kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

মানুষের শান্তির পক্ষে হোসে সারামাগো

দুলাল আল মনসুর   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মানুষের শান্তির পক্ষে হোসে সারামাগো

১৯৯৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পর্তুগালের কথাসাহিত্যিক হোসে সারামাগো। সার্থক কথাসাহিত্যিক হওয়ার পথে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি করে নেন নিজেকে। স্নাতক করার পর দুই বছরের জন্য গাড়ি মেরামতের কাজ করেন। অনুবাদর এবং সাংবাদিকতার কাজও করেন। ‘দিয়ারিও দে নোতিসিয়াস’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে পত্রিকার এই পদ ছাড়তে হয় তাঁকে।

‘দ্য গার্ডিয়ান’ সারামাগোকে তাঁর প্রজন্মের মহান লেখক বলে সম্মান করেছে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে’র ফার্নান্দা এবারস্তাদ বলেন, ‘সারামাগো অবিচল কমিউনিজমের জন্য যতটা পরিচিত কথাসাহিত্যের জন্যও ততটাই পরিচিত।’ সারামাগোর অনুবাদক মার্গারেট জুল কস্তা চমত্কার কল্পনার জন্য সারামাগোকে সমসাময়িককালের সেরা পর্তুগিজ লেখক বলেন। ২০০৩ সালে হ্যারল্ড ব্লুম তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘আজকের পৃথিবীর জীবিত লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর হলেন হোসে সারামাগো।’ তিনি ২০১০ সালে বলেন, ‘সারামাগো পশ্চিমা সাহিত্যের মানদণ্ডের একজন স্থায়ী অংশ।’ সারামাগোর কথাসাহিত্যের বিশিষ্ট বাচনভঙ্গির প্রশংসা করে জেমস উড বলেন, ‘তিনি উপন্যাস এমনভাবে বর্ণনা করেন যে একবার মনে হয় তিনি প্রজ্ঞাবান, আবার মনে হয় অজ্ঞ।’

সারামাগো আমৃত্যু লেখালেখি চালিয়ে যান। সারামাগো প্রতীকের ব্যবহারের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ঘটনার ধ্বংসাত্মক দিক নিয়ে কথা বলেন। সমসাময়িক শহুরে জীবন এবং মানুষের চলমান অবস্থার কথা মাথায় রেখে সমাজের সিরিয়াস বিষয় নিয়েও কথা বলার সময় তাঁর মধ্যে সহমর্মিতার বিষয়টি বজায় রাখেন। তাঁর চরিত্ররা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে। সে লক্ষ্যে তারা সংগ্রাম চালিয়েও যায়। সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে নেয়। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরেও নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের অর্থ এবং মর্যাদা অনুসন্ধান করে।

সারামাগোর নিরীক্ষামূলক শৈলীর মধ্যে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায়ই দীর্ঘ বাক্য চলতে থাকে, পৃষ্ঠা পার হয়েও চলে যায় বাক্য। পূর্ণ বিরতি ব্যবহারে তাঁর অনীহা। দীর্ঘ বাক্যের মধ্যে কমার ব্যবহার দিয়ে পূর্ণ বিরতির কাজ দীর্ঘায়িত করেন। অনেক অনুচ্ছেদ পৃষ্ঠা পার হয়েও চলে যায়। তাঁর লেখার মধ্যে নিজের অন্য লেখার কথা উল্লেখ করেন। কোনো কোনো লেখায় সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য শব্দ ব্যবহার পরিহার করেন। মানুষের নামের বদলে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেন তিনি। লেখালেখির দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে সারামাগো বলেন, ‘আমি প্রতিদিন দুই পৃষ্ঠা লিখি। তারপর পড়ি, পড়তে থাকি এবং পড়তেই থাকি।’

সারামাগো লেখক জীবনে অনেক বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর ‘দ্য গসপেল অ্যাকোর্ডিং টু জেসাস খ্রাইস্ট’-এর কড়া সমালোচনা করে পর্তুগিজ সরকার। ইউরোপীয় সাহিত্য পুরস্কারের মনোনয়ন থেকে এই উপন্যাসের নাম বাতিল করে দেয় সরকার। তখন সরকার যুক্তি দেখায় : পর্তুগিজ ক্যাথলিকদের বিশ্বাসে আঘাত করেছে এ উপন্যাস। এ উপন্যাসে যিশুর যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় যিশুর মধ্যে মানুষের বাসনা বিদ্যমান আছে। তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ায় ধর্মীয় নেতারা সুইডিশ একাডেমির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রশ্ন তোলেন। তবে তাঁরা কেউ সারামাগোর লেখার নন্দনতাত্ত্বিক এবং সাহিত্যিক গুণ প্রসঙ্গে কিছু বলার সাহস পাননি। তাঁদের প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় সারামাগো জানান, ‘তাঁরা সহজেই বদনামের স্বীকার হয়ে যান, বিশেষ করে বাইরের মানুষদের কাছে। তাঁদের উচিত নিজেদের প্রার্থনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া। যারা বিশ্বাসী তাঁদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে, তবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ নেই।’

 



মন্তব্য