kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

এলিয়াস কানেতির মানসিক মাতৃভূমি ছিল জার্মান ভাষা

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



এলিয়াস কানেতির মানসিক মাতৃভূমি ছিল জার্মান ভাষা

জার্মানভাষী লেখক এলিয়াস কানেতির জন্ম বুলগেরিয়ায়। পরবর্তী সময় ব্রিটিশ নাগরিকত্বও পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় তিনি পার করেছেন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন আবহে। কানেতি লিখেছেন উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ। তাঁর লেখার ‘সুপরিসর দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা ও শৈল্পিক শক্তির প্রাচুর্যের’ কারণে তাঁকে ১৯৮১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

কসমোপলিটান লেখক এলিয়াস কানেতির ভৌগোলিক পরিচয় যেমন হোক না কেন, তাঁর মানসিক মাতৃভূমি ছিল জার্মান ভাষা। তিনি এই মাতৃভূমি ছেড়ে কখনো অন্য কোথাও যাননি। ধ্রুপদি জার্মান সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর খাঁটি কথাসাহিত্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ‘ডাই ব্লেন্ডাং’ উপন্যাসের কথা। ১৯৩৫ সালে প্রকাশ করেন এ উপন্যাস। সে সময়ই তাঁর এ উপন্যাসের প্রশংসা করেন টমাস মান ও হারমান ব্রখ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁর এ উপন্যাসটি লেখেন যখন তাঁর বয়স বিশের কোঠার মাঝখানে তখন। হিটলার-পূর্ব ভিয়েনার চিত্র তুলে আনা হয়েছে এখানে। ইতিহাসের কঠিন বিষয় নিয়ে লেখা এ বইটি অবশ্য অমার্জিত রকমের কৌতুককর।    

কানেতি নিজের লেখার শৈলী একেবারেই নিজের মতো করে তৈরি করেন। বিশ শতকের মধ্য ইউরোপের অন্য লেখকদের চেয়ে বেশি মাত্রায় খামখেয়ালি ছিলেন, আবার অনন্যও ছিলেন।  

কানেতি মনে করতেন, তাঁর লেখা তাড়াতাড়িই প্রকাশকদের দেওয়া উচিত হবে না। লেখা খুব আগে আগে প্রকাশ করা হলে সত্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা খর্ব হয়ে যাবে। প্রবন্ধের বই ‘ক্রাউডস অ্যান্ড পাওয়ার’ লেখা একেবারে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর একটি শব্দও প্রকাশ করবেন না বলে মনস্থির করেন। এ রকম সিদ্ধান্তের কারণে পাঠকদের কাছে তাঁর পরিচিতি সহজে ছড়ায়নি। কারণ হলো, তিনি চাইতেন তাঁর লেখা কালজয়ী হোক। বর্তমানকে দ্রুত জয় করতে না পারলেও পরবর্তীকালের কাছে তাঁর স্থায়িত্ব প্রত্যাশা ছিল বেশি। বয়স সত্তর পার হওয়ার পরে ধীরে ধীরে জার্মানভাষী ও ইংরেজভাষীদের কাছে তাঁর পরিচিতি ছড়াতে থাকে।

ইংল্যান্ডে থাকাকালে সাহিত্যিক মহলের যাঁদের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল তাঁদের কেউ ‘ডাই ব্লেন্ডাং’ প্রকাশ করার পরপরই পড়েননি। তাঁর এ উপন্যাসের একমাত্র ইংরেজ পাঠক ছিলেন চীনবিদ্যাবিশারদ আর্থার ওয়েলি। কানেতি ইংল্যান্ডকে মনে করতেন শেকসপিয়ার এবং ডিকেন্সের দেশ। আর তাঁদের মতো মহান সাহিত্যিকদের এত বড় দেশে প্রথম দিকে ছিলেন তাঁর উপন্যাসের মাত্র একজন পাঠক।

ইংরেজদের জীবন সম্পর্কে কানেতির অন্ধ ভক্তি ছিল। ইংরেজ নারীদের ভূমিকা নিয়ে নিজস্ব ধ্যান-ধারণাও ছিল : তিনি মনে করতেন সুদর্শনা ইংরেজ নারীরা ইংরেজ পুরুষদের পৌরুষ জাহির করার একটা মাধ্যম। একবার তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলকে একটা বক্তব্যের অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে যেতে দেখেন। হাস্যোজ্জ্বল বৃদ্ধ রাসেলের সঙ্গে ছিলেন বছর বিশেক বয়সের এক সুন্দরী নারী। কানেতির দৃষ্টিতে প্রশংসার দৃশ্য ছিল এটি।

কানেতি এলিয়টের কবিতা ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কিত অনেক কিছুই পছন্দ করতেন না। ইংল্যান্ডের ঐতিহ্য সম্পর্কে কানেতির সমীহ থাকলেও এলিয়টের দৃষ্টিতে ইংল্যান্ডের অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে মনে হতো। কানেতির মতে, ‘এলিয়ট হলেন হেগেলের অন্ধ অনুসারী। দান্তেকে তিনি হীন স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। তিনি আবেগহীন কঠিন হৃদয়ের মানুষ। নিজের সময়ের আগেই বার্ধক্যে জীর্ণ হয়ে গেছেন।’

লেখক কানেতির নিজের জীবন সম্পর্কে নিজস্ব বিশ্বাস ছিল। সে বিশ্বাসের কথা তিনি প্রকাশও করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘কোনো কিছু সম্পর্কেই উদাসীন থাকব না, তবে ধৈর্য ধারণ করব ঠিকই। অন্য সবাই আমাকে কষ্ট দিলেও আমি কারো কষ্টের কারণ হবো না। নিজেকে নিজের অজান্তেই আগের চেয়ে সর্বগুণে অধিকতর গুণান্বিত করব। মনের দিক থেকে আগের চেয়ে বেশি বিষণ্ন হলেও জীবনযাপন করাটা উপভোগ করব। আগের চেয়ে আরো বেশি প্রশান্ত থাকব এবং অন্যের মাঝে সুখি হবো। সবখানে, সবার মাঝে বেড়ে উঠব, তবে অন্যের অধীন থাকব না মোটেও। সবচেয়ে কম আরাম নেবো, তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা বিলাবো। নিজেকে আর ঘৃণার চোখে দেখব না।’

নবীন লেখকদের প্রতি কানেতির পরামর্শ হলো, ‘নিজের জীবন সম্পর্কে লেখার সময় তোমার প্রতি পৃষ্ঠায় এমন কিছু থাকা চাই, যা এর আগে কেউ কোথাও শোনেনি, দেখেনি।’

দুলাল আল মনসুর



মন্তব্য