kalerkantho


লেখার ইশকুল

নবীনদের প্রিয় কবি ভিসেন্তে আলেকজান্ডার

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নবীনদের প্রিয় কবি ভিসেন্তে আলেকজান্ডার

সাতাশের প্রজন্মের অন্যতম স্প্যানিশ কবি ভিসেন্তে আলেকজান্ডার। বিশ শতকের প্রধান কবিদের অন্যতম মনে করা হয় আলেকজান্ডারকে। ১৯৭৭ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। জন্ম ১৮৯৮ সালে সেভিলে। ১৯০০ সালে তাঁদের পরিবার মালাগা চলে যায়। সেখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। ছেলেবেলার স্মৃতিমধুর মালাগাকেই তিনি স্বর্গ বলেছেন। ১৯০৯ সালে তিনি মাদ্রিদে যান পড়াশোনার উদ্দেশ্যে।  

১৯১৭ সালে তাঁর পরিচয় হয় স্পেনের আরেক কবি এবং সাহিত্য সমালোচক দামাসো অ্যালোনসোর সঙ্গে। তার পর থেকেই তাঁর প্রজন্মের আরো অনেকের সঙ্গে পরিচয় এবং যোগাযোগ হয়। বেকার, দারিওসহ অন্যান্য মহান স্প্যানিশ কবির লেখা খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়া শুরু করেন সে সময়। ফরাসি সিম্বলিস্টদের লেখা এবং অন্যান্য বিদেশি লেখক কবির লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে ওই সময়েই। বিশের দশকের শুরুর দিকে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলে তাঁর একটা কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। কিডনি অপসারণের পর আবার আবার কবিতা লেখা শুরু করেন। সে সময়ের কিছু কবিতা সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ করার পর সাতাশের প্রজন্মের কবিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ওই সময়ই গার্সিয়া লোরকার সঙ্গে তাঁর পরিচয়।

গৃহযুদ্ধের পরও তিনি স্পেনেই থেকে যান এবং তখন থেকে একেবারে ব্যক্তিগত কবিতার পথ ধরে এগোতে থাকেন তিনি। ১৯৫০ সালের পর থেকে বিশ শতকের দ্বিতীয় প্রজন্মের স্প্যানিশ কবিদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন পথপ্রদর্শক। আলেকজান্ডারের বৈঠকখানা হয় নবীন কবিদের আড্ডাস্থল।

আলেকজান্ডার ভিসেন্তে ছিলেন আগাগোড়া কবি। কবিতার জন্য নিজেকে পুরোপুরি নিবেদন করেছেন। অল্পবিস্তর গদ্য লিখলেও তাঁর গদ্যও কাব্যিক রসে জারিত। তাঁর কবিতার বিষণ্নতার প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রেমের ব্যর্থতাকে। তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় মানুষের হারানো অনুভূতি এবং মুক্ত প্রাণশক্তির কথা বলা হয়েছে। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির মধ্যে স্বাধীন প্রাণশক্তি আছে। কিন্তু সমকালের মানুষ সেটা হারিয়ে ফেলেছে।

আলেকজান্ডারের কবিতা মোটামুটি স্পষ্টভাবেই কয়েক পর্যায়ে ভাগ হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ছিল ১৯২৪ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। এ সময় লেখা কবিতা পড়ে বোঝা যায়, কবি হিসেবে তাঁর কণ্ঠস্বর তখনো পরিপক্ব নিজস্বতা পায়নি। তবে কবিতার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে থাকে সে সময়েই। আকারে হ্রস্ব, ব্যঞ্জনধ্বনির লক্ষণীয় ব্যবহার ইত্যাদি ছিল সে সময়ের কবিতায়। আর এ সময়ই তাঁর ওপর হুয়ান র‌্যামন হিমেনেজ এবং ক্লাসিক কবিদের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এরপর আসে আরেক স্তরের পরিবর্তন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্বের এ সময়টাতে তাঁর কবিতার মধ্যে ফ্রয়েডের প্রভাব দেখা যায়। এ সময়ের পরাবাস্তববাদী কবিতায় তিনি গদ্যের ব্যবহার করেন। এ পর্বের কবিতায় প্রেমকে দেখানো হয় এক অজেয় শক্তিরূপে। প্রেম মানবের সব সীমাবদ্ধতা ভেঙে ফেলে। মানুষের চারপাশের আবদ্ধ জঞ্জাল থেকে তাকে মুক্তি দিতে চায় এই প্রেম। এরপর তাঁর কবিতার আরেক পর্ব শুরু হয় যুদ্ধের পর। সামাজিক সমস্যা নিয়ে রচিত কবিতার প্রতি তাঁর টান লক্ষ করা যায় এ পর্বে। সাধারণ মানুষের দুঃখ-ব্যথা, আশা-নিরাশা স্থান পায় তাঁর এ পর্বের কবিতায়। কবির অবস্থান তখন সংহতির ওপর। সামাজিক মানুষের কথা বলার জন্য লেখা তাঁর এই সময়ের কবিতা সহজ-সরল এবং বোধ্য শৈলীতে লেখা হয়েছে। এ পর্বে লেখা তাঁর প্রধান দুটি কাব্যগন্থের নাম ‘হিস্টোরিয়া দেল কোরাজোন’ (১৯৪৫) এবং ‘এন উন ভাস্তো দোমিনিয়ো’ (১৯৬২)। তাঁর শেষ পর্বে প্রকাশ করা দুটি কাব্যগন্থের নাম হলো—‘পোয়েমাস দে লা কনসুমাসিয়ন’ (১৯৬৮) এবং ‘ডায়লগস দেল কনোসিমিয়েন্তো’ (১৯৭৪)। এগুলোর মাধ্যমেও তাঁর শৈলীর পরিবর্তন ঘটান আলেকজান্ডার। বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা এবং মৃত্যুর নৈকট্য তাঁকে ছেলেবেলার আবেগী মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়। তবে বাল্যবেলার তীব্রতা আর থাকে না পরিপক্ব জীবনের এই প্রান্তে এসে। তখন কবিতায় চলে আসে ধীর এবং প্রশান্ত সুর।

সতত পরিবর্তনশীল মানস আর নিরীক্ষাপ্রবণ শৈলীর কবি ভিসেন্তে আলেকজান্ডার ১৯৮৪ সালে মারা যান। তখন তিনি ছিলেন মাদ্রিদে, তাঁর স্বর্গ মালাগা থেকে অনেক দূরে।

 

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য