kalerkantho


মৃত্তিকালগ্ন মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শিল্প নির্মাণই হোক প্রার্থনা

[লেখক ও বিপ্লবী শওকত আলীর এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কবি ও থিয়েটারকর্মী লোপা মমতাজ, ২০১০ সালে, পুরান ঢাকায় তাঁর বাসায়। তাঁর লেখার শুরু, প্রতিবাদী, জেলজীবন, প্রেম, শিক্ষা, সমাজ, ইতিহাসের ভেতর নিরিখ করা এক জোড়া চোখ খুঁজে পাওয়া যাবে এই আলাপচারিতায়।]

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মৃত্তিকালগ্ন মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শিল্প নির্মাণই হোক প্রার্থনা

লোপা মমতাজ : ইতিহাসটা শুরু হলো কবে থেকে? মানে লেখার ইতিহাস?

শওকত আলী : ইতিহাস আমার খুব কৌতূহল ও আগ্রহের বিষয়। আমি সব রকম ইতিহাসের বই পড়ার চেষ্টা করি। এখন নিজের জীবনের পেছনের দিকে তাকিয়ে আমার অপূর্ণতার কথা মনে হয়নি। কেন মনে হয় আমার সব কিছু পূর্ণ হয়েছে। এ কারণে যে আমার যে সময়ে জন্ম হয়েছে, যেভাবে বড় হয়েছি, যে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে একটার পর একটা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ, তারপর সেখান থেকে চলে এসে আবার নতুন জায়গায় ঘরবাড়ি করে থাকা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করা, পুরনো যে পদ্ধতিতে আয়-উপায় হতো, সেটা হাতের বাইরে চলে গেছে। জমিজমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এখন নিজের রোজগার, এ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার কারণে অন্যদিকে চিন্তা করার, ভাববার কোনো সুযোগ মেলেনি। যেটুকু পাওয়া যায়, সেটুকু কিভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটা ছিল বড় ব্যাপার। এমনিতেই ইচ্ছা ছিল, আমার বাবা যেহেতু ডাক্তার ছিলেন, সেহেতু আমি বোধ হয় ডাক্তার হলে ভালো হবে। আমাদের বাড়িতে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। তবু আমার পরিবারের মধ্যে মা লেখাপড়া জানতেন। তিনি বই পড়তেন। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীকে বললেন, আমি আরো লেখাপড়া করতে চাই। পড়াশোনার চর্চাটা বাড়িতে থাকার কারণে বইপত্র, গল্পের বই পড়া থেকে আগ্রহ তৈরি হয়। তারপর যা হয় অন্য লেখকদের ক্ষেত্রে, আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

লোপা মমতাজ : আপনার বেড়ে ওঠার সময়ের কথা বলুন, সে সময় মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দানের প্রক্রিয়া কেমন ছিল?

শওকত আলী : আমরা বাস করতাম উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে, পশ্চিম বাংলায়। আমার জন্ম হওয়ার কয়েক বছর পর আমার মা শ্রীরামপুরে টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের ছাত্রী হলেন এবং আমাদের ভাই-বোনদের নিয়ে সেখানে চলে গেলেন। ওখানে একটি মিশনারি স্কুলে আমাদের ভর্তি করালেন। সেখানে আমার লেখাপড়া শুরু হলো। সেখানে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের ছবি দেয়ালে বাঁধানো আছে। বাংলা পড়ছি, পাশাপাশি ইংরেজিও পড়ানো হচ্ছে। ওইখানে আমার দেড়-দুই বছরের লেখাপড়ার সূচনাটা হলো। তার পরই রায়গঞ্জে ফিরে গিয়ে বাড়িতে বইপত্র দেখলাম, মা-বাবাকে দেখলাম বই পড়তে। আমারও বইপত্র নিয়ে কৌতূহল জাগল এবং লেখাপড়া শুরু হলো। তারপর রায়গঞ্জ হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। আমি খুব অসুখে ভুগতাম। আমার সব রকম জটিল অসুখ হয়েছিল। কলেরা, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড—সব হয়েছিল।

লোপা মমতাজ : কেমন ছিলেন ছোটবেলায়, খুব দুষ্ট প্রকৃতির?

শওকত আলী : আমি দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম না। কিন্তু দুষ্ট বুদ্ধি দিতে পারতাম লোককে। যা হোক, ওগুলোর ভেতর থেকে পড়তে পড়তে যখন পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, মা তখন বকাঝকা করতেন। তখন আমি করলাম কী, ওখানে একটা বাতাবি লেবুর গাছ ছিল, খুব বড়। ওই গাছের ডালের মধ্যে মাচার মতো করে বইপত্র নিয়ে পড়তাম। সেখানে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গাছের ডালে বসে পড়াশোনা, আড্ডা হতো। এভাবে বাল্যকাল কেটেছে। এরপর পার্টিশন হলো। আমার বাবা পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আবার কংগ্রেস পার্টিতে ছিলেন। আমার মা কিন্তু পাকিস্তানকে সমর্থন করতেন। আমাদের বাড়িতে দুটি ক্যাম্প।

লোপা মমতাজ : তাহলে আপনার সামনে তখন পক্ষে ও বিপক্ষে দুটি চিন্তাধারাই সমানভাবে বিরাজ করছিল, সেখানে আপনার নিজস্ব চিন্তাধারা কিভাবে তৈরি হলো? নাকি দুজনের দ্বারাই প্রভাবিত ছিলেন?

শওকত আলী : আমার মায়ের মধ্যে কিন্তু সাম্প্রদায়িক ব্যাপার অতটা ছিল না। মা বলতেন, হিন্দু বাবুরা এত সুযোগ-সুবিধা পায়, আমরা কেন পাব না। ’৪৮-এ তখন কথাটা উঠল, তিনি এখানকার খবরের কাগজ পড়তেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথাবার্তা হচ্ছে, ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ’৪৯-এ। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা শুরু হয়ে গেল। আমার মা তখন মৃত্যুশয্যায়। তিনি তাঁর মাথায় আমাদের হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন—খবরদার! ওই পাকিস্তানে তোরা যাবি না। তবু আমাদের আসতে হয়েছে। এ পর্যায়গুলোর ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার ফলে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো যে ঠিকঠাক গড়ে উঠবে, আমরা এটা তৈরি করব বা নিজেই সে রকম হব—এ সুযোগ আমাদের হয়নি, পাইনি আমরা। কলেজে এসে ভর্তি হলাম দিনাজপুর শহরে। ওখানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ছিল। প্রিন্সিপাল ছিলেন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শহীদ হয়েছিলেন ’৭১-এ। তিনি কার কাছে যেন শুনেছিলেন—একটা ছেলে এসেছে ইন্ডিয়া থেকে। খবর দিলেন, আমি গেলাম। কথাবার্তা হলো। তিনি বললেন, সময় নষ্ট করবে কেন। ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়ব। আমি বললাম, আমি আইসিতে ভর্তি হব। বললেন—না, বাংলায় ভর্তি হও। ভর্তির ডেট তিন মাস পার হয়ে যাওয়ার পর আমাকে আইএ ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিলেন এবং সেভাবে পড়াশোনা করছিলাম। নানা রকম ঝামেলা, টাকা-পয়সার অভাব, আর মা তো ইতিমধ্যে মারা গেছেন। আমরা ভাই-বোনরা মিলে বসবাস করছি। বাবা এসেছিলেন। এসব কারণের মধ্যে আমার ওই ধরনের পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। লেখালেখি করারও সুযোগ হয়নি। তবু ওর মধ্যে কিছু কিছু লেখালেখি টুকটাক করেছিলাম। প্রবন্ধ লিখেছিলাম। কলেজের একটি প্রতিযোগিতায় প্রবন্ধটি ফার্স্ট হয়ে গেল। তারপর ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হলাম। আইএ পাস করে বিএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছি ওখানেই। ১৯৫৪ সালে ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ার সময় বহু লোককে ধরপাকড় করা হলো। আমিও ধরা পড়লাম। জেলখানায় চলে গেলাম। আট-নয় মাস পরে ফিরলাম। জেলখানায় বসে মাঝেমধ্যে কবিতা লিখি বা ছড়া লিখি—এ রকম। আট-নয় মাস ছিলাম ওখানে। বের হওয়ার পর বিএ বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। তারপর ওখান থেকে চলে এলাম ঢাকায়। তখন আমার একটু-আধটুকু লেখা শুরু হয়েছে। দু-একটা লেখা কলকাতার পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ঢাকার পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে। তারপর এখানে এসে লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা হলো। খবরের কাগজে চাকরি পেলাম। দৈনিক মিল্লাতে। আইয়ুব খানের মার্শাল ল জারি হলো। ধরপাকড় শুরু হলো। আমি আবার ঢাকা থেকে পালালাম। দিনাজপুর আর ঠাকুরগাঁওয়ের মাঝামাঝি নীলগঞ্জে নামলাম। সেখানে খোঁজখবর করতেই একটা হাই স্কুলে মাস্টারি পেয়ে গেলাম। ওখানে কয়েক মাস মাস্টারি করে আবার ঢাকায় এলাম। ঢাকায় এসে আবার রি-অ্যাডমিশন নিলাম। আবার পড়াশোনা...। তার মধ্যে লেখালেখির কারণে হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে। সিকান্দার আবু জাফর ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তখন সমকাল সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। সেখানে আমার একটা গল্পও ছাপা হয়েছে। তারপর সমকালে থাকাকালীন লেখালেখি করতে শুরু করেছিলাম। খবরের কাগজে মাঝেমধ্যে এটা-সেটা লিখতাম। এ নিয়ে চলত। তারপর এমএ পরীক্ষা দিলাম। এমএ পরীক্ষার পর আইয়ুব খানের মার্শাল ল জারি হলো। আবার পালানো। পালিয়ে গিয়ে দিনাজপুর শহরে বীরগঞ্জের একটা স্কুলে হেডমাস্টারিতে চাকরি। তারপর ওখানে ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো। দরখাস্ত করেছিলাম। ঠাকুরগাঁও কলেজে চাকরি হয়ে গেল। এ কথাগুলো উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, ওই সময় বা তার পর আমার লেখালেখির মধ্যে যে সাধারণ মানুষের জীবন, আদিবাসীদের জীবন, কৃষকদের জীবন, কৃষক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন—এ বিষয়গুলো এসেছে। তার কারণ কিন্তু ওই সব লোকের সঙ্গে আমার মেলামেশা, ওঠাবসা। ওই লোকদের সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার কারণে সাঁওতাল আদিবাসীদের সঙ্গে, ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে ওঠাবসায় বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুরগাঁও কলেজে তিন বছর ছিলাম। ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলাম এই মহিলাটিকে (দেয়ালের ছবি দেখিয়ে)।

লোপা মমতাজ : নিজেরা পছন্দ করে? 

শওকত আলী : হ্যাঁ, আমরা পছন্দ করেই বিয়েটা করেছিলাম। উনি বললেন, এখানে কয়দিন পড়ে থাকবা? ঢাকায় যেতে পারবে না? আমি বললাম, তোমাকে নিয়ে এখন ঢাকায় যাব কী করে? তখন উনি বললেন, ঠিক আছে, আমি বাবার কাছে চলে যাচ্ছি, তুমি যাও। আমি ঢাকায় গিয়ে জাফর ভাইকে বললাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তুমি ওখানে আরম্ভ করে দাও। সমকাল দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন। বেতনও একটা ঠিক করে দিলেন। ওখানে কয়েক মাস করলাম। জগন্নাথ কলেজে একটা পোস্ট খালি হয়েছিল। দরখাস্ত দিলাম। জগন্নাথ কলেজে চাকরি হয়ে গেল ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে।

লোপা মমতাজ : আপনার লেখা ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, ইতিহাস খুঁড়ে আনা বিভিন্ন চরিত্র। তো এর কোন অংশের আপনি উত্তরাধিকারী?

শওকত আলী : ইতিহাসের এই যে ব্যাপারটা, উপন্যাসের নামটা প্রদোষে প্রাকৃতজন। প্রদোষকাল কোনটা? সূর্য ওঠা এবং রাত্রি শেষ হওয়া—এর মধ্যবর্তী যে সময়টা, সেটাকে বলা হয় প্রদোষকাল। সন্ধ্যায়ও প্রদোষ হতে পারে, ভোরেও প্রদোষ হতে পারে। এটা পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। সে পরিবর্তনের মধ্যখানে যে পরিবর্তনটা হলো, লক্ষণ সেন যাচ্ছে, তারপর সে পরিবর্তনটা এলো, সেটা দীর্ঘকাল ধরে এখানে চলছে। প্রায় ৪০০-৫০০ বছর। ওই সময়টাতে প্রাকৃতজন, প্রকৃতির কাছে যারা থাকে—সাধারণ মানুষ, তাদের কী অবস্থা—এই কৌতূহলটা আমার মধ্যে ছিল। সেটা নিয়ে কল্পনা করেছি। ইতিহাসের বইপত্র ঘেঁটেছি। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে, একটা উপন্যাস লিখলে কেমন হয়। তাই লিখেছি।

লোপা মমতাজ : এই যে দীর্ঘ পরিবর্তন, মানে দীর্ঘ ইতিহাসের পরিবর্তন, তো এখানে নিজেকে কোথায় খুঁজে পান?

শওকত আলী : ওটারই তো ধারাবাহিকতা চলছে এখন পর্যন্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ, প্রাকৃতজন। এখানে একটা প্রশ্ন আছে, বাংলা অঞ্চলটায় সরাসরি কি আরব দেশ থেকে লোক আসতে পারে? আর ভারতের পশ্চিমাঞ্চল—যেটা আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, আরব? মুসলিম যারা বিজয়ী তারা ওই দিক থেকে তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে এসেছে? তারপর দিল্লিতে স্থায়ী আসন গেড়েছে। তারা ৫০০ বছর শাসন করেছে। কিন্তু বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা কেন বেশি? এখানে বেশির ভাগ মানুষই মুসলমান। নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের হিসাবে এটা ছিল বৈশ্য, শূদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত। এদের কাছে এসেছে যারা, তারা হচ্ছে পীর, ফকির, দরবেশ, আউলিয়া। দেখেছি, তখন স্থানীয়ভাবে যে সমাজ ছিল, সেখানে কি এটা কল্পনা করা যেত? এখানে মুসলমান হয়েছিল যারা, তারা কারা? সাধারণ মানুষ, প্রকৃতিলগ্ন মানুষ। তারাই প্রাকৃত। এখন এ প্রাকৃত মানুষদের মধ্যেই এই যে পর্যায়টা এসে গেল। পাকিস্তান কাদের জন্য হয়েছিল? ভারতের আন্দোলন শুরু হলো যে মুসলমানদের অধিকার করতে হবে। হিন্দুদের আধিপত্য আছে। নবাব বাহাদুররা মুসলিম লীগ তৈরি করল। মুসলিম লীগের আন্দোলন শুরু হলো। শুরু হওয়ার পরে বলে, ঠিক আছে, দেখা যাক মুসলমানরা পাকিস্তান চায় কি চায় না। ’৪৬ সালে একটা রেফারেন্ডাম হলো। তাতে রেজাল্ট হলো, ৬০ শতাংশ মুসলমান পাকিস্তান চায়, ৪০ শতাংশ চায় না। প্রদেশভিত্তিক হিসাবটা কী, সেটা কিন্তু জানানো হয়নি। বাংলা অঞ্চলে মুসলমানরা ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে  ৮০ শতাংশেরও বেশি। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কিন্তু শুধু পাঞ্জাবে বেশি; ৫০ শতাংশও না, ৪৫ শতাংশ মাত্র। যে বাঙালিদের জন্য পাকিস্তান হয়েছে, এক বছর যেতে না যেতেই সেই বাঙালিরা পাকিস্তানের গোড়া কেটে দিল, মাতৃভাষার দাবি তুলে। শুধু সাংস্কৃতিক বিষয় না, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক—সব কিছু মিলে ভাষার দাবি উঠেছে। এটার মধ্যে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলাম। যে ইংরেজদের খেদিয়ে দিলাম, পরে নতুনরা এসে ঘাড়ের ওপর চেপে বসল। বাঙালিদের একই অবস্থা। অতএব, দরকার নেই। আমরা পুরোপুরি স্বাধীন হতে চাই। এ চিন্তা থেকে স্বাধীনতার ব্যপারটা সামনে উঠে এসেছিল।

লোপা মমতাজ : আপনার পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে নতুন প্রজন্ম যাঁরা, তাঁদের লেখা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

শওকত আলী : আমি একটু বিচ্ছিন্ন ধরনের লোক। কারো সঙ্গে আলাপ-পরিচয় তেমন হয় না। কিন্তু তাদের লেখা সবই পড়ি এবং আমার ভালো লাগে। তাদের লেখার মধ্যে একটা জিনিস খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। যেমন চল্লিশ, ষাটের পরে এখনকার লেখায় মাটি ও মানুষের কাছে যাওয়ার একটা চেষ্টা লক্ষ করেছি এবং সেটার মধ্যে দুটি ধারা ছিল। একটা হচ্ছে তার সংগ্রামের দিক। আরেকটা বাস্তবতার। তো সেই বাস্তবতার দিকটা পরাবাস্তবতার সঙ্গেও মিলিয়ে দিয়ে গেছে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ করেছেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস করেছেন। এ দিকটা সংগ্রাম, পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাস—এ প্রশ্নগুলো এদের আলোড়িতও করেছে। এখনকার কবিতা, গল্প, উপন্যাস ওই ধারা থেকে খুব এগিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। আর যাদের মধ্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করছি, তার সুস্পষ্ট চেহারাটা যে কী, তা ধরতে পারছি না।

লোপা মমতাজ : এখানে শূন্যতাটা কোথায় মনে হয়?

শওকত আলী : শূন্যতা মনে হয়নি। জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে লেখালেখি করলেই পূর্ণতা এসে যাবে। জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে উপলব্ধি করলেই তা পূরণ হবে। দূর থেকে দেখে দেখে বা কল্পনা করে লিখলে পরে আসল ব্যাপারটা কিন্তু পাওয়া যায় না। এমনকি ভাষাটাও আসে না। এই যে ব্যক্তি, মানুষ, ঘটনা, মৃত্তিকা—এসবেই তো ভাষা থাকে। শুধু উচ্চারণভঙ্গি না, শব্দগুলোও পর্যন্ত থাকে। তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রেমের গল্প লিখছে, সেটা যদি আমি বানিয়ে লিখি তাহলে এক রকম। আর একেবারে অভিজ্ঞতা থেকে যদি লিখি তাহলে সেটা হবে আরেক রকম। কোনটা বেশি মনকে স্পর্শ করবে? এই তো ব্যাপার। এখন অনেক প্রতিশ্রুতিশীল লেখক আছেন, লিখছেন, আমার ভালো লাগছে। আমি আশাবাদী, একটা সুস্পষ্ট চেহারায় এসব সামনে বেরিয়ে আসবে। এইটুকুই বলার কথা এ প্রসঙ্গে।

লোপা মমতাজ : এটা একটা অবাস্তব বিষয় মনে হতে পারে। তবু বলি, এখন যদি এ জীবনটা শুরু থেকে আবার শুরুর সুযোগ পান তাহলে কী করতেন?

শওকত আলী : এখন আমার শরীরের যে অবস্থা, আমার মগজের যে অবস্থা, তাতে একটা বিস্মরণের ব্যাপার আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আমার মেমোরি কন্টিনিউ থাকে না। উপন্যাস লিখতে পারছি না, গল্প লিখতে পারছি না। সেটা যদি সংশোধন না হয়, পুরোপুরি লিখতেও পারছি না। আমি চেষ্টা করছি বাচ্চাদের জন্য ছড়া লিখতে। বড়দের জন্য কৌতুক, স্যাটায়ার লিখতে। এগুলোর জন্য চেষ্টা করছি। ছাপতে দিইনি এখনো। হয়তো দেব, তবে ছদ্মনামে। তরুণদের কাছে আমার খুব আকুল আবেদন, তারা যেন মৃত্তিকার সঙ্গে এবং মৃত্তিকালগ্ন মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়। সে একাত্মতার মধ্য থেকে যেন তারা শিল্প নির্মাণ করে, এটা আমার প্রার্থনা তাদের কাছে।



মন্তব্য