kalerkantho


এস এম সুলতান বাঙালির ইতিহাস

ফখরে আলম

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



এস এম সুলতান বাঙালির ইতিহাস

শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে লেখক

সুলতান নিজেকে জন্তু মনে করতেন। মনে করতেন, তিনি মূলত সাপ। তাই কখনো কখনো শিল্পী সাপ হতেন। আবার কখনো কখনো ছোট্ট মুনিয়া। সুলতান নিজেকে যতটা মানুষ ভেবেছেন, তার চেয়ে বেশি নিজেকে জন্তু ভেবেছেন। এ জন্যই তিনি বেজি হতে পারতেন। চন্দ্রবোড়া হতে পারতেন। পশুপাখিদের দলে মিশে যেতে পারতেন। সুলতান তাঁর নিকটজনদের বলতেন, ‘আমি সাপ হতে পারি। পশু হতে পারি। সাপের অন্তরে মিশে যেতে পারি।’ অন্যদেরও তিনি ডাকতেন। পশু হতে বলতেন। হারিয়ে যেতে বলতেন মানুষের মিছিল থেকে। অন্যরা ভয় পেয়েছে। হারিয়ে যেতে পারেনি। সুলতান জয়ী হয়েছেন। সাপের সঙ্গে বসবাস করেছেন। ভালুকের সংলাপ শুনেছেন। পাখিদের গান শুনেছেন। পড়শিরা সাপ নিয়ে, সুলতানকে নিয়ে অনেক গল্প বলেন। বানানো গল্প। ভয়ের গল্প। সুলতান এসব গল্পকে উত্পাটন করেছেন। ভালোবাসার কথা বলেছেন। কিভাবে মায়া-মমতায় হিংস্রতাকে বাগে আনা যায় তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। কিভাবে সাপ হওয়া যায় সে শিক্ষা প্রিয়জনদের দিয়েছেন। শিশুদের দলে ভিড়িয়ে তিনি পশুপাখিদের মধ্যে হারিয়ে গেছেন। বাঘ-ভালুককে নিজের করে নিয়েছেন। আত্মাকে বিশ্বাস করেছেন। তিনি উচ্চারণ করেছেন, ‘সব সৃষ্টিই মানুষের জন্য। বনের বাঘ, সুড়ঙ্গের সাপ সবই মানুষের। কোনো হিংস্র প্রাণীই অকারণে হত্যার আনন্দে মেতে ওঠে না। মানুষ মানুষকে হত্যা করে। সভ্যতাকে আড়ালে রেখে বন্দুক-কার্তুজ নিয়ে মানুষ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জানোয়ারের কাছে হেরে যায়। এ জন্যই আমি নিজেকে জানোয়ার ভাবতে ভালোবাসি। সাপ হতে মন চায়। অগত্যা পাখি হয়ে যাই। পাখিদের মতো গান করি। বাঁশি বাজাই।’

১৯৫৩ সালে সুলতান নড়াইল ফিরে আসেন। নড়াইলে সুলতানের কোনো বসবাসের জায়গা ছিল না। দরিদ্র কৃষক পিতার কুঁড়েঘরে তাঁর কোনো স্থান হয়নি। সুলতান এ সময় নড়াইলের চাঁচুড়ি পেরুলি গ্রামে হারিয়ে যান। এ গ্রামের বটগাছের নিচে বসবাস শুরু করেন। জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করেন। উন্মুক্ত করেন সেকেলে একটি ভাঙা বাড়ি। এই জঙ্গলঘেরা বাড়িতে শিয়াল, বিষধর সাপ, বনবিড়ালের বাস ছিল। সুলতান এদের সঙ্গেই বসবাস শুরু করেন। এ সময়ই তাঁর জীবজন্তুর প্রতি মায়া জন্মে। পরবর্তী সময়ে সুলতান নড়াইলের মহকুমা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কুড়িগ্রামের জমিদারদের একজন কর্মচারীর পরিত্যক্ত বাড়িতে বাস করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৭ সালে সুলতান ফের অরণ্য পরিষ্কার করে এ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি বিষধর গোখরা সাপের পাশে রাত যাপন করেছেন। এখানেই তিনি গড়ে তোলেন একটি চিড়িয়াখানা। চট্টগ্রাম থেকে কিনে আনেন পাহাড়ি ময়না। সংগ্রহ করেন ১০-১২টি বিড়াল।

সুলতানের শিল্পকর্ম নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়েছে। প্রশ্ন করেছি, আপনার ছবির মানুষ সব সময় গর্জে ওঠে। এরা পেশিময় কেন? তিনি বলেছেন, ‘আমার দেশের মানুষ পেশিময়। আমার মানুষ বলবান। কৃষক, জেলে, শ্রমিক আমার দেশের সব বাঙালি আমার দৃষ্টিতে শক্তিশালী। এদের কৌশলে শোষণ আর শাসন করে রুগ্ণ রাখা হয়েছে। খেতে দেওয়া হয় না। আহার কেড়ে নেওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় জমি, জল, স্বপ্ন সব কিছু। প্রকৃতপক্ষে এরা রোগা নয়। এরা মনে-প্রাণে আমার ছবির মতোই পেশিময়। এ কারণে আমি আমার প্রিয় মানুষকে তুলির রঙে পেশিময় করে তুলি। আমি তাদের শরীরে খাঁটি রং চড়াই। প্রকৃত চেহারা আঁকার চেষ্টা করি।’ কেন আঁকেন? সুলতান বলেছেন, ‘মানুষকে জাগানোর জন্য। পেশিময় করার জন্য। আমার ঐতিহ্যকে লালন করার জন্য। আমার নিপীড়িত-নিষ্পেষিত বাঙালি জাতি আবার জেগে উঠবে এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে মানুষের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য ছবি আঁকি। আমার আইডিয়াকে চিত্রকলায় উপস্থাপন করি।’ ‘ফার্স্ট প্লানটেশন’—সুলতানের এই বিখ্যাত ছবি সম্পর্কে তাঁর কথা এমন, ‘ছবিটিতে আমি দেখিয়েছি আদম মাটির কাছে এসেছেন। পেশিবহুল হাতে বৃক্ষ রোপণ করেছেন। আমি বোঝাতে চেষ্টা করেছি, আদম পুরো সভ্যতাকে রক্ষা করছেন।’ সুলতানের উল্লেখযোগ্য আরেকটি ছবি ‘চর দখল’ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘মানুষের উচ্ছ্বাস, ক্রোধ, সাহস আর প্রতিবাদ দেখিয়েছি। আমাদের কৃষকের ফসল রক্ষা করার প্রবণতাকে তুলে ধরেছি। হাজার বছরের এই ফসল আগলে রাখার বিষয়টি, যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টি আমি আঁকার চেষ্টা করেছি। বাঙালি জাতির জন্য আমি ক্যানভাসে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।’



মন্তব্য