kalerkantho


এইখানে প্রাকৃতমানুষ

ইমতিয়ার শামীম

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এইখানে প্রাকৃতমানুষ

সে এক কঠিন সময়, আমাদের সঙ্গে শওকত আলীর পরিচয় ঘটল তখন। ষাটের দশকের উজ্জ্বলতা তখন কিছুতেই থিতু হতে পারছে না সত্তরের অস্থিরতায়। সেনাশাসন শুরু হয়েছে তখন; নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তাকে, মাত্র বছর-তিনেক আগেও যার অঙ্গুলি হেলনে থমকে দাঁড়াত কোটি মানুষের ঢল, যার মৃত্যু তখনো অবিশ্বাস্য ও অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা। অবিরত চলছে ‘রাষ্ট্র মানেই লেফট, রাইট, লেফট’। যে স্বপ্ন বিশাল এক সমুদ্রের মতো জেগে উঠেছিল পুরো ষাট দশকজুড়ে, আর যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল সত্তরের শুরুতেই, তা তত দিনে ফিকে হয়ে আসছে। তখনই তিনি আমাদের কাছে এলেন।

কুলীন ম্যাগাজিন বলতে তখন ওই শুধু সাপ্তাহিক বিচিত্রা। সেই ম্যাগাজিনের ঈদ সংখ্যায় পরপর তিন বছর আমরা শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় পড়লাম তাঁর তিনটি উপন্যাস। ১৯৭৬ সালে ছাপা হয়েছিল তাঁর ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ১৯৭৭-এ ‘কূলায় কালস্রোত’ আর ১৯৭৮-এ ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’। হলফ করে বলতে পারব না ঠিক কোন সালে পড়েছি এসব; তবে স্কুলে সেই কৈশোরেই যে পড়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব তখন আমাদের ঠিক পড়ার কথা নয়। তবে গ্রামে থাকি, স্বাদ লাগুক বা না লাগুক, যা পাই তা গোগ্রাসে পড়ে ফেলি। আমাদের টিনের চালে শিশির ঝরার দিনগুলোকে ‘দক্ষিণায়নের দিন’গুলো দিয়েছিল অনাস্বাদিত এক অনুভূতি। এত দিন পেরিয়ে গেছে, তবু এখনো চকিতে সেই উত্তেজনা আর আবেগকে ফিরে পাই—দূর কৈশোরে সেজানকে খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনা, রাখীর মতো কাউকে অনুভবের আবেগ। এখনো আমি প্রায় মুখস্থ বলে দিতে পারি কোনো এক হিমরাতের ঘটনাটিকে, যখন সেজান চলে যাচ্ছে রাখীকে হাসপাতালে রেখে :

রাখী, এবার আমাকে বাইরে যেতে হবে।

বাইরে? কোথায়?

গ্রামের দিকে।

কেন, গ্রামের দিকে কেন?—রাখী যেন বুঝতেও চায় না। 

গ্রামের দিকে কাজ রয়েছে আমার।

তখন অনেক রাত—হেমন্ত-শীতের রাত। জানালার কাচ দিয়ে বাইরের কিছুই দেখা যায় না। সেজানের চোখের দিকে তাকিয়ে রাখী স্থির হয়ে যায়।

শওকত আলী মানেই সেই হেমন্ত-শীতের উত্তেজনা। শওকত আলী মানেই সেই সব তরুণের সান্নিধ্য ফিরে পাওয়া, যারা ষাটের দশকে নিজেদের কথিত ভবিষ্যৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা, মা-বাবা, ভাই-বোন সবার পিছুটানকে উপেক্ষা করে মানুষকে জাগাতে গ্রামে চলে যাওয়া, কোটি কোটি দরিদ্র-নিপীড়িত-অধিকারবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে নিজের ভাগ্যকে বেঁধে ফেলা। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তাই চকিতে আবারও সেই উত্তেজনা ফিরে আসে। মনে হয় মৃত্যু নয়, এই নগর ছেড়ে তিনিও গ্রামে চলে গেছেন সেই সেজানের মতো শ্রেণী-সংগ্রামের স্বপ্ন নিয়ে, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে আমরা প্রথানুগত যে প্রস্তুতিপর্ব পাই, কথকতা পাই, শওকত আলীর এই ট্রিলজি—‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কূলায় কালস্রোত’ ও ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ সে ক্ষেত্রে এক বিশেষ ব্যতিক্রম। মধ্যবিত্তের উত্থানকেই রচনা করেন তিনি, পরিচিত করান নানা আদলের মধ্যবিত্তের সঙ্গে। কিন্তু যাকে ঘিরে সঞ্চারিত ও তরঙ্গিত হয় অপরাপর সবাই, শুধু সেই মধ্যবিত্তের পক্ষেই বোধকরি সম্ভবপর ছিল বাংলাদেশকে সুস্থির একটি পথরেখায় নিয়ে যাওয়া। বিভূতিভূষণের মধ্যবিত্ত অপু যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমিত রায়ের মতো মধ্যবিত্ত থেকে পৃথক হয়ে যায়, শওকত আলীর এই মধ্যবিত্ত ঠিক তেমনি তাঁর নিজেরই ‘পিঙ্গল আকাশ’ কিংবা ‘উন্মূল বাসনা’য় আঁকা মধ্যবিত্ত থেকে আলাদা হয়ে যায়, সৈয়দ শামসুল হক কিংবা আবদুল গাফফার চৌধুরীর উপন্যাসে জেগে ওঠা মধ্যবিত্ত থেকে ভিন্ন এক অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। এমন নয় যে তিনি তাঁর লেখায় বিশেষ কোনো শ্রেণির উদ্বোধন ঘটানোর চেষ্টা করেন। তেমন এক প্রকল্পের দূরাভাস পাই বটে আমরা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেই রচনা করেন তিনি। ব্যক্তিরই উদ্বোধন ঘটান তিনি, তবে তা বিকশিত হয় রাজনৈতিক সময়ের কাঠামোতে। যে মানুষগুলো সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন, শওকত আলীর কাছে তারা তাই বিশেষ দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে, শওকত আলী নিজেও তাদের কাছে বিশেষ দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠেন; যে মানুষগুলো সাহিত্যে শ্রেণীবৈচিত্র্য খোঁজে, জীবনযাপনের অলিন্দ থেকে গহিন খোঁজে, তাদের কাছে শওকত আলীর এই ট্রিলজি নতুন নতুন সব আভাস তৈরি করে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের যে প্রেক্ষাপট শওকত আলীর এই ট্রিলজিতে ধরা দেয়, তাতে যেন নতুন রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎও ফুটে ওঠে—যে রাষ্ট্রে প্রতিটি শাসকই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলবে; কিন্তু প্রতিটি শাসকই আবার জনগণকে লুটপাট করে চলবে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির মতো। অথচ এমন এক গুরুতর অপরাধ করার পরও এই সব শাসককে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলা যাবে না! বিভক্ত এক মধ্যবিত্তের নানামুখী বিকাশ রচনা করেন শওকত আলী তাঁর এই ট্রিলজিতে, যাদের মধ্যে একটি অংশ গ্রামে ফিরে যায়, শোষিত মানুষের মুক্তির উপায় খুঁজে ফেরে। কিন্তু শোষিতের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্মও হতে পারে না। তেভাগা আন্দোলনের অভিজ্ঞতাতপ্ত শফিউদ্দিনকে তাঁর উপন্যাসে বলতে দেখি, ‘গরু চুরি হয়ে যাওয়া যে ছেলেমেয়ে চুরি হয়ে যাওয়ার চাইতেও ভয়াবহ, সেটা বোঝেন আপনারা?’ তা ফেলনা নয় তো, তার এই প্রশ্ন। আরো আগে সমাজে এই চিন্তাটা ছিল আরো চাঁচাছোলা ধাঁচে—‘ভাগ্যবানের বউ মরে, দুর্ভাগার গরু মরে’। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘গড় শ্রীখণ্ডে-’ এই গরু মরার গ্রামীণ বৃত্তান্ত যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, কী ভয়ানক এক বিপর্যয়কর ব্যাপার গরু মেরে ফেলার ঘটনা, কী ভয়াবহ এক সময় এসে দাঁড়ায় তখন কোনো কৃষকের সামনে।

অবিশ্বাস্য মনে হলেও তো সত্যি, ষাটের দশকে শিক্ষার সংস্পর্শে আসা তরুণদের একটি বড় অংশ এই কৃষকদের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে। কৃষক-সাধারণ মানুষকে বুঝতে না পারার মতো বিশাল এক দূরত্ব নিয়েও মধ্যবিত্ত মানসিকতার এই শিক্ষার্থীরা তখন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গ্রামে চলে গেছে। আবার এটাও সত্যি অবশ্য, এই উঠতি মধ্যবিত্তেরই একটা অংশ সরাসরি উচ্চবিত্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, বিত্তের সন্ধানে ছুটেছে; মুক্তিযুদ্ধের জন্য তাদের যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, তাদের যে আত্মদান, সে সবের উদ্দেশ্য আসলে ওই পাকিস্তানি শাসকদের জায়গাটি দখল করা। শওকত আলী এই দুই মধ্যবিত্তের মুক্তিযুদ্ধপূর্ব দিনগুলোকে ধরে রাখেন তাঁর এই ট্রিলজিতে। শ্রেণিচ্যুত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গ্রামে চলে যায় যে সেজান, তাকে আমরা ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিনে’ বলতে শুনি,

‘আমার ধারণা, সামনে একটা খুব বড় আন্দোলন আসছে—এমন আন্দোলন এ দেশে আর কখনো হয়নি। এই আন্দোলনে বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিতে হবে। কেননা এর পর পরই স্বাধীনতার প্রশ্ন বড় হয়ে উঠবে। এ আন্দোলন হবেই, কেউ ঠেকাতে পারবে না। অথচ মুশকিল কি জানেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে পুরো মাত্রায়। তার মানে আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে, যদি প্রোগ্রেসিভ ফোর্স নিজেদের সংগঠিত করতে না পারে।’

সেজানের ধারণাই সত্যি হয়েছে, বড় একটা আন্দোলন হয়েছে, তার পর স্বাধীনতার প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে; কিন্তু সেই স্বাধীনতার প্রশ্নে বামপন্থীরা আর পোক্ত কোনো অবস্থান নিতে পারেনি। কারণ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকার জন্য, জনগণের অনুভূতি-আবেগকে বোঝার জন্য যে একাগ্রতার প্রয়োজন ছিল, তা তাদের ছিলই না বলতে হবে। চিন্তার ঐক্যে নয়, ছাঁচে ঢালা তত্ত্ব নিয়ে তর্ক করতে ভালোবাসত তারা। ঘুণাক্ষরেও তাদের মনে হয়নি, কৃষক-শ্রমিকের কাছে নিজেদের শ্রেণিমুক্তির চেয়েও দেশের স্বাধীনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে; তাই পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী স্বাধীনতার সংগ্রামকেই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণ করেই এগোতে হবে।

বাস্তবতাও আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে না পারার ব্যর্থতাকে ঢাকতে ব্যস্ত অনেক বামপন্থীই একাত্তরের পরও অনেক দিন দেশটাকে ‘ভারতের উপনিবেশ’ জাতীয় কিছু একটা ভেবেছেন, মাও জে দং যেমন চীনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের দিনগুলোতে প্রতীকী অর্থে বিভিন্ন পাহাড়ের ভার অনুভব করেছেন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও তারা ঠিক ততগুলোই পাহাড়ের ভার অনুভব করেছে। যে বামপন্থীদের পূর্ববঙ্গে ১৯৭০ অবধি বসবাস করার সময় কখনো পাকিস্তানের প্রায়-উপনিবেশিক শাসন-শোষণে ক্লিষ্ট-পিষ্ট হওয়ার যন্ত্রণাকর অনুভূতি হয়নি, স্বাধীন বাংলাদেশকে তারাই যখন এই ‘ভারতের উপনিবেশ’, ‘তাঁবেদার’ কিংবা ‘দালাল’ জাতীয় কিছু একটা ভাবতে শুরু করল, জনগণের কাছে তা হাস্যকরই মনে হতে লাগল! সব মিলিয়ে জনগণের প্রতি তাদের যাবতীয় আন্তরিকতাই মাঠেমারা গেল এমন করে। শওকত আলী নিজে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমনকি কারাভোগও করেছেন; বাম রাজনৈতিক ব্যর্থতার এই পরিপ্রেক্ষিত আর ভবিষ্যতের ইঙ্গিতই তিনি যেন রচনা করে গেছেন প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসঞ্চিত এই ট্রিলজির মধ্য দিয়ে। মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, তিনি আসলে একটি প্রেমের উপন্যাসই লিখতে চেয়েছেন। হয়তো সত্যিই তিনি তাই লিখেছেন, কিন্তু যে সময়ের মধ্যে এই ব্যক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেই সময়ই এ ট্রিলজিকে রাজনৈতিক উপন্যাসের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। 

এমনকি নারীও এখানে নিজের বৃত্ত পেরিয়ে সেই রাজনীতির অংশীদার কিংবা ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে। যেমন : বুলুকে দেখা যায় মধ্যবিত্তের সেই অংশটিরই প্রতিভূ হয়ে উঠতে, যারা পুঁজির পেছনে ছুটছে হন্যে হয়ে। রাখীকে আমরা দেখি তার অনাগত সন্তানের নামও সেজান রাখতে। কিংবা দেখি, বন্ধুর সঙ্গে আত্মগত কথাবার্তা বলতে বলতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে, যদি তার প্রথমেই সেজানের সঙ্গে বিয়ে হতো, সংসার-সন্তান এই সব হতো, তাহলে কেমন হতো? আর তার উত্তরও সে নিজেই খুঁজে নিচ্ছে, ‘আমি তাহলে সেজানকে পেতাম না। সেজানদের কি সহজে পাওয়া যায়?’ এভাবে প্রেমের যে নিবিড়তা ও ঘোর শওকত আলী তৈরি করেন, তার তলদেশে নতুন একটি বোধও জন্ম নিতে থাকে। অনাগত সন্তানের নাম সেজান রাখার মধ্য দিয়ে রাখী নিজেকে ঘিরে একটি আদর্শের অস্তিত্বও ঘোষণা করে, নতুন একটি ব্যূহ রচনা করে। তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জেনে তার এক বন্ধুকে প্রশ্ন করতে শুনি, সেজান গ্রামে চলে যাওয়ার আগে তাকে (রাখীকে) কিছু বলে গেছে কি না। উত্তরে রাখী বলে, ‘আমি কী করব না করব, সে কথা ও বলতে যাবে কেন?’ মনে হয়, রাখী শুধু নিজের অস্তিত্বই ঘোষণা করছে না, সেজানের মৃত্যুহীনতাকেও ঘোষণা করছে সে।

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’—এই ট্রিলজি এবং দেশভাগের অভিঘাত নিয়ে লেখাগুলো মিলিয়ে শওকত আলী আমাদের জন্য নির্মাণ করে গেছেন ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের এমন এক চালচিত্র, যা শুধু পাঠক নয়, গবেষকদের জন্যও চিন্তাজাগানিয়া। তাঁর উপন্যাসে শ্যামাঙ্গ মারা যায়, কিন্তু লীলাবতী বেঁচে থাকে; সেজানের মৃত্যু ঘটে, অজ্ঞান হয়ে পড়লেও রাখী তখনো বেঁচে থাকে। আমরা অনুভব করি, ভূগোল, রাজনীতি, সমাজ, সম্পর্ক—সব কিছুই পাল্টে যাচ্ছে, সব কিছুরই মৃত্যু ঘটছে; কিন্তু মানুষের অনন্ত যাত্রা অব্যাহত রয়েছে নারীকে অবলম্বন করে, পরিবর্তনের স্রোতধারাকে ঘিরে ধরে। তাঁর উপন্যাসের সেই অংশটুকু মনে করা যাক, মনে করা যাক রাখীর সেই অপেক্ষার দিনগুলো—বড় কঠিন সেই সময় :

রাখীর এখন শুধু সন্তানের জন্য অপেক্ষা, এপ্রিল এখনো দূরে। কিন্তু এই অপেক্ষাতেও রাখীর ক্লান্তি নেই, শূন্যতা নেই, নিঃসঙ্গতা নেই।

একেক দিন মিছিল দেখে রাস্তায় নেমে পড়ে। কোনো দিন ইউনিভার্সিটি গেটের কাছে, কোনো দিন গুলিস্তানের মোড়ে, কোনো দিন প্রেস ক্লাবের সামনে। আর হাঁটে রাখী। শীতের বাতাস টাল খেয়ে যায়, দালানে দালানে ধাক্কা লেগে। রাখী তখন মনে মনে ছেলেকে ডাকে। বলে, দেখ, এখানে আমি হেঁটেছিলাম—তুইও হাঁটিস এখান দিয়ে, এখানে দাঁড়িয়ে আমি মিছিল দেখেছিলাম— তুইও দেখিস এইখানে দাঁড়িয়ে, সেজানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল এখানে, এই গাছতলায়—তুইও এখানে দাঁড়াস, আর এই যে রাস্তাটা, এই রাস্তায় সেজান মিছিল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল—তুইও এই রাস্তা দিয়ে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাস, হ্যাঁ রে, পারবি তো?

নতুন এক শওকত আলীকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার ছলে আমরা বারবার এই প্রাকৃত মানুষটিরই কাছে ফিরে আসি। আর তাতে বারবার নতুন এক শওকত আলীরই পুনর্জন্ম ঘটে।



মন্তব্য