kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষণ্ণ শহরের গল্প

সেলিনা হোসেন

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিষণ্ণ শহরের গল্প

অঙ্কন : বিপ্লব

তেরো

হারাধন সামনে বসে থাকা তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে, কি রে, এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন তোরা?

তিনজনই চুপ করে থাকে। দাদুর মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়।

—কথা বলছিস না কেন তোরা?

নুটু মৃদু হেসে বলে, আপনার দিন এখন কেমন কাটছে দাদু?

—দিন কেমন কাটছে? আমি তো এখন অপেক্ষার দিন কাটাচ্ছি। এই ভালো এই মন্দ কাটছে।

—কেন? কেন এমন লাগছে?

—যে লোকটি ধর্ষণ ও হত্যা করে এখন ফাঁসির দিন গুনছে, তার দড়ি টানার জন্য আমার হাত নিশপিশ করছে। ওকে ফাঁসি দিয়ে আমি মরলেই আমার শান্তির মরণ হবে।

—অজয়, তুই যে ফাঁসির আসামির যমটুপি পরাবি, তোর ভয় করবে না?

—ভয় করবে কেন?

—পারবি ঠিকঠাকমতো পরাতে?

—দাদু তো আমার সঙ্গে থাকবে। আমার আর ভয় কি?

—তাই তো। ঠিক বলেছিস।

ফজল মাথা চুলকে ঘাড় নাড়ায়।

—দাদু, এই ফাঁসি দেওয়ার কাজ হয়ে গেলে আপনি কী করবেন?

—সব ঠিক করে রেখেছি। আমার কবিরাজি জীবনের দিন শুরু হবে। আমি ফাঁসির রজ্জু দিয়ে তাবিজ বানাব। এ দড়ি যেমন-তেমন নয়। এর অনেক গুণ আছে। ফাঁসির কাজ তো করেছি থেমে থেমে। মাঝে এসব করে রোজগার করেছি। ভালোই দিন কেটেছে। এখন এই রোজগারই হবে একমাত্র রোজগার।

—খুব ভালো। তখন আমরা দাদুর কাছ থেকে মিষ্টি খেতে আসব।

—আসবি, আসবি। কত মিষ্টি খেতে পারিস দেখব।

—আচ্ছা দাদু, আচ্ছা। আজ আমরা যাই।

—ঠিক আছে। আয়, আবার আসিস।

—আপনার জন্য যে পান-সুপারি এনেছি তা কিন্তু খাবেন।

—পান-জর্দা না খেলে কি আমি বাঁচব। পান আমার সবচেয়ে বড় নেশা।

—আবার আপনার জন্য পান-জর্দা-সুপারি আনব।

হা-হা করে হাসে হারাধন। নুটু আর ফজল বেরিয়ে আসে ওই বাড়ি থেকে। অজয় ওদের সঙ্গে অনেকটা পথ হেঁটে আসে। একসময় বিদায় নেয়।

স্মৃতির দরজা বন্ধ করে নুটু জল্লাদ। তখন ওর ঘুম পায়। টের পায় গাঢ় ঘুমে নেতিয়ে যাচ্ছে ওর শরীর। ও কাত হয়ে শোয়। দু-হাঁটু জড়ো করে দু-হাত ঢুকিয়ে দেয় হাঁটুর মাঝে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে এভাবে ওর শরীর নিজস্ব ভঙ্গি তৈরি করে। নুটু মনে করে ঘুমের সঙ্গে শরীরের ভঙ্গির জোর থাকা দরকার। নইলে ঘুমের প্রেম জমে না। ও টের পায় না কিন্তু পেরিয়ে যায় সময়। ফুরোয় রাত। ফুটে ওঠে দিনের আলো। ঘুমের মধ্যেই ও শুনতে পায় শহরের অদৃশ্য কণ্ঠস্বর।

—ওঠো নুটু। সকাল হয়েছে। কয়েদিদের হাঁটাচলার শব্দ পাচ্ছ না তুমি?

গাঢ় ঘুমের জড়তায় ওর কণ্ঠে শব্দ নাই। প্রবলভাবে নাক ডাকে। ওর বিছানার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া রফিক এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে বলে, জল্লাদটার কি মরণ ঘুম পাইল নাকি? নাকডাকার কী বাহার। একবার ভাবে কাছে দাঁড়িয়ে ওকে ধাক্কা দেবে। বলবে, ওঠ শালা, আমাগোরে বাহারি ঘুম দেহাইতাছস। দু-পা হেঁটে বিছানার কাছে আসে। পরক্ষণে ভাবে থাক, জাগানোর কাম নাই। ফাঁসির দড়ি টানলে মাইনষে এমনই ঘুমায়। রফিক জেলখানার নতুন কয়েদি। এখনো অনেক কিছুই বোঝা হয়নি। হঠাৎ ওর শরীর শিউরে ওঠে। ভাবে, একদিন কি ওকেও ফাঁসির দড়ি টানতে হবে নাকি? না, আমি পারুম না। মরণের লগে আমার যুদ্ধ নাই। বিছানার পাশ থেকে সরে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় রফিক। দূরে যাওয়ার কারণে নাকডাকার শব্দ আর জোরালো নয়। তার পরও রফিক নিজের কানের ওপর দুই হাত দিয়ে রাখে। বাবার কথা খুব মনে হয়। বাবার নাকডাকা বাড়ির আলোচনার বিষয় ছিল। মা মাঝেমধ্যে ঘরের পেছনে বসে কাঁদত। বলত, রাইতে ঘুমাইতে পারি না। দিনে কাম কইরতে গায়ে বল পাই না। আহা রে, মা মরে যাওয়ার পরে এই কথা মনে করেই সবচেয়ে বেশি কেঁদেছে রফিক। আজকেও মায়ের কথা মনে হয়। নুটুকে দেখার জন্য পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পায় লোকটা বিছানায় উঠে বসেছে। রফিক দরজায় হেলান দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জেলখানার বড় গাছগুলোর মাথায় উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কাক। ওড়াউড়ির সঙ্গে কা-কা শব্দে ভরে রেখেছে চারদিক। রফিকের মনে হয় আজ বোধ হয় ওর কান থেকে হাত নামবে না। কাকগুলো অসহ্য করে তুলেছে জেলখানার ঘুমভাঙার সময়। চারদিকে আলো ছড়াচ্ছে। আকস্মিকভাবে ওর মনে হয় কাল রাতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে মরে যাওয়া লোকটিকে গেটের কাছে স্ট্রেচারে রাখা হয়েছিল। ওই লাশ কি এখনো আছে? ওর দু-হাত ওপরে তুলে আড়িমুড়ি ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে। দূর থেকে দেখার চেষ্টা করে। ও জানে ওকে কাছে যেতে দেওয়া হবে না। তখন দেখতে পায় একটি অ্যাম্বুল্যান্স বেরিয়ে যাচ্ছে। জোরে শব্দ হচ্ছে। ও আবার দু-হাতে কান ঢাকে।

বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় নুটু।

দেখতে পায় ঘরে কেউ নেই। চারদিকে তাকালে বুকের ভেতরে প্রবল শূন্যতা গুমগুম করে। পা গুটিয়ে আবার বিছানায় উঠে বসে।

ভেসে আসে শহরের কণ্ঠস্বর।

—কোথায় পালাবি নাড়ুগোপাল?

—কোথায় পালাব? তোমার জমিনে কি পালানোর জায়গা আছে সাধু শহর?

—আমি তো আমার জমিনে পালানো মানুষ চাই না।

—ভেতরে তো গেঁথে রাখ। এই খুনিটাকেও রাখবে।

—চুপ কর, কথা বেশি বলবি না।

—অ্যাম্বুল্যান্সের শব্দ পেয়েছি। খুনিটাকে কে নিয়ে গেল রে শহর? ওর বাপ এসেছিল?

—না। চাচা নিয়ে গেল।

—কোথায় কবর হবে?

—দাদার বাড়িতে। ওর দাদার কয়েক শ বিঘা জমি আছে।

—ওই জমিতে খুনিটা কি হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকবে?

—লাশের আবার হাত-পা কি রে নুটু জল্লাদ?

হা-হা করে হাসে নুটু।

এত হাসছিস কেন?

আমি কি তোমার মতো বিষণ্ন শহর নাকি যে হাসব না? তোমার মতো গোমরামুখো হয়ে থাকতে পারব না।

—তোদের অপকর্মের জন্য তো আমাকে গোমরামুখো হয়ে থাকতে হয়।

—চুপ কর শয়তান। নিজের দিকে তাকা। তুই জেলখানায় এসেছিস কেন? লজ্জা করে না হা-হা করে হাসতে।

—না, লজ্জা করে না। আমার যা খুশি আমি তা করব। আমার ইচ্ছামতো দিন কাটাব। আমি কাউকে কেয়ার করি না।

—এসব কথা শুনেই তো আমার মন খারাপ হয়। তোদের জন্য আমার হাসি ফুরিয়ে যায়। তোরা ভালো মানুষ হলে আমার মুখ আর গোমরা থাকবে না।

—আচ্ছা শহর, মানুষেরা কেন খুনিটাকে দেখতে চায় বল তো? কেন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছে?

—তুই নিজে ভেবে দেখ। আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন? এমন প্রশ্ন শুনতে আমার একটুও ভালো লাগে না।

—ঠিক আছে থাক, তোকে আর কোনো প্রশ্ন করব না। তুই কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিলি?

—আমি তো ঘুমাই না। আমার কাছে রাত-দিন সমান।

—জানি জানি। তোমার তো বাহারি জীবন আছে। তোমার তো রাত-দিন সমানই হবে। পারও বাপু।

—কী পারি? এক এক করে বলে দে?

—আমি বলব কেন? বলবে তো তুমি। সবই তো তোমার জানা। খুনিটাকে কী করবে? নদীতে ফেলে দেবে? নাকি বুকের মধ্যে রাখবে?

—আমি কি কোনো খুনিকে নদীতে ফেলে দিয়েছি? নদীর পানি নোংরা করতে আমি পারি না।

—ও হ্যাঁ, তাই তো। তুমি আর কতক্ষণ আমার সঙ্গে কথা বলবে?

—আর বলব না। তুই আমাকে আর প্রশ্ন করবি না।

—আর একটা প্রশ্ন আছে আমার।

—বল, কী বলবি?

—এরপর তুমি কোন গল্প নিয়ে বিষণ্ন হয়ে থাকবে?

—আগামীকাল একজন মা তার শিশুটিকে হারিয়ে ফেলবে। ওর বাবা ওকে বিক্রি করবে।

—বলো কি? বাবা তার বাচ্চাটিকে বিক্রি করে দেবে? বাবার থালায় বুঝি ভাত নেই? কয় টাকা পাবে বাবা যে বিক্রির টাকায় ভাত খেতে হবে? এসব শুনলে আমার মাথা গরম হয়ে ওঠে।

—আমার মাথা খারাপ হয় না। আমার মন খারাপ হয়। আমার মাথা ঝিম মেরে থাকে। আমার হাসি উড়ে চলে যায়।

—শহর রে, তোর এসব কথা শুনতে ভালো লাগছে না।

—শুনিস না, তোকে কে শুনতে বলেছে? আমিও আর কথা বলব না।

—না না, সেই মায়ের কথা বল, যে মায়ের কোল আজ খালি হবে।

—না থাক, এই মায়ের কথা আমি এখন বলব না। মাদক খাওয়ার জন্য ছেলেটাকে বিক্রি করছে ওর বাবা। পারবি ওকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে?

—কেমন করে পারব? তুমি তো আইন-কানুন সবই জানো শহর। আমি আর কী খবর রাখি? আমার সাধ্য কই খবর রাখার। জেলখানায় থেকে কেমন করে খবর রাখব।

—তাহলে সেই সন্ত্রাসীটার কথা বলি যে মানুষটাকে গলা কেটে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দিয়েছে।

—ওহ্, মাগো, বলো কী শহর! এমন ঘটনায় আমার দম আটকে আসছে। বিচারে ওর ফাঁসি হলে আমি ওকে ফাঁসিতে ঝোলাব।

—তোকে এত কিছু ভাবতে হবে না নুটু। জেলে দিন কাটিয়ে তুই কি ভালো মানুষ হতে চাস? তোর নিজেরও তো অপরাধ আছে।

—আমাকে এসব কথা শোনাবে না। বকবেও না। আমার নিজের খোসা আমি নিজে ছাড়াব। শুধু ঘটনাটা বল।

—লোকটা একটা জাত সন্ত্রাসী। ওর বিরুদ্ধে থানায় সাতটা মামলা আছে।

—ওর কি বিচার হয় না? সন্ত্রাসী করে মাফ পেয়ে যায় কিভাবে?

—বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা তুই শুনেছিস?

—না, এসব আমি জানি না।

—বুঝলে তো নিজে আর এমন কাজ করতি না।

—তুমি শুধু আমাকে বকছ শহর।

—তুই কি জেল খেটে বের হওয়ার পরে সৎ মানুষ হবি?

—জানি না। ঠিক আছে তোমার কথা আমি শুনব না। মানুষের নিষ্ঠুরতার কথা আর শুনতে চাই না।

—শেষ কথাটা শোন। আব্বাসের জমি দখল করার জন্য সন্ত্রাসীরা ওকে অটোরিকশায় উঠিয়ে ধরে নিয়ে যায়। গলা কেটে হত্যা করে। তারপর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আগুন দেখে আশপাশের বাড়ির লোকজন চিৎকার করে জড়ো হতে থাকলে ওরা অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। লোকেরা থানায় খবর দিলে পুলিশ আসে। পুলিশ লোকটির স্ত্রীকে নিয়ে আসে। মহিলা লাশ শনাক্ত করে। পুলিশ অর্ধেক পুড়ে যাওয়া লাশটি থানায় নিয়ে যায়।

এটুকু বলে শহর আর কথা বলে না। নুটু অল্পক্ষণ শহরের কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় থেকে আবার প্রশ্ন করে, চুপ করে গেলে কেন শহর? তারপর কী হলো?

—কী আবার হবে, ময়নাতদন্ত হলো হাসপাতালে। তারপর পরিবারের কাছে লাশ দেওয়া হলো।

—পরিবার কবর দিল বলব না। সেই লাশ তুমি বুকে টানলে, তাই তো।

—জানিস তো সবই। আবার কথা বাড়াস কেন? আর কথা বলবি না।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর থেমে যায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হাই তোলে নুটু জল্লাদ। বিছানা থেকে নেমে দিনের কাজ করে। সকালে গোসল করে নাশতা খায়। বাগানে এসে দাঁড়ায়। আজ ওর ছুটি। কালকের কাজের পরে আজ ওকে অন্য কাজ দেওয়া হবে না। জেলের কর্তারা বলে, এক দিন ছুটি দেওয়া হয় তোমাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য। গাছের নিচে বসে নুটু জল্লাদের মনে হয় চারদিক থেকে কান্নার শব্দ আসছে। শহর বলতে পারত কে কাঁদছে। কিন্তু যখন ও বিলাপের কথা শুনতে পায়, তখন বুঝে যায় আব্বাসের বউ কাঁদছে। বিলাপ করছে চড়া গলায়—স্বামী হত্যার বিচার চাই। খুন কইরছে, আবার পোড়াইছে। পোড়াইব ক্যান? আল্লাহ ওগো ওপর গজব নাজেল করো। আমার স্বামীর তো কোনো দোষ আছিল না। ও একটা ভালা মানুষ আছিল। আল্লাহ মাবুদ গজব নাজেল করো। কুত্তাগুলা ভাগাড়ে গিয়া মইরা পড়ে থাকুক। অগো লাশ শকুনে খাক। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ—

নুটুর মনে হয় বিলাপের শব্দ ওকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ও আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। কথা নেই, কান্নার শব্দ চৌচির করে দিচ্ছে চারদিক। ঢুকে যাচ্ছে গাছের কাণ্ডে, জড়িয়ে যাচ্ছে গাছের পাতায়। ঢুকে যাচ্ছে ঘাসের ভেতরে। ঘাস ঢুকে যাচ্ছে মাটির ভেতরে। কান্নার শব্দের ধাক্কায় চৌচির হয়ে ফাটছে মাটি। শুকনো মাটিতে ক্রন্দনের রেশ বিশাল সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে। এই সমুদ্রের স্রোতের কল্লোল নেই। এই সমুদ্র পিষ্ট করছে চারদিক। বলছে, বিচার চাই, বিচার চাই।

এ জন্যই শহরের মুখ থেকে হাসি উড়ে যায়। এ জন্যই শহর বিষণ্নতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। এ জন্যই শহর গলা উঁচু করে বলতে পারে না, আমি বেঁচে আছি। আমি আনন্দের ঢোল বাজাচ্ছি। আমার বুকের ওপরে সবুজ ছায়ার ঘর আছে, সেখানে মানুষের হুটোপুটিতে উৎসবের কল্লোল ছাড়া আর কিছু নেই। এমন শহরই তো ও হতে চায়, কিন্তু হতে পারে না। হওয়ার উপায় নেই। নুটু এমন ভাবনার সঙ্গে দু-হাতে চোখের জল মোছে। জোরে জোরে বলে, আমিও তোমাকে বিষণ্ন করেছি বন্ধু। তুমি আমাকে মনে রেখো না। আমাকে ভুলে যাও।

তোকে আমি ভুলব না নুটু। আমি জানি জেলখানায় থাকলে তোকে জল্লাদের কাজ করতে হবে। অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হলে তোর ডাক পড়বেই।

থেমে যায় কণ্ঠস্বর।

নুটু নিজের ভেতর ফিরে আসে। চনমনে রোদে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। মাথার ওপর চড়ুইয়ের ঝাঁক ওড়াউড়ি করছে। নুটু আবার দুহাতে চোখের জল মোছে।

টের পায় চোখের জল মুছে শেষ করতে পারছে না। অনবরত গড়াচ্ছে। ভোমরাটা উড়ে এসে মাথার চারপাশে ঘুরলে ও চোখের জল মোছে। বলে, তুই অনেক দিন বেঁচে থাক। তোর জন্য আমার ফাঁসির দড়ি ধরতে হবে না।

ভোমরার ভন-ভন শব্দে ওর বুকের ভেতর গানের জলপ্রপাত হয়। নিজের অনুভবকে আঁকড়ে ধরে নুটু। জোরে জোরে বলে, তোমার স্বামীকে যারা খুন করে পুড়িয়েছে, তাদের ফাঁসির দড়ি ধরার জন্য আমার হাতে শক্তি জমা হয়েছে। তুমি আর কেঁদো না মাগো। ও ভুলে যায় যে এই মুহূর্তে ও জেলের আসামি।


মন্তব্য