kalerkantho


চিনলি নে মন কোথা সে ধন

আজাদুর রহমান

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



চিনলি নে মন কোথা সে ধন

অঙ্কন : মাসুম

গুরুর প্রভেদ আছে। যেমন দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু। দীক্ষাগুরুর নিচের পদে থাকেন শিক্ষাগুরু। যিনি দীক্ষা দেন তিনি সর্বক্ষেত্রে শিক্ষা না-ও দিতে পারেন। দীক্ষাগুরু সুফিবাদে পীর, মুর্শিদ কিংবা সায়েকের সমপর্যায়ে পড়েন। লালনবাদে তিনি গুরুশ্রেষ্ঠ, সাঁই। গুরুবাদী মানবধর্মের আপাত-মূলকথা ভক্তি। ভক্তিতে মুক্তি।

ভবে মানুষগুরু নিষ্ঠা যার।

সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার।

প্রবল আনুগত্য, একাগ্রতা, কঠোর ত্যাগ-সাধনা শেষে দেখা মেলে পরমপুরুষের, যিনি পথিকৃত্, পথ দেখান। অপারজ্যোতির প্রেমবানে ভাসতে থাকেন ফকির লালন—

আল্লাহর নামের নাই যে তুলনা

সাদেক দিলে সাধলে বিপদ থাকে না

সে খুলবে তালা, জ্বলবে আলা

দেখতে পাবে জ্যোতির্ময়।

গুরুর কাছে ভাবের ঘরের চাবি আছে। চাবি মানে সমর্পণ। সব আত্ম-অহমিকা ভুলে সহজ মানুষরূপে আপনাকে আবিষ্কার করা। গুরুভক্তি মানে এই নয় যে শিষ্যকে গুরু তাঁর দাসে পরিণত করতে চান; বরং গুরুই শিষ্যের মনের মানুষ, কাণ্ডারি। সমর্পণের পথটাই এ রকম—মানুষ গুরুকে ঠিকানা মেনে নিজকে পূর্ণ প্রাণে তাঁর চরণে দাখিল হওয়া। অতঃপর গুরুপথেই ভক্ত আত্মজ্ঞান ফানা করে ক্রমে সাধনজগতে প্রবেশ করতে থাকেন।

গুরু শিষ্যকে ভক্তি দেওয়া শেখান। ভক্তি ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। ভক্তির বাহ্যিক প্রকাশেও থাকে আলংকারিক ভঙ্গিমা। সাক্ষাতে তাঁরা পরস্পর হাত জোড় করে প্রণতি জানান। চোখে চোখে ভাববিনিময়। দৃষ্টিবিনিময়ে এ তখন অপূর্ব এক মিলনখেলা। গুরুই শিষ্যের মনের মানুষ।

গুরু শিষ্য হয় যদি এক তার

সমন বলে ভয় কী রে আর

গুরু নামের সুধাসিন্ধুতে বিন্দুরূপে পান করলে দীনবন্ধু মেলে। লালনকথায় যারে (গুরু) ভাবলে পাপীর পাপ হরে, দিবানিশি ডাকো তারে। ভাবশিষ্যরা তাই নিগূঢ়ভাবে গুরুপ্রাণ হয়ে ওঠেন। যেমন—আখড়াবাড়ির বাউল ইয়াসিন শাহ, তাঁর দীক্ষাগুরু ফকির আজিজ শাহ্ রেলওয়েতে গেটম্যানের চাকরি করতেন। ইয়াসিনের কাছে সেই তো পরমপুরুষ—‘গুরু যারে দয়া করে, সে-ই জানে গুরুদেশের কথা, অনেক ভাগ্যের ফলে সে চাঁদ (গুরু) দেখতে পাওয়া যায়, অমাবস্যা নেই সে চাঁদে; দ্বিতলে তাঁর কিরণ উদয়—আমার গুরু খুব ভালো মানুষ ছ্যালো।’ ফকির ইয়াসিন বিশ্বাস করেন, সাধক হতে গেলে চাতকস্বভাব থাকতে হবে। কবে অমৃত পাওয়া যাবে, সেই আশায় বসে থাকতে হবে। গুরুর কাছেই জানা যায় চাতকস্বভাব। লালনভক্তির বিষয়ে বৃদ্ধ বাউল ফকির নিজামুদ্দিন শাহেক একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি হেসে ফেললেন, ‘দ্যাকেন তো কতা; তাঁর জন্যই তো সম্পূর্ণ জীবন-যৌবন অর্পণ করেছি। চোখ বন্ধ করলে গুরু কোকিল শাহকে পরিষ্কার দেখতে পাই।’ ৮৫ বছরের নিজামুদ্দিনের গুরু ফকির কোকিল শাহ্ ফকির লালনের পুত্রস্নেহে লালিত ভোলাই শাহের শিষ্য ছিলেন। গুরু সম্পর্কে প্রায় সব বাউলেরই প্রগাঢ় আকুতি লক্ষ করা যায়—গুরুই তাঁদের সাধনার প্রাণপ্রবাহ।

স্মরণোত্সব, ০৮-এ দূরাগত এক যুবক বাউলকে দেখলাম, কোকিল শাহের কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে দুই হাত মেলে আর্তনাদে গান ধরেছেন—গুরু এবার সময় হলো না, আর দেখা হলো না গুরু...। সাধুরা প্রত্যেকেই নিজস্ব ব্যঞ্জনায় তাঁদের গুরুকে ভক্তি নিবেদন করে থাকেন।

গুরুই মূলত সাধনমোকাম। যার সঙ্গে যার ভালোবাসা, ব্যবহারে যায় জানা। ভক্তিমান শিষ্য ভক্তিতে নুয়ে পড়েন গুরুর চরণ যুগলে। গুরুপানে আত্মনিবেদন আর নিষ্ঠাই শিষ্যদের শ্রেষ্ঠ আরাধনা। ঢাকার বাউল জাহাঙ্গীর শাহ্ বললেন, ‘গুরু তো ওপরেই থাকবেন; আমি নিচে থাকতেই চাই।’ গুরু নিয়ে আখড়াবাড়ির বজলু শাহ খোলাকথা বলেন, ‘আমার উনিই তো সব।’

পোড়াদহের রহিম ফকিরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনার গুরু কেমন মানুষ ছিলেন? উত্তর দেওয়ার আগে তিনি কপালে আঙুল তুললেন। তারপর বিনীত কণ্ঠে বললেন, ‘গুরুভক্তি মানে গুরুর খেদমত করা। গুরুর দাসত্ব মানা। গুরুবাক্য মান্য করা। আমার গুরু ১৯৯৬ সালে মারা গেছেন। তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। বড় সাধক। উনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউলদের ডিসি ছিলেন। গুরুর জন্য প্রতিবছর ২০ ও ২১ বৈশাখ স্মরণোত্সব করি। শোনেন, মানুষকে গুরু ভেবে ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। গুরুর বর্জখ আনলেই স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায়। বর্জখের ওপরে ধ্যান। ধ্যানের ওপরে দেখা-সাক্ষাত্-সাধনা। অদেখার ধর্ম নেই। ধর্ম দেখাতে।’

শত-ঊর্ধ্ব ফকির দুর্লভ শাহ চোখে ঠিকমতো দেখতে না পেলেও তালি বাজিয়ে জোরেশোরেই গান করেন। গুরুভক্তিতে তাঁর কথা হলো—‘আমার ভেতরে যে খোদা আছেন, সেই খোদা দিয়ে গুরুর ভেতরের খোদাকে ধরতে হবে; তবেই তো পাওয়া যাবে সেই খোদাকে।’ দুর্লভ শাহের মতামতটা অন্য রকম হলেও প্রায় সব শিষ্যই অনুরূপ বিশ্বাস করেন।

কেউ কেউ তো আবার সরাসরি গুরুর সঙ্গে দেবতা কিংবা ঈশ্বরকেও তুলনা করে ফেলেন। বাউল হাবিব রহমানের কথাই ধরা যাক। কুষ্টিয়ার থানাপাড়ার হাবিব গুরুর হাত ধরেছিলেন ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়। এরপর অনার্স, মাস্টার্সের পর পুরোপুরি বাউল হয়েছেন। হাবিবের কাছে গুরুই বড়। এমনকি ফকির লালনকেও তিনি গুরুর ওপরে ভাবতে পারেন না। কারণ হিসেবে হাবিব জানান, ‘গুরুই আমাকে সত্যপথ দেখিয়ে দিয়েছেন। সত্য-মিথ্যার ভেদাভেদ বুঝিয়ে জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছেন। এখন কোনো দেবতা এসেও যদি বলেন, আমি তোমার গুরুকে সৃষ্টি করেছি, আমি গুরুরও বড়। লাভ হবে না, তবু আমি গুরুকেই ওপরে রাখি। কেননা দেবতা তো মানুষরূপে গুরুর মাধ্যমে আমাকে জ্ঞান সঞ্চার করেছেন।’

সাতক্ষীরার বাউল কার্তিক দাসের কাছে গুরুই যেন সাক্ষাত্ খোদা। তাঁর মতে, গুরু যদি বেশ্যালয়েও যান, তবুও তিনি পতিত পাবন। গুরুকে অবলম্বন করার পক্ষে কুমারখালীর আব্দুর রশিদ বাউলের যুক্তি হলো—‘প্রাইভেট মাস্টারের কাছে পড়লে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না। অন্যদিকে স্কুলের মাস্টার পড়া দেয়; পড়া নেয়। সেখানে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। প্রাইভেট মাস্টার পড়ায় ভালো, কিন্তু ডিগ্রি দিতে পারেন না। সে জন্য মানবশিক্ষার মধ্যেও মাধ্যম লাগে এবং গুরুর দরকার হয়। তরিকার মধ্যে দাখিল না হলে আমি নবীর উম্মত বা খোদার বান্দা হতে পারব না।’

চাল-পানি দিয়ে সাধনার ক্লাস শুরু। তারপর চাতকের মতো বসে থাকতে হয়, কবে অমৃত পাওয়া যাবে, সেই আশায়। পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘপরিক্রমা। স্থূল পর্যায় পার হয়ে প্রবর্ত। প্রবর্তের পরে আসে সাধক। আর সাধক হলেই সিদ্ধি। সাধু জনমটা শিষ্যের কাছে সৌভাগ্য। পূর্বসুকৃতির পাওনা না থাকলে সাধু হওয়া যায় না। এ একজনমের কাজ নয়—

থাকিলে পূর্বসুকৃতি

দেখিতে শুনিতে হয় গুরুপদে মতি।

অর্থাত্ বহুজনমের ভালো ফলাফল যোগ হয়ে তবে একজনমে এসে কেউ বাউল হয়। সাধক পর্যায়ে শুরু হয় মূল সাধনা। পাওনা হয় সিদ্ধি। যাঁরা বস্তু রক্ষায় মনোযোগী এবং ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে সমর্থ, তাঁরা এগিয়ে যান। তারপর সিদ্ধের পরতে পরতে রসরতির যোগে চলতে থাকে প্রেমসাধনা। মানুষ গুরুই বাউলদের সাধনমোকাম। সে কারণে ফকির লালন বারবার মানুষকে ভজতে বলেছেন।

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি

অন্য কথায় দেহাভ্যন্তরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবত্ উপাদান যেমন বিদ্যমান থাকে, তেমনি পরমেশ্বর বা খোদা তাআলারও বসবাস এ মানবদেহেই। সাধনার পথ-পদ্ধতি, সাধুদের জীবনাচার ভিন্নতর হলেও মূল কথায় মহান দার্শনিক সক্রেটিস, চৈতন্যদেব, পারস্যের সুফি জালালউদ্দিন রুমি এবং হাফিজদের প্রদর্শিত পথের সঙ্গে লালনপথের খানিক যোগ পাওয়া যায়। কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদপ্রথা তিনি স্বীকার করেননি। তাঁর মতে, জাত বলতে শুধু নারী আর পুরুষ। আর কোনো ক্লাস নেই। মানব মানবই এবং মানবাত্মা হলো সৃষ্টিকর্তার অংশ। আর দেহ, সে তো আত্মারই বাতাবরণ।

ফকির লালনের গানে-দর্শনে সুফিজমের পাশাপাশি বৈষ্ণব সহজিয়া, তান্ত্রিকতা, কর্তাভজাসহ কয়েক দর্শনের পারস্পরিক মিলন ঘটতে দেখা যায়। গানের ধারাগুলোও বিবিধ। যেমন—সৃষ্টিতত্ত্ব, আল্লাহতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, মুর্শিদতত্ত্ব, বেলায়েত তত্ত্ব, ত্রিবেণীতত্ত্ব, কৃষ্ণলীলা, গোষ্ঠলীলা, গুরুতত্ত্ব ইত্যাদি। ধর্মাধর্মের নানা বিভাগ ছাড়া কিছু রূপাশ্রিত গীতি কবিতাও পাওয়া যায় লালনের গানে। তাঁর গানকে ক্রমাগত অনুসরণ করতে গেলে তাই এক ধরনের বহুমাত্রিক মনোভাব তৈরি হয়। আবার সব গানকে একত্রে বিশ্লেষণ করতে গেলেও লালনকে আপাতভাবে ঠিক এক রকম বিশ্বাসে বেঁধে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। সে যা-ই হোক, মূলত তাঁর গান নানা ধর্ম-মত ও বিশ্বাস-বৈচিত্র্যের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নেমে এসেছে মানবতার ধারায়। মানবতা মানে জাতপাতহীন অখণ্ড মানবসমাজ—

কেউ মালা কেউ তসবি গলায়

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়।

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জাতের চিহ্ন রয় কার রে

মানুষের কথা বলতেই কী ফকির লালন প্রথাগত ছুঁতমার্গের আগল ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন? হয়তো তা-ই। আর সে কারণেই বিশেষ কোনো ধর্ম-লেবাসে শ্রেণিবদ্ধ হয়ে থাকতে চাননি তিনি; বরং ধর্ম-বর্ণ লুকিয়ে রেখে কিভাবে নির্ঝঞ্ঝাট হাতে জাতের জঞ্জাল পোড়ানো যায়, সে চেষ্টাই করেছেন। ফলত মানুষ-মোকামেই শুধু থেমে থাকেননি তিনি; বরং ‘সোনার মানুষের’ এমন ভাবনাকে সব দিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন আর অখণ্ড এক মানবসমাজের আশায় গেয়ে উঠেছেন অনবদ্য এক গান—

এমন মানবসমাজ কবে গো সৃজন হবে।

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে।

 



মন্তব্য