kalerkantho


বাংলা সাহিত্যে এক শক্তিমান শেরপা হাসান আজিজুল হক

আতিউর রহমান   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলা সাহিত্যে এক শক্তিমান শেরপা হাসান আজিজুল হক

বাংলাদেশ সাহিত্যের প্রবল প্রতিপত্তিশীল লেখক হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় ‘নিরন্তর’ সম্পাদক মাহবুব হাসানের সূত্রে। আমরা মাহবুবকে নাঈম বলেই ডাকতাম। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সমুন্নয়ে’র নামটিও তাঁরই দেওয়া। শুরু থেকেই সমুন্নয় ও উন্নয়ন সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাঈম। কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর গভীর হৃদ্যতার সুবাদে হাসান ভাইয়ের মতো অনেকের সঙ্গেই পরিচিতির সুযোগ মেলে। নাঈমকে দেখতে সমুন্নয়ে এলে আমার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বাড়ে। এভাবেই হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় গভীরতর হয়। এর আগে বিভিন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংগঠনে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তবে নিবিড় পরিচয় যাকে বলে তা ‘সমুন্নয়ে’ই হয়েছে। এ জন্য নাঈমের কাছে আমি চিরদিনই গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকব। রাজশাহীতে থেকেও হাসান ভাই মূল ধারার সাহিত্যে নিরন্তর বিচরণ করে চলেছেন। ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন। ওই দিন তিনি ঊনআশি পেরিয়ে আশিতে পা দেবেন। শুরুতেই তাই তাঁকে জন্মদিনের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। আরো অনেক দিন তিনি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির জমিনে পদচারণ করবেন সেই প্রত্যাশা করছি।

সর্বশেষ হাসান ভাইয়ের সঙ্গে এক মঞ্চে বসেছিলাম ২৩ জানুয়ারি ২০১৬ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক ফোরাম চত্বরে। সেদিন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে ‘জীবনের কথা, অর্থনীতির কথা’ শীর্ষক একটি গণবক্তৃতা দিয়েছিলাম। ওই অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন হাসান ভাই। তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া আমার আবেগঘন বক্তৃতার পর যে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়েছিলেন হাসান ভাই, তা আজও ভুলতে পারিনি। কতভাবেই না তিনি সেদিন আমার কাজ ও ভাবনাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান এই শেরপা ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিশু সাহিত্য, নাটক, স্মৃতিকথাসহ সাহিত্যের সর্বত্র দাপটের সঙ্গে চরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সুবিন্যস্ত গদ্য ও আকর্ষণীয় বর্ণনাভঙ্গির কারণে সচেতন পাঠকমাত্রই তাঁর লেখালেখির ভীষণ অনুরাগী। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তাঁর গল্পে, উপন্যাসে, আত্মজীবনীতে যেভাবে উঠে আসে তা আমি এই স্বল্পপরিসরে বলে বোঝাতে পারব না। এটা অনুভবের বিষয়। রাঢ়বঙ্গকে পটভূমিতে রেখে তিনি যেসব অসামান্য গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন সে সবের বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। পাঠকনন্দিত এসব রচনার কারণে তিনি দুই বাংলায়ই খুব জনপ্রিয়। ‘একুশে পদক’ ও ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে’ ভূষিত এই অসাধারণ কথাসাহিত্যিকের অসামান্য রচনাসামগ্রীর রকমফের সহজেই বোঝা বেশ কষ্টসাধ্য।

ছোটগল্প দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও পরবর্তী সময় উপন্যাসও লেখেন। হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে—‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ১৯৬৪; ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ১৯৬৭; ‘জীবন ঘষে আগুন’, ১৯৭৩; ‘নামহীন গোত্রহীন’, ১৯৭৫; ‘পাতালে হাসপাতালে’, ১৯৮১; ‘নির্বাচিত গল্প’, ১৯৮৭; ‘আমরা অপেক্ষা করছি’, ১৯৮৮; ‘রাঢ়বঙ্গের গল্প’ ১৯৯১; ‘রোদে যাবো’ ১৯৯৫; ‘মা-মেয়ের সংসার’, ১৯৯৭; ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প’, ২০০৭ ইত্যাদি। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম : ‘আগুনপাখি’, ২০০৬; ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’, ২০১৩; ‘শামুক’, ২০১৫। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’, (২০০৯); ‘উঁকি দিয়ে দিগন্ত’, (২০১১); ‘টান’, (২০১২); ‘লন্ডনের ডায়েরি’, (২০১৩); ‘এই পুরাতন আখরগুলি’, (২০১৪)।

তাঁর লেখা ‘একাত্তর করতলে ছিন্ন মাথা’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি অসাধারণ প্রামাণ্যচিত্র। ঘটনাগুলো পড়লেই খুলনা, যশোর, নড়াইল এলাকায় সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের কিছু খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের ছোট ছোট ঘটনা এই বইয়ে অন্যভাবে পরস্ফুিটিত হয়েছে। তিনি নিজের দেখা ঘটনাগুলোই চমৎকারভাবে লিখেছেন। এই বইয়ের শুরুতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার জানা ছিল না যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে, আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে। মৃত্যুর পরে পানিতে এদের মধ্যে এইটুকুই তফাত। এই জ্ঞান আমি পাই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে—ত্রিশ বা ঊনত্রিশ তারিখে।’ বোঝা যায় একাত্তরের নিষ্ঠুরতা কতটা তাঁর হৃদয়ে আঘাত হেনেছিল। এই বইটিতে ফুলতলার কলেজছাত্রী শান্তিদাস এবং রাজাকারদের হাতে ধৃত শ্রমিকনেতা রফিককে পাকিস্তানি বাহিনী কতটা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল, তার বিস্তারিত বিবরণও স্থান পেয়েছে।

হাসান আজিজুল হকের লেখা আত্মস্মৃতি ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ যেন জীবনের অসাধারণ এক প্রামাণ্যচিত্র। এই বইতে পরিবার ও সমাজের কথা তিনি বলে গেছেন, নিখুঁতভাবে। শৈশব, কৈশোরের স্মৃতিময় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন চমৎকার কথামালায়। ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ প্রন্থে গ্রামবাংলার সেই সময়ের চিত্রগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়।

আগেই বলেছি, তাঁর লেখালেখির সাহিত্যিক বিচার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, তিনি অন্য অনেকের চেয়ে ভিন্ন এক জীবনসংগ্রামের কথক। দেশ ভাগের মনস্তাত্ত্ব্বিক চাপ তাঁর লেখায়, বলায় অনুভব করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের মৌল আকাঙ্ক্ষাও তাঁর সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধটা আসলে যে ছিল এক জনযুদ্ধ—হাসান ভাইয়ের আত্মজৈবনিক লেখায় তা স্পষ্ট করে ধরা পড়ে। আমাদের সমাজ ও স্বদেশ যে সব টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, তা-ও তাঁর লেখায় অনুভব করা যায়। এত কিছু সত্ত্বেও তিনি এক নিরন্তর আশাবাদী মানুষ। অনুপ্রেরণা সঞ্চারী এই অসাধারণ সৃষ্টিশীল মানুষকে আমি নিবিড়ভাবে জানি—সেটিই আমার জন্য বড় পাওয়া। হাসান ভাই দীর্ঘজীবী হোন এবং বাংলা সাহিত্যকে আরো পোক্ত করুন—এবারের জন্মদিনে সেই কামনা করছি।



মন্তব্য