kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

সমাজবাস্তবতার কবি পাবলো নেরুদা

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সমাজবাস্তবতার কবি পাবলো নেরুদা

চিলির কবি, কূটনীতিক ও রাজনীতিক পাবলো নেরুদার আসল নাম রিকার্দো এলিয়েসার নেফতালি রেইস বাসোয়ালতো। জন্ম ১২ জুলাই ১৯০৪ সালে।

তিনি ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর কবি পরিচিতি প্রকাশ পায়। বিচিত্র শৈলীতে তিনি কবিতা ও গদ্য লিখেছেন। পরাবাস্তব কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, খোলাখুলি রাজনৈতিক লেখা, প্রবল আবেগী প্রেমের কবিতা—সবই লিখেছেন তিনি।  

পাবলো নেরুদার বাবা ছেলের কবি হওয়ার ইচ্ছাটাকে পছন্দ করেননি। লেখালেখির ব্যাপারে অন্য কারো কাছ থেকে উত্সাহ পেলেও বাবার থেকে পাননি। কাব্যচর্চার শুরুতে তাঁর ছদ্ম নাম ব্যবহার করার পেছনে বড় কারণ হলো, বাবার কাছ থেকে তাঁর কাব্যসাধনার বিষয়টি লুকিয়ে রাখা। এ জন্য তিনি চেক কবি জাঁ নেরুদার নাম ব্যবহার করেন নিজের জন্য।  

জীবনে একাধিক কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন নেরুদা।

চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সিনেটরের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। স্পেনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাদ্রিদে শিল্পী-কবিদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পান তিনি। রাফায়েল আলবার্তি, গার্সিয়া লোরকা প্রমুখের সঙ্গে তাঁর প্রাণবন্ত সময় কাটে। তাঁদের আসরে আরো যোগ দিতেন পেরুর কবি সিজার ভায়েহো। স্পেনের গৃহযুদ্ধ নেরুদার কবিমানসে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। জীবনে প্রথমবারের মতো রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। তখন থেকেই তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি জোরালোভাবে উত্সাহী হন। বাকি জীবন সমাজতন্ত্রের সমর্থনে অটুট ছিলেন। নেরুদার রাজনৈতিক দর্শনে তাঁর বামপন্থী লেখক বন্ধুদেরও ভূমিকা ছিল। তা ছাড়া লোরকার মৃত্যুও তাঁর মনকে স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে কঠিন করে তোলে।

নেরুদা মনে করতেন, মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে গ্রোথিত থাকলে শিল্প সৃষ্টির প্রয়াস আর চিন্তার প্রকাশ ইতিহাস ও রাজনীতির প্রেক্ষিতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িত থাকে। তিনি মনে করতেন, কোনো কোনো বই ইতিহাসে বিশেষ কোনো মুহূর্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম বই যখন সমসাময়িককালের সমস্যার সমাধান করে ফেলে, তখন সে বইয়ের মধ্যেই সেটার বিস্মৃতি তৈরি হতে থাকে। চিরকালের জন্য কোনো বই রচনা করার উদ্দেশ্য নেরুদার মতে একটা অবাস্তব বিশ্বাস। শুধু কবির নিজের অনুভূতির বর্ণনা করার চেয়ে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করাটাই তাঁর কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে। তাঁকে নিয়ে কবি, সাহিত্যিক ও সমালোচকদের মতামত প্রকাশের ধারা বেশ দীর্ঘ। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁকে বিশ শতকের সব ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি বলেছেন। নেরুদাকে পশ্চিমা ঐতিহ্যের ২৬ জন মহান লেখকের অন্যতম বলে মনে করেন সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম। কোনো সমালোচক তাঁর সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে চরম মাত্রার মনে করেছেন; আবার অনেকের ধারণা, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কবিতার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক ন্যান্সি উইলার্ড বলেন, নেরুদা পরিষ্কার করে দিয়েছেন, অস্থায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে তীব্র অভিজ্ঞতা বলতে মৃত্যু বোঝায় না; বরং জীবিতদের মধ্যে আমাদের বিচ্ছিন্নতাই বোঝায়। নেরুদা হতাশা সহ্য করতে পারতেন না।  

১৯৭১ সালে তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরোহণ করেন এবং চিলির কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়ন দেয়। তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে সালভাদর আইয়েন্দেকে মনোনয়ন দেন। ভালোবাসা ও সত্যের জয় হয়, আইয়েন্দে নির্বাচনে জয় পান।

চিলির রাজনৈতিক অঙ্গনে আবার অন্ধকার নেমে আসে। স্বৈরাচারী পিনোশের চক্রান্তে নেরুদাকে প্রাণনাশের ইনজেকশন দেওয়া হয়। ইনজেকশনের সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নেরুদা মারা যান। তবে পিনোশের চক্রান্তেই প্রচার করা হয় তিনি প্রস্টেট ক্যান্সার কিংবা হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। নেরুদার দাফনে জনসমাগম নিষিদ্ধ করে কারফিউ জারি করেন পিনোশে। তবে হাজার হাজার শোকার্ত চিলিবাসী কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে তাদের প্রিয় কবির দাফনে শরিক হতে।

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য