kalerkantho


তিন নোবেল বিজয়ী নারীর সঙ্গে এক অপরাহ্ন

অদিতি ফাল্গুনী   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তিন নোবেল বিজয়ী নারীর সঙ্গে এক অপরাহ্ন

শান্তি নোবেলজয়ী ইরানের শিরিন এবাদি, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমান এবং আয়ারল্যান্ডের মেইরিড করিগান ম্যাগুইর ছবি : কালের কণ্ঠ

‘শান্তি ও অহিংসা শুধুই শব্দের ফুলঝুরি নয়। শান্তি একটি বিজ্ঞান। অহিংসাই বরং একটি র‌্যাডিক্যাল বা বিদ্রোহী শব্দ’, পিনপতন নিস্তব্ধতার ভেতর বলেন মেইরিড করিগান ম্যাগুইর। উত্তর আয়্যারল্যান্ডের শান্তি আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য ১৯৭৬ সালে যিনি অর্জন করেছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার।

‘মিয়ানমারে বর্তমানে যা চলছে তা গণহত্যা। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমরা যা দেখলাম, তা অবিশ্বাস্য। এটা একুশ শতক’—মেইরিড বলে চলেন বাংলাদেশের নারী উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান ‘নারীপক্ষ’ আয়োজিত ‘জীবন ও সংগ্রামের পথে (অফ লাইফ অ্যান্ড স্ট্রাগল)’ শীর্ষক আয়োজিত এক সেমিনারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা অবধি খামারবাড়ি কৃষিবিদ অডিটরিয়ামে আয়োজিত এই সেমিনারের প্রাণবিন্দু ছিলেন শান্তিতে তিন নোবেল জয়িতা উত্তর আয়ারল্যান্ডের মেইরিড করিগান ম্যাগুইর, ইরানের আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মী শিরিন এবাদি ও ইয়েমেনের ‘চন্দ্রমল্লিকা বিপ্লমবর’ (জেসমিন রেভল্যুশন) ‘লৌহ চন্দ্রমল্লিকা’ হিসেবে বিখ্যাত অনূর্ধ্ব চল্লিশের নারী তাওয়াক্কুল কারমান।

ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ৪টায়ই অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ‘নারীপক্ষ’-এর পরিচালক শিরীন হক। “আজকের দিনে আমার বিশেষ কিছুই বলার নেই। শুরুতেই আমি আহ্বান জানাব নোবেল ‘উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ’ সংগঠনের লিজ বার্নস্টেইনকে। বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের তিন নারী নক্ষত্র আমাদের মাঝে উপস্থিত। আমরা বরং তাঁদের কথাই শুনব।”

‘নোবেল উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ’-এর লিজ বার্নস্টেইন মাইক্রোফোন ধরেই জানালেন, তাঁর এই সংগঠন মূলত শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ছয়জন নারী—মেইরিড ম্যাগুইর, রিগোবার্তা মেঞ্চু তুম, জোডি উইলিয়ামস, শিরিন এবাদি, তাওয়াক্কুল কারমান এবং লেইমাহ গবোয়ির অর্জনকে নারীর শক্তি ও দৃশ্যমানতা প্রসারে ব্যবহার করতে চাইছে—যেন বিশ্বজুড়ে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমতার লড়াই ছড়িয়ে দেওয়া যায়। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন গোটা পৃথিবীর যত তৃণমূল নারীসংগঠন ও আন্দোলন আছে, তাদের লড়াইকে প্রণোদনা জোগাতে যায়। “গত বছর আমরা গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসে গিয়েছিলাম এবং কথা বলেছি রিগোবার্তো মেঞ্চুর সঙ্গে। কঙ্গোতেও আমরা গেছি। আর এবার এলাম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের ঘটনা জেনে আমরা শোকাহত। নোবেল ‘উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ’ আপ্রাণ চেষ্টা করবে নিপীড়িত নারীদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য।” বলেন লিজ বার্নস্টেইন। সেদিনের অনুষ্ঠানে তাঁদের বক্তব্য শোনার আগে চলুন তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জেনে নিই।

 

মেইরিড করিগান ম্যাগুইর

(জন্ম : ১৯৪৪ সালের ৭ জানুয়ারি। বিয়ের আগে তাঁর নাম ছিল মেইরিড করিগান। উত্তর আয়ালর‌্যান্ডের এক শান্তিবাদী হিসেবেই তিনি বিখ্যাত। বেটি উইলিয়ামস এবং সিয়ারান ম্যাককিওনের সঙ্গে তিনি ‘দ্য উইমেন ফর পিস’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘দ্য কমিউনিটি ফর পিস পিপল’ নামে পরিচিত হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ঝঞ্ঝাসংকুল পরিবেশকে শান্ত করার কাজে তাঁর সংগঠন অক্লান্ত কাজ করেছে। ম্যাগুইর ও উইলিয়ামস ১৯৭৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।)

‘ব্যক্তিগতভাবে আমার বোনের তিন সন্তান যখন দেশের সহিংস পরিস্থিতির ঘাত-প্রতিঘাতে অকালমৃত্যু বরণ করল এবং আমার বোনও চার বছর পর বিষাদ থেকে আত্মহত্যা করল, তখনই জীবনে শান্তির গুরুত্ব আমি বুঝতে সক্ষম হই। এক সাধারণ নারী হিসেবেই আমি আমার আন্দোলন শুরু করেছিলাম।’ বললেন ম্যাগুইর।

অং সান সু চি যখন প্রথম মিয়ানমারে গণতন্ত্রের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, আমরা তাঁর পক্ষে ছিলাম। অথচ আজ তাঁর নিজের দেশে একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এমন নিপীড়নের মুখেও তাঁর প্রশান্ত নীরবতা আমাদের বিস্মিত করছে। নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেই তাঁর উচিত এই নীরবতা ভঙ্গ করা।’ ম্যাগুইর যোগ করেন।

‘একদিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা। লাখ লাখ শিশু বুভুক্ষু। এটা তো শান্তির শর্ত হতে পারে না। নিরস্ত্রীকরণ আর শান্তির কথা বলাটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। শান্তি এক বিজ্ঞান। অহিংসা এক র‌্যাডিক্যাল বিজ্ঞান।’ বলেন ম্যাগুইর অশ্রুসজল চোখে।

 

শিরিন এবাদি

(শিরিন এবাদি। ১৯৪৭ সালের ২১ জুন তাঁর জন্ম। ইরানি এই আইনবিদ, সাবেক বিচারক ও মানবাধিকারকর্মী ২০০৩ সালের ১০ অক্টোবর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হন। নারী, শিশু এবং মূলত ইরানে আশ্রয় নেওয়া আফগান শরণার্থীদের নিয়ে কাজের জন্য তাঁর এ সম্মাননা লাভ হয়। তিনিই প্রথম ইরানি ও মুসলিম নারী, যিনি এই পুরস্কার অর্জন করেন।)

বয়োজ্যেষ্ঠতায় দ্বিতীয় শিরিন এবাদি ফারসি ভাষায় বক্তব্য রাখেন, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন এক ইরানি নারী। শিরিন বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা। শুরুতেই আমাদের পরম বন্ধু আসমা জাহাঙ্গীরের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করছি।

বন্ধুরা, আজ ইরানের কী অবস্থা? আইনশাস্ত্রে পাস করার পর আমি বিচারক হয়েছিলাম। ছাত্রী হিসেবে আমার ফল ভালো ছিল এবং কর্মজীবনেও আমি দ্রুতই অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমি আদালতের সভানেত্রীও নির্বাচিত হয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব হলো এবং ইরানের ‘পেনাল কোড’ বা ‘দণ্ডবিধি আইন’ আমূল বদলে দেওয়া হলো। আজ আমাদের দেশে পাথর ছুড়ে মানুষ হত্যা বা চুরির জন্য হাত কাটার মতো মধ্যযুগীয় শাস্তিগুলো কার্যকর, চাবুক মারার মতো বর্বর শাস্তি কার্যকর। তোমরাও একটি মুসলিম রাষ্ট্র অথচ তোমাদের দেশে এসব মধ্যযুগীয় বিধান নেই।’

‘ইরানে আজ নারীর জীবনের মূল্য পুরুষের জীবনের মূল্যের মাত্র অর্ধেক। আদালতে দুজন নারীর সাক্ষ্যের মূল্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান। এসবের বিরুদ্ধে আমি যতই সোচ্চার হতে শুরু করি, ততই আমার ওপর দমন-পীড়ন নেমে আসে।’

আবেগপ্রবণ শিরিন আরো বলেন, “ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী আমার এনজিও দুটি বন্ধ করে দিয়েছে। আমার কিছু কিছু বন্ধু আজও জেলখানায় ধুঁকছে। ইরানি জনগণ আজ ইয়েমেন বা লেবাননে ইরান সরকারের হস্তক্ষেপের বিরোধী। আমার জীবনসঙ্গীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, ‘মুখ বন্ধ’ করলে সব কিছু ফেরত দেওয়া হবে। তবে আমি সে শর্ত মানিনি। আজ বিয়ে বা উত্তরাধিকারসহ সব ক্ষেত্রেই ইরানি নারী আইনি বৈষম্যের শিকার। সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ ইরানে আজকের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নারীর অবস্থান সত্যি দুঃখজনক।”

 

তাওয়াক্কুল আবদেল সালাম কারমান

(জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ । ইয়েমেনের একজন সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং সে দেশের আল-ইসলাহ রাজনৈতিক দলের একজন সদস্য। এ ছাড়া কারমান একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি ‘উইমেন জার্নালিস্ট উইদাউট চেঞ্জ’ নামক নারী সাংবাদিকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দেন। ২০০৫ সালে তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। কারমান আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ২০১১ সালের ইয়েমেন বিদ্রোহের সময়। তাঁকে ‘লৌহমানবী’ ও ‘বিদ্রোহের মাতা’ বলে অভিহিত করে তাঁর দেশের জনগণ। তিনি ২০১১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।)

বয়সে প্রবীণ শিরিন এবাদি পশ্চিমা পোশাক পরে এলেও বয়সে অনেক তরুণ তাওয়াক্কুল পরে এসেছিলেন সাদামাটা আবেয়া ও হিজাব। রক্ষণশীল পোশাক সত্ত্বেও তারুণ্যের সজীব হাসিতে তাঁকে দেখাচ্ছিল উচ্ছল। মাইক্রোফোন ধরেই তিনি বলেন, ‘শুরুতেই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে আমার পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ কুর্নিশ। রোহিঙ্গা জনগণের জন্য আপনারা যা করেছেন, তা বিস্ময়কর। এত মানুষের জন্য আশ্রয়, খাবার ও পানীয় জল সরবরাহ করাটা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

হ্যাঁ, আমাকে আমার জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে বলতে বলা হয়েছে। আরব দেশগুলোয় আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল এই রাষ্ট্রগুলোয় বহুদিনের বিদ্যমান একনায়কতন্ত্র, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। হাজার হাজার তরুণ এবং নারীরাও নেমে পড়ে পথে।

আমি ছিলাম একজন সাংবাদিক। আমাদের দেশের একনায়কের বিরুদ্ধে আমি পত্রিকায় লিখছিলাম। স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবু দমে যাইনি। হয়তো সেসবের ফল হিসেবেই পুরস্কার পেয়েছি। তবে আরব দেশগুলোয় এখনো বহু লড়াই বাকি।’

 


মন্তব্য