kalerkantho

নরম বৃষ্টি

শেখ আবদুল হাকিম

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নরম বৃষ্টি

অঙ্কন : মানব

‘টিক-টক টিক-টক, জাগো হে জাগো, সকাল সাতটা, সকাল সাতটা!’ বৈঠকখানার ঘড়িটা সুর তুলল, যেন ভয় পাচ্ছে, কেউ জাগবে না। সকালের বাড়ি খালি পড়ে থাকল। ঘড়ি টিক টিক করে যাচ্ছে, শূন্যতার ভেতর পুনরাবৃত্তি করছে একঘেয়ে আবেদন। ‘সাতটা নয়, এবার নাশতার টেবিলে বসতে হয়, সাতটা নয়!’ কিচেনে স্টোভটা হিইইইইস্ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তারপর নিজের উত্তপ্ত অন্দরমহল থেকে অবিকল চকোলেট রঙের আটটা টোস্ট, আটটা পোচ করা ডিম (প্রতিটির কুসুম ওপর দিকে), আট পেয়ালা ভাজি (তাতে পাঁচ রকম সবজি), দুই মগ কফি, দুই গ্লাস ঠাণ্ডা দুধ।

‘আজ আগস্টের পাঁচ তারিখ, ২০৪৫’, কিচেনের সিলিং থেকে নতুন আরেকটা গলা ভেসে এলো, ‘এটা গাজীপুর, ঢাকা।’ তারিখটা তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হলো। ‘আজ শিশুমণি মিটিমিটির জন্মদিন। আজ নিষ্ঠা নিরবধির দশম বিবাহবার্ষিকী। বীমার কিস্তি জমা দিতে হবে; দিতে হবে পানি, গ্যাস আর বিদ্যুতের বিল।’ দেয়ালে কোথাও ক্লিক করে আওয়াজ হলো, বৈদ্যুতিক চোখের নজরদারির মধ্যে স্মৃতি ধরে রাখা ফিতে ছুটল। আটটা এক, টিক-টক, আটটা বেজে এক মিনিট, স্কুলের সময় হলো, টিক-টক, কাজে যাওয়ার সময় হলো, দৌড় দৌড়, আটটা এক!’ কিন্তু একটা দরজাও খুলল না বা বন্ধ হলো না। কার্পেটে কারো নরম পায়ের শব্দ নেই। বাইরে এখন বৃষ্টি হচ্ছে।

সদর দরজা থেকে আবহাওয়া বাক্স শান্ত গলায় গাইল, ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি তুমি চলে যাও! আজ ছাতা লাগবে, রেইনকোট লাগবে, গামবুট লাগবে—বৃষ্টি, তুমি হুট করে অসময়ে চলে এলে, এখন বাপু তুমি বিদেয় হলে বাঁচি!’

খালি বাড়িতে নরম টোকা মারছে বৃষ্টি, প্রতিধ্বনি তৈরি হচ্ছে। বাইরের গ্যারেজ থেকে ঘণ্টি বাজার শব্দ ভেসে এলো, আপনা-আপনি খুলে গেল দরজা, ভেতরে অপেক্ষায় থাকা গাড়ি দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরার পর আবার বন্ধ হয়ে গেল সেটি। সাড়ে আটটায় শুকিয়ে কুঁকড়ে গেল ডিম, টোস্ট হয়ে উঠল পাথরের মতো। কোদাল আকৃতির যান্ত্রিক হাত চেঁছে তুলে নিয়ে সিংকে ফেলল সব, ওখানে গরম পানির ঘূর্ণি একটা ধাতব গলায় ঢুকিয়ে দিল ওগুলো, গলা থেকে পাইপ বেয়ে চলে গেল নদীর দিকে। নোংরা বাসন-পেয়ালা হট ওয়াসারে ফেলা হলো, বেরিয়ে এলো শুকনো আর পরিষ্কার ঝলমলে হয়ে।

৯টা পনেরো, ঘড়ি জানাল, এখন হবে সাফসুতরো। ঢাকনি সরে যাওয়ায় দেয়ালের গায়ে থাকা গর্তগুলো নিরাবরণ হয়ে পড়ল, আর ওই গর্ত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এলো রোবটবাহিনি, দেখতে হুবহু ইঁদুর। খুদে ওই প্রাণীগুলো ঘরের মেঝে, ফার্নিচার, সব ধরনের রাবার প্রচুর সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে ধুল-মুছল এবং শুকাল। লুকানো বা নাগাল পাওয়া যায় না এমন ধুলোও এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না বাড়ির ভেতর কোথাও। কাজ শেষ হতে নিজেদের ডেরায় ফিরে গেল তারা, তাদের বেগুনি বৈদ্যুতিক চোখ আবার নিষ্প্রভ হয়ে উঠছে।

সকাল দশটার দিকে বৃষ্টির পেছন থেকে বেরিয়ে এলো সূর্য। বাড়িটা নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত শহরের মাঝখানে, যে শহরের অবশিষ্ট বলতে বালি, সিমেন্ট আর কাঠের গুঁড়ো বা ছাই। মাত্র এই একটা বাড়িই একা দাঁড়িয়ে। রাতের বেলা এই বিধ্বস্ত শহর তেজস্ক্রিয় আভা ছড়ায়, বহু কিলোমিটার দূর থেকে দেখা যায় সেটা।

দশটা দশ, পানি স্প্রে করার যন্ত্রগুলো কাজ শুরু করল, সকালের নরম বাতাসকে সোনালি জলকণায় ভরিয়ে তুলল—জানালার কাচ ধুয়ে সাফ করছে, ধুচ্ছে দরজার নব, ঝুল-বারান্দার রেলিং, সিঁঁড়ির ধাপ, গাছের কাণ্ড, ডালপালা।

সাদা রং করা বাড়ির পশ্চিম পাশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে, শুধু পাঁচটা জায়গা বাদে। এখানে একটা গাঢ় ছায়া বা আকৃতি রয়েছে—এক লোক লন মোয়ার দিয়ে উঠানের ঘাস ছাঁটছেন। এখানে যেন একটা ফটোয় তিনটি ফুল কুড়ানোর জন্য ঝুঁকে পড়েছেন এক মহিলা। আরো খানিক সামনে, ওদের ছবি কোনো এক টাইটানিক মুহূর্তে আগুন হয়ে কাঠের গা পুড়িয়েছে—ছোট এক শিশু, হাত দুটি শূন্যে তোলা, ভঙ্গিটা বল ছোড়ার, তার উল্টো দিকে এক মেয়ে, দুই হাত এক করে ওপরে তুলেছে বলটা ধরার জন্য; কিন্তু সে বল আসেনি কখনো। বাড়ির গায়ে ওই পাঁচটা সাদা রঙের স্পট থেকে গেছে—লোকটার, মহিলার, শিশু দুটোর আর বলটার। বাকি সব পাতলা কয়লার আবরণ। আজকের দিন বাদ দিলে এই বাড়ি কিভাবেই না নিজের শান্তি আর শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিল। কী সতর্কতার সঙ্গেই না জানতে চাইত, ‘কে যায়? পাসওয়ার্ড কী?’ নিঃসঙ্গ শিয়াল বা স্বভাবসুলভ ভাব ধরে থাকা বিড়ালের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ওদিকের সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছে বাড়ি, আত্মরক্ষার আরো কত রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করছে—যদিও এসব যান্ত্রিক পাগলামি ছাড়া কিছু নয়।

প্রতিটি শব্দে কাঁপে এই বাড়ি। যদি একটা চড়ুই জানালায় ঘষা খায়, ঝট করে উঠে আসে শেড। চমকে উঠে পাখি উড়ে পালায়। এই বাড়ি একটা বেদি, তার আছে দশ হাজার ছোট-বড় স্বেচ্ছাসেবী—নানা রকম সার্ভিস দিচ্ছে। কিন্তু ভগবানেরা নেই, ফলে ধর্মীয় প্রথা আর রীতি অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

দুপুর বারোটা। কুঁই কুঁই করছে একটা কুকুর, সামনের বারান্দায় ঠক ঠক করে কাঁপছে। সদর দরজা তার গলা চিনতে পেরে নিজের কবাট খুলে দিল। কুকুরটা একসময় লম্বা-চওড়া আর মাংসল থাকলেও, এখন হাড্ডিসার এবং সারা গা ঘায়ে ভর্তি, বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল, গা-ঝাড়া দিয়ে চারদিকে কাদা-পানি ছড়াচ্ছে। তার পেছনে রাগে খেপে ওঠা কটা যান্ত্রিক ইঁদুর ঘূর্ণির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের রাগ কাদা-পানি পরিষ্কার করতে হচ্ছে বলে, উটকো ঝামেলা পোহাতে হওয়ায়। সেদিকে খেয়াল নেই, সিঁড়ি বেয়ে এক ছুটে ওপরে উঠে গেল কুকুরটা, পাগলের মতো চিৎকার করছে প্রতিটি দরজার সামনে থেমে, তারপর একসময় উপলব্ধি করল, বাড়িটা যেমন উপলব্ধি করেছে—থাকার মধ্যে এখানে শুধু নীরবতা আছে। বাতাস শুঁকল সে, কিচেনের দরজা আঁচড়াল। দরজার পেছনে স্টোভটা হৃপিণ্ড আকৃতির কেক তৈরি করছে, সিরাপের মিষ্টি গন্ধে ভরে উঠল গোটা বাড়ি। কুকুরের মুখ থেকে ফেনা বেরোচ্ছে, শুয়ে আছে দরজায়, বাতাস শুঁকছে, তাকিয়ে আছে আগুনের দিকে। তারপর উন্মত্তের মতো বৃত্তাকারে পাক খেতে শুরু করল ওটা, নিজের লেজ কামড়াচ্ছে, পাক খাওয়ার গতি বাড়তে লাগল, তারপর একসময় ছিটকে পড়ল একপাশে, মারা গেছে। ওটা ওখানে প্রায় এক ঘণ্টা পড়ে থাকল। দুপুর দুটোর দিকে একটা গলা ভেসে এলো, এতক্ষণে অতি ক্ষীণ পচন ধরা পড়েছে। ইঁদুরবাহিনি এমন নরম পায়ে গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো, ঝরা পাতার সঙ্গে মিল আছে। দুটো পনেরো। কুকুরটা ওখানে আর নেই। পাতালঘরের ইনসেনারেটার থেকে আগুনের আভা বেরোচ্ছে, হঠাৎ করে রাশি রাশি ফুলকির একটা ঘূর্ণি লাফ দিয়ে চিমনির ওপর দিকে উঠে গেল। দুটো পঁয়ত্রিশ। দেয়াল থেকে বেরিয়ে এলো টেবিলসহ দাবার সরঞ্জাম। কোথাও গান হচ্ছে। কিন্তু দাবার টেবিল নীরব, সরঞ্জাম কারো স্পর্শ পেল না। চারটের সময় প্রজাপতির ডানার মতো ভাঁজ হয়ে দেয়ালে ঢুকে গেল টেবিলটা। সাড়ে চারটে। আলোকিত হয়ে উঠল নার্সারির দেয়াল। পশুরা আকৃতি পাচ্ছে—হলুদ জিরাফ, নীল সিংহ, বেগুনি বল্গাহরিণ, লালচে নীল প্যান্থার। নার্সারির মেঝে ঘাসজমির মতো করে বোনা, তার ওপর অ্যালুমিনিয়ামের তেলাপোকা আর লোহার ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ছোটাছুটি করছে। বুনো পশুদের গায়ের উৎকট গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে, তারই ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছে রংবেরঙের প্রজাপতি। বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পানির দিকে হাঁটা ধরল পশুরা। তারপর রাত নামল, বেরিয়ে এলো নিশাচর প্রাণীরা।

রাত আটটা। বাড়ির ভেতর জাদুর মতো টেবিল চলে এলো, যান্ত্রিক হাত তাতে খাবার সাজাচ্ছে। তৈরি হয়ে গেল নরম বিছানা। রাত ৯টায় লাইব্রেরির সিলিং থেকে নতুন একটা গলা ভেসে এলো, ‘মিসেস নিরবধি, শুতে যাওয়ার আগে আজ আপনি কার কবিতা শুনতে চাইবেন?’ বাড়ি নীরব হয়ে আছে। অবশেষে গলাটা আবার শোনা গেল, ‘আপনি যখন নিজের পছন্দের কথা জানাচ্ছেন না, আমি নিজেই একটা বেছে নিই।’ কোথাও থেকে মৃদু মিউজিক শুরু হলো। ‘এটা আপনার প্রিয় একটা কবিতা, নিয়তির অনুবাদ করা, সারা টিজডেলের লেখা। ‘নরম বৃষ্টি শুরু হবে, মাটি থেকে ভেসে আসবে সোঁদা গন্ধ। লেজচেরা পাখিগুলো চক্কর দেবে, উঁচু-নিচু স্বরে ডাক দিতে দিতে, রাতে গান ধরবে পুকুরের ব্যাঙগুলো...সকালে ঘুম ভাঙার পর বসন্ত সেভাবে টেরও পাবে না যে আমরা চলে গেছি।’

খালি চেয়ারগুলো পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, জোড়া দেয়ালের মাঝখানে, এবৎ যন্ত্রসংগীত সেই যে একবার শুরু হয়েছে, তা আর থামছে না। রাত দশটায় বাড়িটা মারা যেতে শুরু করল। ঝড় উঠল। গাছের একটা পুরো মাথা ভেঙে পড়ল কিচেনের জানালায়, ভাঙা জানালা দিয়ে বহু ডালপালা ঢুকে পড়ল ভেতরে। ক্লিনিং সলভেন্ট ভরা বোতল খসে পড়ল স্টোভের ওপর, পড়ে ভেঙে গেল। একপলকে আগুন ধরে গেল ঘরে! ‘আগুন!’ চেঁচিয়ে উঠল যান্ত্রিক কণ্ঠ। বাড়ির আলো মিটমিট করতে লাগল। সিলিং থেকে ওয়াটার পাম্প পানি ছুড়তে শুরু করেছে। কিন্তু লেনোলিয়াম মেঝেতে সলভেন্ট ছড়িয়ে পড়েছে—কিচেনের দরজার তলা চাটছে, খাচ্ছে, ওদিকে কোরাসের মতো শোনা যাচ্ছে কয়েকটা গলার আওয়াজ, ‘আগুন, আগুন, আগুন!’ বাড়িটা নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড শব্দে, ঝাঁকি খেয়ে, সব দরজা আঁট হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু জানালাগুলো প্রচণ্ড আগুনের তাপে ভেঙে যাচ্ছে, ভেতরে বাতাস ঢুকছে প্রবল বেগে, চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করছে আগুনকে। রাগে উন্মত্ত দশ বিলিয়ন ফুলকিকে ছুট আসতে দেখে পিছু হটতে বাধ্য হলো বাড়ি। আগুনের শিখা কামরা থেকে কামরায় ছড়িয়ে পড়ছে, তারপর সিঁড়ির ধাপ বেয়ে হাসি আর খেলার ছলে উঠতে শুরু করল ওপরে। ওদিকে ব্যস্ত ইঁদুরবাহিনি পানির পিস্তল নিয়ে ছুটে এলো, তাদের পিছু নিয়ে আরেকটা দল এলো হোসপাইপ নিয়ে। দেয়াল থেকেও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে। বাড়ির কোথাও একটা পাম্প দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে গেল। গতি হারাতে হারাতে থেমে গেল বৃষ্টিও। পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে। কড়মড় কড়মড় আওয়াজের সঙ্গে ওপরে উঠে যাচ্ছে আগুন। ল্যান্ডিংয়ের দেয়ালে ঝোলানো দু-তিনটি নকল পিকাসো খেয়ে ফেলল।

আগুন এখন শিশুর বিছানায় দাঁড়িয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে পড়েছে জানালায়, বদলে দিচ্ছে পর্দার রং!

তারপর, এতক্ষণে, নতুন সাহায্য এসে পৌঁছল! চিলেকোঠার চোরা দরজা দিয়ে অন্ধ রোবটদের মুখ বেরিয়ে এলো—কলের মুখ, ওগুলো থেকে সবেগে বেরিয়ে আসছে সবুজ কেমিক্যাল। আগুন পিছু হটল, ঠিক যেভাবে মরা একটা সাপ দেখলে হাতি পিছু হটে। এখন কম করেও বিশটা সাপ মেঝেতে চাবুকের মতো আছাড় খাচ্ছে, ঠাণ্ডা সবুজ ফেনার মতো বিষ ছুড়ে আগুনকে থামিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আগুন বড় চালাক। সে তার শিখা বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে, দেয়াল বেয়ে চিলেকোঠায় ঢুকে নাগাল পেয়ে গেছে পাম্পের। তারপর একটা বিস্ফোরণ ঘটল! চিলেকোঠায় যে ব্রেন পাম্পগুলোকে পরিচালনা করছিল, সেটা ব্রোঞ্জের এক হাজার টুকরো হয়ে আঘাত করল সিলিংয়ে। হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল আগুন, ওখানে যে কাপড়গুলো শুকাচ্ছিল, তাতে দাউ দাউ শিখা দেখা গেল। কাঁপতে শুরু করল বাড়ি, ওটার নগ্ন কাঠামো প্রচণ্ড তাপে কুঁকড়ে যাচ্ছে। কোথাও থেকে একটা গলা ভেসে এলো, ‘হেলপ, হেলপ! আগুন! দৌড় দাও, দৌড়াও!’ তাপে আয়না ভেঙে গেল। একঘেয়ে সুরে পালাতে বলা হচ্ছে, অথচ পালানোর কেউ নেই কোথাও। তার পুড়ে যাওয়ায় একটা একটা করে গলার স্বরও থেমে যাচ্ছে। এক, দুই, তিন...পাঁচটা যান্ত্রিক গলা স্তব্ধ হয়ে গেল। নার্সারিতে পুড়ে গেল গোটা জঙ্গল। নীল সিংহ গর্জন করছে, ছুটে পালাচ্ছে হলুদ জিরাফ। প্যান্থারগুলো বৃত্তাকারে ছুটছে, রং বদলাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। দশ মিলিয়ন প্রাণী, আগুনের আগে আগে ছুটছে, দূরের এক ধূমায়িত নদীর দিকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

ভোর ৫টায় মারা গেল আরো দশটা কণ্ঠস্বর। জলপ্রপাতের মতো নেমে আসা আগুনের ভেতর থেকে এখনো সময়ের ঘোষণা শোনা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে মিউজিক, রিমোট কন্ট্রোলড মোয়ার দিয়ে ঘাস কাটার কাজ চলছে কিংবা ব্যস্ততার সঙ্গে ছাতা খোলা হচ্ছে, যদিও ছাতার নিচে দাঁড়ানোর কেউ নেই। এক হাজার একটা ঘটনা ঘটছে। একদল কর্তব্যসচেতন ইঁদুরকে দেখা গেল ছাই সরিয়ে নিতে ব্যস্ত! একটা গলা, পরিস্থিতি গ্রাহ্য না করে, আগুনময় লাইব্রেরিতে কবিতা পড়ে গেল, যতক্ষণ সবগুলো ফিল্ম স্পুল না পুড়ল। কিচেনে, আগুন আর জ্বলন্ত কাঠের বৃষ্টি শুরু হওয়ার এক মুহূর্ত আগে, স্টোভটা সকালের নাশতা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল প্রায় সাইকোপ্যাথিক রেটে—দশ ডজন ডিম, ষাট পিস টোস্ট, ত্রিশ পেয়ালা ভাজি, সব হজম করে ফেলছে ক্ষুধার্ত আগুন। তারপর ভেঙে পড়ল চিলেকোঠা। কিচেনের কবর হয়ে গেল। থাকল শুধু ধোঁয়া আর নীরবতা। পুবে ম্লান হয়ে দেখা দিল ভোর। ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে শুধু একটা দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। সর্বশেষ গলা ভেসে এলো সেদিক থেকে, ‘আজ আগস্টের ছয় তারিখ, ২০৪৫। আজ আগস্টের ছয় তারিখ, ২০৪৫। আজ...’

—বিদেশি গল্প অবলম্বনে


মন্তব্য