটুকু বর্ণনার মধ্যেই বোঝা যায় লেখকের রসবোধ। এককথায় ভ্রমণের বই হিসেবে বইটি পাঠ উপোযোগী এবং ভ্রমণ গাইডের সমার্থক।  ভ্রমণ গাইড হিসেবেও এ বই পাঠককে আনন্দ দেবে, উদ্বুদ্ধ করবে ভ্রমণে। বইটির সফল প্রচার কামনা করি।

 

 



মন্তব্য