kalerkantho

তস্কর ও সাধু

আতা সরকার

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০




তস্কর ও সাধু

অঙ্কন : মানব

কানা বুদ্ধু এলাকায় ফিরেছে খবরটা চাউর হতে বেশি সময় লাগেনি। এত দিন সে কোথায় ছিল, কোথা থেকেই বা তার ফিরে আসা—মহল্লায় এটিও এক রহস্য। আর কোনো কিছুতে রহস্যের গন্ধ থাকলে গাল-গল্পের ডালপালা ছড়িয়ে বিষয়টাকে আরো রহস্যময় করে তোলে।

কানা বুদ্ধু কানাও নয় বুদ্ধুও নয়। চোখটা, বিশেষ করে বাঁ চোখটা ট্যারা। রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয় আকাশ দেখছে। চেহারাটা, বিশেষ করে মুখ দেখে তাকে বুদ্ধু মনে হলেও তার মতো সেয়ানা এ তল্লাটে আর একটিও নেই। বাল্যে হতে চেয়েছিল পলিটিশিয়ান, যৌবনে হয়ে গেল ধুন্দুমার মাস্তান।

এলাকার মোড়ে মোড়ে যেদিন অপরাধমুক্ত এলাকার সাইনবোর্ড পোঁতা হলো, সেদিন থেকে কানা বুদ্ধু নিখোঁজ। মহল্লার লোকেরা মিষ্টি বিলাতে বিলাতে বলল, যাক বাবা! এদ্দিন বাদে কানা বুদ্ধুর ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, অসামাজিক কাজকর্মের হাত থেকে রেহাই পেয়ে এলাকাটা পূতপবিত্র হলো।

আইনরক্ষকরা তাকে কোথায় সরিয়ে দিয়েছে নাকি সে স্বেচ্ছায় সরে  গেছে—তা কেউ বলতে পারে না। তবে ঘটনা আছে, সে যেখানেই থাক, তেরো শিকের আড়ালে বা বাইরে, তার নামে আশপাশের দশ-বারোটা এলাকায় দাপাদাপি হচ্ছে। এ নামের মাহাত্ম্য ঠেকায় কে!

এলাকার লোকদের মুখের হাসি শুকিয়ে দিয়ে কানা বুদ্ধু নাকি আবার ফিরছে। কোত্থেকে এক গাড়ি এসে তাকে নামিয়ে দিয়েছে রাস্তার মোড়ে। এরপর থেকেই সে পায়ে পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে রাস্তা পাড়ি দিচ্ছে। চোখে নাকি মমতা ফুটিয়ে চারপাশের ঘরবাড়ি মানুষজন জরিপ করছে। পরিচিত কাউকে কাউকে নাকি খুব সম্মান জানিয়ে সালাম জানাচ্ছে। খুব দরদ মেখে কুশলাদি জিজ্ঞেস করছে।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, তার হাতে ধরা ফুলের কলি। কাঁধে ঝোলানো ঝোলা ব্যাগ। সেই ঝোলা থেকে ফুল বের করে কাউকে কাউকে হাসিমুখে বাড়িয়েও দিচ্ছে। কে জানে, কানা বুদ্ধু কবি হয়ে ফিরল কি না। একজন ওয়াচার প্রথম থেকেই ফলো করছিল কানা বুদ্ধুকে। সিভিল ড্রেসে থাকলেও ওয়াকিটকি সঙ্গে ছিল। কিন্তু সেটা সে ব্যবহার না করে নিজের মোবাইল ফোনেই কথা বলল কারো সঙ্গে। তার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ঝরে পড়ছিল।

এসবের দিকে খেয়াল নেই কানা বুদ্ধুর। সে ধীর পায়ে হেঁটে চলছে। তার মনটা ফুরফুরে। অনেক দিন পর ঘরে ফেরা। পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া। আর মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার ফেলে যাওয়া এলাকাটিকে। যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনি আছে। পাল্টায়নি তেমন কিছুই। ভোল রামুও বলেছিল, এখানে বদলায়নি কিছু। তবে মামলা-মোকদ্দমা নেই। মামলাবাজ হতে কর্তৃপক্ষ পছন্দ করে না।

চলতে চলতে কানা বুদ্ধুকে থমকে দাঁড়াতে হলো। তিনজন সাদা পোশাকের লোক তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। মুখগুলো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কেন জানি আপনজন ভাবতেই ভালো লাগছে।

ওদের একজন বলল, কিরে বুদ্ধা, এদ্দিন বাদে তুই কোত্থেকে? মতলবখান কী?

কানা বুদ্ধু সসম্ভ্রমে লোকগুলোকে সালাম জানাল। একগাল হেসে বলল, মতলব একখান তো আছেই স্যার। মতলব ছাড়া কে চলে বলুন। আপনাদের দেখতে না পেয়ে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তার ওপর বাড়ির লোকগুলোকেও মনে পড়ল।

আরেকজন সন্দিগ্ধভাবে চোখ কুঁচকালো। বলল, কোনো বদ মতলব আঁটিস নাই তো?

কানা বুদ্ধু বিগলিত হাসল। বলল, আমি আর তেমন নাইগো। সব ছেড়েছুড়ে সাধু পুরুষ হয়ে গেছি। সবার প্রতি ভালোবাসাই আমার ধর্ম।

সে তার ঝোলা ব্যাগ থেকে ফুল বের করে তিনজনকে দিল।

ওদের মধ্যে তৃতীয়জন হেসে বলল, ভালোই বেশ ধরেছিস। কয়দিন থাকবি? যে কয়দিন থাকবি হিসাব করে চলিস।

প্রথমজন বলল, তোর এই ঝোলাতে কি শুধুই ফুল ভরিয়ে রেখেছিস? অস্ত্রপাতি হাতিয়ার যন্ত্র নাই তো।

সে ঝোলায় হাত দিয়েই একটা মাঝারি সাইজের ছুরি বের করল। বলল, কিরে? এত বড় ছুরি দিয়ে কী করবি? কানা বুদ্ধু বলল, ওটা তো প্লাস্টিকের ছুরি। ওটা দিয়ে আমও কাটা যাবে না।

পরক্ষণেই লোকটা ঝোলা থেকে একটা পিস্তল বের করল। বলল, আর এটা?

কানা বুদ্ধুর হাসি অমলিন। বলল, এটা তো খেলনা পিস্তল। ঘরে বাচ্চা আছে। ওর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।

লোকটা পরখ করে পিস্তল-ছুরি ফেরত দিল। তিনজন সরে যেতেই আবার হাঁটতে শুরু করল কানা বুদ্ধু।

খানিক এগোতেই রাস্তার পাশে সে একটা প্রাইভেট কার পার্কিং অবস্থায় দেখতে পেল। ড্রাইভার উদাসীনভাবে বসে আছে তার সিটে। পেছনের সিটে স্যুটেডবুটেড এক ভদ্রলোক। হাতে ব্রিফকেস।

কানা বুদ্ধু চারপাশে তাকিয়ে প্রাইভেট কারের পাশে দাঁড়াল। চারপাশে সতর্কভাবে তাকিয়ে ঝট করে খুলে ফেলল কারের ডোর। অমায়িক হাসিতে সালাম জানাল ভদ্রলোককে। জিজ্ঞেস করল, অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছেন স্যার?

ভদ্রলোক চমকে উঠল। গরম গলায় বলল, তুমি কে হে ছোকরা? এমনভাবে দরজা খুলেছ?

ড্রাইভার পেছনে তাকাল। লক্ষ করে কানা বুদ্ধু বলল, ড্রাইভার সাহেব, পেছনে তাকিয়ো না। সামনে দেখো। নামারও চেষ্টা করো না।

ঝোলা থেকে এরই মধ্যে বুদ্ধুর হাতে উঠে এসেছে পিস্তল ও ছুরি। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে সে বলল, স্যার, আমাকে ভয় পাবেন না। আমি ভালো মানুষ। কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হোক তা চাই না। এই এলাকাটা অপরাধমুক্ত এলাকা। এখানে অন্যায় কিছু এমনকি রক্তপাত ঘটে না। আমরাই পাহারা দিই সেটা।

ভদ্রলোক কানা বুদ্ধুর হাতের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল, তুমি কী চাও?

কানা বুদ্ধু হেসে বলল, আমি কী চাই সেটা আপনিও জানেন স্যার। আপনার হাতের ওই ব্রিফকেসটা। ওটা তো ঘুষ দেওয়ার জন্যই এনেছেন। ঘুষ অন্যায়। ওটা আমাকে দিয়ে দিন।

কানা বুদ্ধু নিজেই ভদ্রলোকের হাত থেকে ব্রিফকেসটা নিয়ে নিল। ছোটখাটো ব্রিফকেস। অনায়াসেই তার বড় ঝোলায় ঢুকে গেল। তার আগে বের করে আনল দুটি ফুল। প্রথমে দিল ড্রাইভারকে। তারপর ভদ্রলোককে।

ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না, তা জানি। কারবারটা খুব আইনমতো নয় তো। তবু জানিয়ে রাখি, এটা অপরাধমুক্ত এলাকা। এখানে মামলা-মোকদ্দমা খুব একটা জমে না।

কানা বুদ্ধু প্রাইভেট কারের দরজা লাগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সন্তের মতো বলল, শান্তিতে থাকুন। সবার কল্যাণ হোক।

সে হেলেদুলে অবলীলাক্রমে পাশের গলিতে হারিয়ে গেল।

 



মন্তব্য