kalerkantho

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ত্ স্য গ ন্ধা

মত্স্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



মত্স্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

‘ওদের একজন তুমি! মাছের পেটে মানবশিশু! একজন নয়। দু-দুজন!’

প্রায় চিত্কার করে উঠলেন ঋষিপরাশর।

ঋষির উচ্চকণ্ঠে মত্স্যগন্ধা, বিচলিত হলো না। করুণ চোখে ঋষির দিকে একবার তাকাল। তারপর কণ্ঠকে একেবারে খাদে নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ঋষিবর, মাছের পেটেই আমাদের জন্ম।’

‘আমাদের।’

‘আমার এবং আমার ভাইয়ের জন্ম অদ্রিকা নামের ওই মত্স্যার গর্ভে।’ ‘তোমার ভাই। সে এখন কোথায়!’ পরাশর মুনির বিস্ময়ের সীমা থাকে না।

‘সে কথা পরের। তার আগেরও অনেক কাহিনি। আগে ওই ঘটনা বলি?’

‘বলো বলো।’

‘সেদিন দাশপ্রধান সিন্ধুচরণের উঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে উপস্থিত সবাই একেবারে বোবা হয়ে গেল। এ কী আজব ব্যাপার। মাছের পেটে মানুষের বাচ্চা! তা-ও আবার দু-দুটো।’

‘তাই তো হওয়া উচিত।’ পরাশর বললেন।

‘সবার অবাক করা চোখের সামনে ভবানী ছুটে এলো বাচ্চা দুটির কাছে। এক ধরনের হাহাকার বেরিয়ে এলো নারীটির বুক চিরে। এই হাহাকার আনন্দের না বেদনার বুঝতে পারল না সমবেতদের কেউ।’

‘তারপর! কী করল ভবানী?’

‘শিশু দুটিকে বুকের কাছে, না না একেবারে বুকের নিকটে টেনে নিল আমার মা।’

‘মা!’

‘হ্যাঁ, মা-ই তো! ভবানীই তো আমার মা।’

‘এই না বললেন, অদ্রিকার গর্ভে...।’

মুনির কথা শেষ করতে দিল না মত্স্যগন্ধা। বলল, ‘ঠিকই তো ভবানীই তো আমার আসল মা। অদ্রিকা আমাকে পেটে ধরেছে; কিন্তু লালন-পালন করে বড় করে তুলেছে তো ভবানীই। তাইতো ভবানীই আমার প্রকৃত জননী।’ আবেগে থরথর করে কাঁপছে মত্স্যগন্ধা।

ঋষি পরাশর মত্স্যগন্ধার আবেগের মাহাত্ম্য বুঝতে পারলেন। মুনি ভাবলেন—এই সময় তাঁর কথা বলা ঠিক হবে না। তাই তিনি চুপ করে থাকলেন।

আবেগ সংযত করল মত্স্যগন্ধা। নৌকাটি অতি ধীরে সামনের দিকে এগোতে থাকল। মত্স্যগন্ধা মুনিবরের সামনে তার জন্ম-ইতিহাস বলে গেল।

অভিশপ্ত ছিলেন অদ্রিকা। অদ্রিকাকে আপনি নিশ্চয়ই চেনেন মুনিবর। স্বর্গের অপ্সরা। অপ্সরাদের বেদনার জীবন। এঁদের কোনো নিজের করে জগত্ নেই, নিজস্ব কোনো দুঃখ নেই, একান্ত কোনো সুখ-উল্লাসও নেই। তাঁদের জন্মই যেন শুধু অন্যের মনোরঞ্জন করার জন্য। যাঁরা উল্লসিত হচ্ছেন, তাঁরা কোনো দিন খোঁজ রাখেন না, অপ্সরারা সুখ পেল কি না।

আপনি তো জানেন ঋষিবর, স্বর্গজুড়ে অনেক অপ্সরা। বিখ্যাত অপ্সরার সংখ্যাও কম নয়। অলম্বুষা, বিদ্যদ্বর্ণা, তিলোত্তমা, উর্বশী, পূর্ণিতা, হেমা, মেনকা, ঘৃতাচী, মিশ্রকেশী, ক্ষেমা, রম্ভা, শারদ্বতী—এঁরা প্রধান। অদ্রিকাও প্রসিদ্ধ অপ্সরাদের একজন। অদ্রিকার বাবা প্রজাপতি কশ্যপ। আর মা দক্ষকন্যা।

অপ্সরারা শুধু দেবতাদের মনোরঞ্জনে নিয়োজিত নন, স্বার্থ-উদ্ধারের জন্য তাঁরা এই অপ্সরাদের ব্যবহারও করেন। দেবতাদের রাজা ইন্দ্র। স্বর্গ তাঁর রাজধানী। স্বর্গের নিরাপত্তা আর দেবতাদের স্বার্থরক্ষার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র এই অসহায় অপ্সরাদের মন্দ কাজে প্ররোচিত করেন।

দীর্ঘদিন ধরে যমুনা পারে এক মুনি তপস্যায় রত হয়েছেন। তাঁর অভিলাষ—তিনি অমর হবেন। কিন্তু অমরত্ব তো শুধু দেবতাদের জন্য, মানুষেরা কী করে অমরতা পাবে? কিন্তু মুনি তাঁর ধ্যানে অনড় এবং নিমগ্ন। ব্রহ্মা মুনির তপস্যায় সন্তুষ্ট হলেন। ঠিক করলেন—বন্দনারত মুনিকে অমরত্বের বর দেবেন। কিন্তু ইন্দ্র তা মানবেন কেন? ব্রহ্মা মুনির কাছে পৌঁছানোর আগেই মুনির ধ্যান ভাঙাতে হবে। ধ্যাননিযুক্ত মুনিকে ব্রহ্মা পছন্দ করেন না। তাই মুনিকে ধ্যানচ্যুত করতেই হবে। কিন্তু কী করে ভাঙাবেন? কেন, নিন্দিত কূটকর্মে ব্যবহারের জন্য অপ্সরারা আছেন না? স্বর্গরাজ ইন্দ্র অদ্রিকাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘অদ্রিকা, তুমি শিগগির যমুনা পারে যাও। সেখানে এক মুনি অমরত্ব লাভের জন্য কঠিন তপস্যায় মগ্ন হয়েছেন। যে করেই হোক, তাঁর ধ্যান ভেঙে দিতে হবে। তাঁকে প্ররোচিত করতে হবে।’

‘অদ্রিকা বললেন, কী করে ভাঙাব? কিসের প্রতি প্ররোচিত করব?’

ইন্দ্র এবার হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘এমনভাবে বললে, যেন তুমি কচি খুকি! যেন এর আগে কোনো মুনিকে ধ্যানচ্যুত করোনি!’

ইন্দ্রের কথায় অদ্রিকা চুপ করে থাকলেন।

ইন্দ্র বললেন, ‘যাও! যে করেই হোক মুনির ধ্যান ভাঙাও।’ কণ্ঠ নিচে নামিয়ে বললেন, তোমার দেহে অফুরান যৌবন, চোখে বিলোল কটাক্ষ। তোমার চোখ, তোমার কুচযুগল, তোমার রূপ, যৌবন—এসবের প্রতি প্রলুব্ধ করে তোলো মুনিকে। ধ্যানজ্ঞান বেমালুম ভুলে গিয়ে মুনি তোমাতে মগ্ন হবে।’

‘অদ্রিকা কি গিয়েছিল?’ পরাশর মত্স্যগন্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘না গিয়ে কি উপায় আছে ঋষিবর? গিয়েছিলেন আমার মা।’ মত্স্যগন্ধা বলল।

‘তোমার মা! আবার কোন গোলকধাঁধার কথা বলছ মত্স্যগন্ধা?’

‘এ কথা পরে বুঝতে পারবেন মুনিবর।’ বলে মত্স্যগন্ধা আগের কাহিনিতে ফিরে গেল।

এ মুনি সাধারণ মুনি নন। তিনি তপনিষ্ঠ। ব্রহ্মানুরাগী। অমরতা আকাঙ্ক্ষী। ইন্দ্রের নির্দেশে অদ্রিকা মুনির কাছে গেলেন। দেখলেন—মুনির চোখ নিমীলিত। ধ্যানে একেবারেই নিমগ্ন তিনি। অদ্রিকার মনে হলো, তিনি বাহ্যজ্ঞানরহিত। বাহ্যজগত্ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন যিনি, তাঁকে কী করে প্রলুব্ধ করা যায়? অদ্রিকার নিজের যে মনোলোভা যৌবন, মনোহরণকারী দেহসৌষ্ঠব, তা তো এখানে অকার্যকর। যে চোখ দিয়ে মুনি দেখেন, তা-ও তো বন্ধ!

কী করবেন এখন অদ্রিকা? ফিরে যাবেন? ইন্দ্রের কোপানলের কথা মনে পড়ে গেল অদ্রিকার। ব্যর্থ হয়ে ফিরলে ইন্দ্র যে তাকে ধূলিসাত্ করে ছাড়বেন। না, কার্যসিদ্ধি না করে কিছুতেই স্বর্গে ফেরা যাবে না।

একটা বুদ্ধি বের করলেন অদ্রিকা। মুনি যমুনাকূলে যোগাসনে বসে তপস্যা করছিলেন। অদ্রিকা ভাবলেন—নারী দেহাস্পর্শে যেকোনো পুরুষ বিচলিত হয়, হতে বাধ্য। তিনি যদি মুনির ঊরুতে গিয়ে বসেন, তাহলে তিনি চঞ্চল হয়ে উঠবেন। চোখ খুলবেন। বিভোর হবেন। তখনই তপস্যাভ্রষ্ট হবেন তিনি।

যা ভাবলেন অদ্রিকা, তা-ই করলেন। কোমল নবনীত দেহটাকে মুনির জানুতে ছড়িয়ে দিলেন। মুনি শিহরিত হলেন। অদ্রিকার দিকে গভীর চোখে তাকালেন। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। নিজেকে কঠোরভাবে দমন করলেন তিনি। রক্তময় চোখ দুটি দিয়ে অদ্রিকাকে ভস্মীভূত করতে চাইলেন।

অদ্রিকা ভেবেছেন—তাঁর কার্যসিদ্ধি হয়ে গেছে। এই বুঝি মুনিবর তাঁকে বুকের কাছে টেনে নেবেন। মুনির আকর্ষণে সাড়া দেওয়ার জন্য অদ্রিকা দেহটিকে প্রস্তুত করলেন।

কিন্তু একি! মুনি যে তাঁকে প্রচণ্ড এক ধাক্কায় মাটিতে ফেলে দিলেন! তিনি যে ক্রোধান্বিত চোখে তাঁর দিকে তাকাতে লাগলেন! তিনি ডান হাতের তর্জনীটা তাঁর দিকে এ রকম করে তুলছেন কেন?

এই সময় মুনির কর্কশ কণ্ঠ শুনতে পেলেন অদ্রিকা, ‘দুষ্ট রমণী, আমার সর্বনাশ করলে তুমি! আমাকে স্বধর্মচ্যুত করলে! আমার এত দিনের সাধনা বিনষ্ট করে দিলে?’

ভাবনার বিপরীত আচরণ দেখে অদ্রিকা স্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি বুঝলেন—এ মুনি অন্য রকম।

মুনির বজ্রকণ্ঠ তাঁর কানে ধাক্কা দিল, ‘স্বৈরিণী। স্বর্গবেশ্যা! অভিশাপ দিচ্ছি তোকে। মত্স্যীতে রূপান্তরিত হ তুই। অভিশপ্ত হয়ে এই যমুনা জলে তুই কলিযুগ পর্যন্ত বাস করতে থাক।’

অদ্রিকা মুনির পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন। বিহ্বল গলায় বললেন, ‘আমায় ক্ষমা করুন মুনিবর। আমি স্বেচ্ছায় এই অপরাধ করিনি। বাধ্য হয়ে করেছি। স্বর্গরাজ ইন্দ্র আমাকে বাধ্য করিয়েছেন।’

এরপর আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লেন অদ্রিকা। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমায় ক্ষমা করুন প্রভু, মাফ করুন আমায়।’

অদ্রিকার অনুনয়ে মুনির ক্রোধ স্তিমিত হয়ে এলো। বললেন, ‘তোমার অনুতাপ দেখে আমার ক্রোধ কমে এসেছে। কিন্তু অভিশাপ তো তোমাকে ভোগ করতেই হবে।’

অদ্রিকা চোখের জলে মুনির পা ভিজিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘শাপমুক্তির উপায় বলুন ঋষিবর।’

অদ্রিকার প্রার্থনায় নরম হয়ে দয়ালু মনি বললেন, ‘মত্স্যরূপিনী অবস্থায় দুটি মানবসন্তান প্রসব করলে তুমি অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে, কন্যা।’

মুনিবর আবার নিজ ধ্যানে মগ্ন হয়ে পড়লেন। অভিশপ্ত অদ্রিকা মত্স্যরূপ ধারণ করে যমুনা জলে বাস করতে লাগলেন।

‘বুঝলাম—তুমি ওই দুই মানবসন্তানের একটি। বুঝলাম, তুমি মত্স্যরূপিনী অদ্রিকার গর্ভে জন্মেছ। কিন্তু বাসবী, কোনো নরের দৈহিক সংযোগ ছাড়া তো কোনো মানবসন্তান জন্মাতে পারে না। অন্তত...।’ এর পরে আরো কিছু একটা বলতে চাইলেন পরাশর।

ঋষির মুখের কথা কেড়ে নিল মত্স্যগন্ধা। বলল, ‘জানি ঠাকুর। কিন্তু বিধির বিধান খণ্ডাবে কে? এই মত্স্যার সঙ্গে একজন মানবের দৈহিক সম্পর্ক হয়েছিল। তবে...।’

‘তবে! তবে কী মত্স্যগন্ধা!’ পরাশর ঋষির বিস্ময়ের সীমা থাকে না।

মত্স্যগন্ধা রহস্যেভরা গলায় বলল, ‘তবে পরোক্ষ সম্পর্ক হয়েছিল।’

‘পরোক্ষ সম্পর্ক!’

‘হ্যাঁ, মুনিবর। সেই রাজার সঙ্গে মত্স্যারূপী অদ্রিকার পরোক্ষ দৈহিক সম্পর্ক সংঘটিত হয়েছিল।’

‘তা কী করে সম্ভব মত্স্যগন্ধা? নরের সঙ্গে মত্স্যার। তার ওপর বলছ, সেই নর একজন রাজা!’

‘তাহলে যে আপনাকে আরেকটা বৃত্তান্ত শুনতে হবে মুনিবর।’

‘শুনব, শুনব আমি। বলো তুমি।’ তারপর দূরে নিজের দৃষ্টিকে প্রসারিত করলেন পরাশর। বললেন, ‘তুমি দ্রুত বৈঠা চালিয়ো না তন্বী। ধীরে চালাও। যাতে সময় বেশি ক্ষেপণ হয়। কূলবর্তী হতে যাতে সময় বেশি লাগে।’

‘কিন্তু মুনিবর, আপনি যে বলেছিলেন—আপনার তাড়া আছে ভীষণ।’

‘ছিল, এখন নেই। তোমার এই অদ্ভুত অবিশ্বাস্য জন্মকাহিনির সম্পূর্ণটা শুনতে না পারলে আমার মনটি অতৃপ্তিতে ভরে থাকবে। বিলম্ব হয় হোক। তুমি তোমার কাহিনি শেষ করো।’ বিচলিত ঋষি বললেন। ‘তাহলে শুনুন ঋষিবর।’ বলল মত্স্যগন্ধা।

চেদিরাজ্য। পুরুবংশীয়রা এ রাজ্যের রাজা। পুরুষানুক্রমে চেদিরাজ্য শাসন করছে এই বংশ। এই বংশের প্রথম রাজা অজমীঢ়। তাঁর পুত্র ঋক্ষ। ঋক্ষের রাজত্ব শেষ হলে রাজা হলো ঋক্ষপুত্র কৃতক। কৃতকের পর চেদিরাজ্যের রাজা হলেন উপরিচর। উপরিচর তাঁর আসল নাম নয়। প্রকৃত নাম বসু। তিনি দোর্দণ্ড প্রতাপী। সুশাসক। প্রজারঞ্জক। সদগুণের জন্য বসু পরবর্তীকালে উপরিচরবসু নামে খ্যাত হন।

কালে কালে সব শত্রু দমন করলেন উপরিচর। শত্রুমুক্ত রাজ্য সুখে-স্বস্তিতে ভরে থাকে। চেদিরাজ্যও তাই। এ দেশের জনগণের সুখের শেষ নেই, চেদিরাজ্যের ঐশ্বর্য অপার।

একসময় উপরিচরের লোভ হলো—স্বর্গের রাজা হবেন তিনি। স্বর্গরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করবেন। কিন্তু কিভাবে পরাজিত করবেন? তিনি জানেন—দেবতা আর মানুষের যুদ্ধে মানুষেরই পরাজয় হয় সর্বদা। কারণ দেবতার মতো নির্মমতা আর কূটবুদ্ধি মানুষের নেই। কূটচালে সহজেই দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে পরাস্ত করবেন। গভীরভাবে ভাবলেন বসুরাজ।

উপরিচর কৌশলের আশ্রয় নিলেন। তপোবনে গিয়ে কঠোর তপস্যা আরম্ভ করলেন রাজা। তাঁর কঠোর তপস্যায় শুধু ইন্দ্র নন, অন্য দেবতারাও উদ্বিগ্ন হলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন—উপরিচর নিশ্চয়ই ইন্দ্রত্ব লাভের জন্য এমন কঠিন সাধনা শুরু করেছেন। ইন্দ্র বুঝতে পারলেন—কোনো অপ্সরা লেলিয়ে দিয়ে বা অন্য কোনো ওপরচালাকির আশ্রয় নিয়ে বসু রাজার মন টলানো যাবে না। তাহলে কী করা? বুদ্ধিতে দেবরাজ ইন্দ্রও কম কিসে? তিনি চাটুবৃত্তির আশ্রয় নিলেন। মুখ্য দেবতাদের উপরিচরের কাছে পাঠালেন তিনি। রাজার সামনে দেবতারা তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুরু করলেন। প্রশংসায় কার না মন গলে? চেদিরাজও বিগলিত হলেন। তপস্যা ছেড়ে রাজ্যশাসনে মন দেওয়ার জন্য রাজাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন দেবতারা। উপরিচর তাতে রাজি হয়ে গেলেন। ইন্দ্রের কূটচাল সার্থক হলো।

দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে চেদিরাজ উপরিচরের মিত্রতা হয়ে গেল। নানা উপহারে রাজাকে ভূষিত করলেন ইন্দ্র। বললেন, ‘আজীবন আপনার বন্ধু হয়ে থাকব আমি নৃপতি। দুঃখে, সংকটে আপনার পাশে থাকব। চেদিরাজ্য যাতে ঐশ্বর্য আর প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তারই চেষ্টা করে যাব আমি।’

ইন্দ্রের কথা শুনে বসুরাজ আনন্দিত হলেন। অরণ্যের তপস্যাস্থল ছেড়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন চেদিরাজ।

ইন্দ্রের এ রকম নিবিড় বন্ধুত্বের একটা প্রতিদান তো দিতে হয়। ‘কী করলেন রাজা উপরিচর?’ মত্স্যগন্ধার ওপর কোমল দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞেস করলেন ঋষি পরাশর।

মত্স্যগন্ধা বলল, ‘অগ্রহায়ণের শুক্লপক্ষে বসুরাজ রাজধানীতে ফিরলেন। ফিরেই ঘোষণা দিলেন, ইন্দ্রের কল্যাণে মহাসমারোহে যজ্ঞ করবেন তিনি। করলেনও। দেবরাজ ইন্দ্র এই যজ্ঞানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলেন। ইন্দ্র সপরিবারে উপস্থিত হলেন এই যজ্ঞে। ফিরেও গেলেন একসময়।’ বলে মত্স্যগন্ধা থামল একটু।

ঋষিবর অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারপর কী হলো?’ মত্স্যগন্ধা স্থির কণ্ঠে বলল, ‘তারপর সেই ঘটনাটি ঘটল।’

ঋষি বললেন, ‘কোন ঘটনাটি?’

► চলবে



মন্তব্য