kalerkantho


বই আলোচনা

কবিতাগুলো একাধিকবার পড়ার মতো

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কবিতাগুলো একাধিকবার পড়ার মতো

এয়া : জুননু রাইন। প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান। প্রকাশক : ঐতিহ্য। মূল্য :১২০ টাকা

জুননু রাইন কবিতা লেখে এটা জানতাম, পড়েছিও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু; কিন্তু একসঙ্গে তার অনেকটি লেখা পড়া হয়নি এর আগে। পড়তে গিয়ে দেখি, এ এক আলাদা জগৎ। জুননুর কবিতার একটি পঙক্তি ব্যবহার করে বলা যায় তার জগৎ অন্য রকম। সব অন্য রকমরাও তারটির মতো নয়। অথচ এই কবি আমাদেরই নিকটজন, এ কালেই তার বসবাস। পেশায় সে সংবাদপত্রের লোক, তাই প্রতিদিন কী সব ঘটছে, সেগুলো তার সবই জানা। সে যখন একসঙ্গে বলে ‘ফেলানী, তনু, সাতখুন, বিশ্বজিৎ, সাগর-রুনি, হযরত আলী ও আয়েশা’—তখন এ সময়ের অনেক কথাই বলা হয়ে যায়। জুননু দেখছি অনেক কথা বলতে পারে খুব অল্প কথায়। এখানে সাংবাদিকতা থেকে সে অনেক দূরে। তার আছে সংবেদনশীলতা ও স্পর্শকাতরতা। একটা নয়, ওই দুটোই, সঙ্গে আছে বাকসংযমও। নিজস্ব একটি কাব্যভাষাই তৈরি করে নিয়েছে সে। বাহুল্য নেই, আড়ম্বর জানে না; তার বলার কথা থাকে, কিন্তু অল্প কথায় সব কিছু বলে। ঘটনা ও বিষয়ের মর্মস্থলে পৌঁছতে পেরেছে দেখতে পাই এবং সেই বোঝাটাই নিয়ে আসে সামনে। এ হচ্ছে গভীর কথা সহজে বলে, যে কাজটা সহজ নয়। শুধু সংযম নয়, বৈদগ্ধও আছে।

যেমন রানা প্লাজার অতিমর্মান্তিক ও অতিবাস্তবিক ঘটনা নিয়ে সে লিখেছে,

‘একটি হাত কেটে ফেলে হলেও এই শ্রমিকের বেরিয়ে আসার তাড়া আছে—আগামীকাল সকাল ৭টার মধ্যে যেতে না পারলে তার মাইনে কাটা যাবে বলে।’ বিশেষ ঘটনাটি নির্বিশেষ একটি সত্যকে জানাচ্ছে। নির্বিশেষ ইতিহাসও উঠে এসেছে তার লেখায়।

কবিতার প্রাণ থাকে চিত্রকল্পে ও ধ্বনিতে। জুননু ছোট ছোট সব ছবি এঁকেছে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে এসেছে। কষ্টকল্পিত নয়, যান্ত্রিকও নয়, ছোট নদীর ঢেউয়ের মতো তারা আসে এবং স্পর্শ করে। তাদের ধ্বনিগুলো স্বাভাবিক ও সংযত। যেমন লিখেছে সে, ‘আলো ঘুমায়’, ‘বাতাসের পায়ে ফুটবল’, ‘দূর থেকে দূর হারিয়ে গেছে এখন আমাদের দূরত্ব ঠিকানাহীন’, ‘অভ্যাসের হাত পাখার বাতাস’, ‘নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে জীবনের অভিমান।’

কাকতাড়ুয়াটিকে দেখে তার মনে হয় ওই পাহারাদারটি ‘একা থাকতে থাকতে দেখে ফেললো কোনো এক রাতে—দাঁড়িয়ে আছে সে একারই সাথে।’

আবার লিখছে

‘আমি আজরাইল দেখিনি প্রভু,/ক্রসফায়ার দেখেছি/প্রতিটি স্বপ্নকে আতঙ্ক জাপটে ধরে ঘুম পাড়ায়/ প্রতিটি ঘুম বাতাসের পোড়া গন্ধ হয়ে উড়ে যায়/প্রতিটি পাখি মানুষকে অনিশ্চিত মৃত্যুর স্বাভাবিকতা শেখায়।’ একই শব্দ কোথাও কোথাও একাধিকবার আসে, অনিবার্যতা বোঝনোর জন্য; কিন্তু তাতে বৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় না। প্রবহমানতায় বিঘ্ন ঘটে না। কেননা ভেতরে প্রাণ আছে, সে প্রাণ উত্তেজনার নয়, উদ্ভাসের।

জুননু থাকে শহরে, কিন্তু তার অস্তিত্বজুড়ে আছে গ্রাম, নিজেকে দেখেছে সে কৃষক হিসেবে। শহরে মানুষ কেবলি দৌড়ায়, জুননু চায় হাঁটতে। আলস্য নয়, নির্বেদ নয়, বিচ্ছিন্নতাও নয়—গভীরভাবে বেঁচে থাকাটা লক্ষ্য তার। তার জগতে তাই ছায়া আছে, রয়েছে জোছনা, বিকেল, সন্ধ্যা; চায় সে স্নিগ্ধতা। দুপুরও আছে, থাকতেই হবে, কিন্তু সে দুপুর পাখিডাকা; তপ্ত নয়, উগ্র নয়। জানে সে, জানায়ও আমাদের, ‘দুপুর খুব হন্তারক। আমার নিরীহ পাখির ডাকগুলো শুষ্ক করে দেয়।’ একাকিত্ব সে পছন্দ করে, তাতে স্বস্তি পায়, কিন্তু সে নিঃসঙ্গ নয়, নির্জনেও নেই, তার চারদিকে অনেক কিছু আছে, অনেক করে। আছে ওই পাখির ডাকগুলো, রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ অনেক কিছু—ইচ্ছে, মনে পড়া, ক্লান্তি, বিকেল, হাঁটা, এমনকি একাকিত্বও কথা বলে সে জনান্তিকে। স্পর্শ পায় ছোঁয়ার, ধোয়ার। তার জগতে আছে, ‘স্বপ্নের ধোয়া সাদা দিন’, আছে ‘জোছনায় মুখ ধোয়া’, ‘হাসতে হাসতে তার পোষা রাত্রিটি এসে আমাকে ধুয়ে দেয়’, এমনকি ‘ময়লাগুলোও আমাকে ধুয়ে দিতে উদ্যত।’

ওদিকে আবার টের পায় সে ছুঁয়ে দিচ্ছে নিজেই নিজেকে। চিত্রকল্পের কথা বলছিলাম। কয়েকটির দিকে তাকানো যাক।

১. শান্ত নদীর গলিতে একটি বুড়ো গাছ আছে

২. আমাদের বাগানঘেরা বাড়িটির পশ্চিম দিকে/সন্ধ্যা যতদূর একা একা হেঁটে যেতে পারে/দূরের আধমরা নদীতে রাত্রিটির শুয়ে পড়া শেষে।

কী যেন বলতে চায়, এই ব্যাপারটা প্রায় সর্বত্রই ঘটছে। তাদের বলা কথা স্পষ্ট নয় কবির কাছে, কেননা কথাগুলো বেশ গভীর, অনেকটাই তার বোধের ব্যাপার, বোঝার অতিরিক্ত।

জুননু রাইনের কবিতার বইয়ের নাম রেখেছে এয়া; আদি মহাকাব্য ‘গিলগামেশের’ এক দেবতার নামে নাম সেটি। এ দেবতা প্রজ্ঞার। গিলগামেশের জগত্টা আদিম, সেখানে আছে যুদ্ধ, আছে নিষ্ঠুরতা ও ববর্রতাও; রয়েছে মানুষের ক্রন্দনও, আছে বাঁচার সংগ্রাম। আর আছে অসামান্য বন্ধুত্ব, গিলগামেশের সঙ্গে তার প্রথমে প্রতিপক্ষ এবং পরে সুহৃদ এঙ্কুডুর। বন্ধুত্বের সেই মমতা এই বইয়ের সর্বত্র পাওয়া যাবে; বলা যায় স্পর্শ করা যাবে। বই নিয়ে তার এই প্রথম আত্মপ্রকাশ। সম্ভাবনা নিয়ে নয়, পূর্ণতা নিয়েই। তাকে অভিনন্দন।

এ বইয়ের কবিতাগুলো একবার নয়, একাধিকবার পড়ার মতো। যেমনটি আমি পড়েছি এবং আনন্দিত হয়েছি। সত্যিকারের কবিতার পরিচয় তো এটাই যে পড়লেও পড়াটা শেষ হয় না।



মন্তব্য