kalerkantho


রানি মৃগনয়নির জন্য সেতার বাদন

অদিতি ফাল্গুনী

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রানি মৃগনয়নির জন্য সেতার বাদন

অঙ্কন : মানব

১. সকালের বন্দিশ

খুব ভোরে উঠে তিনি আজ সেতার নিয়ে বসেছিলেন। মাঝে কিছুদিন অবিশ্রান্ত খাতা দেখার চাপ গেল।

সেতার খুব সহজ বাদ্যযন্ত্র নয়। তাকে অনেক প্রেম দিতে হয়। সামনে রাখা স্বরলিপির খাতা উল্টাতে উল্টাতে অধ্যাপক আজিজুল রহিমের মনে হলো, আজ ভোরে রাগ বিলাসখানি তোড়িই বাজানো যাক।

আরোহণ : স ঋ জ্ঞ প, দ র্স।

অবরোহণ : র্স ণধ প, দ মজ্ঞ রগড় রস।

ঠাট : ভৈরবী।

জাতি : ঔড়ব-সম্পূর্ণ।

বাদীস্বর : শুদ্ধ ধৈবত।

সমবাদী স্বর : কোমল গান্ধার।

অঙ্গ : উত্তরাঙ্গ।

সময় : দিনের প্রথম প্রহর।

পকড় : দম, জ্ঞঋ, জ্ঞঋ স।

স্বরলিপি খাতার দিকে তাকাতে তাকাতে খরজের তারে সা-তে ভালো করে সুর বেঁধে নিলেন আজিজুল। চিকারির তারেসা সা গা ঠিকমতো বাজছে তো? মধ্যম ষড়জ পঞ্চম বা সোজা বাংলায় মা সা পা বাজে যে তিনটি তারে, সেগুলোও টানটান সুরে বাজছে না। তরফের তারগুলো? বিলাসখানি তোড়ির বাদী ও সমবাদী ঠিকমতো বাজছে তো তরফের তারগুলোয়? নয়তো মূর্ছনা জমবে না।

...একটা জীবন সেতার নিয়ে কাটাতে পারলে বেশ হতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা অন্য নানা ৯টা-৫টা চাকরির তুলনায় অনেক বেশি চাপমুক্ত ঠিকই। তবু সম্মান পর্বের এত এত ক্লাস, পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা, রুটিন করা, একাডেমিক কমিটির মিটিং—সব মিলিয়ে সেতার অনুশীলনের খুব সময় আর কই মেলে? বিলাসখানি তোড়ির কোন বন্দিশটি বাজানো যায়?

বাঁশিয়া বাজে মোহন শ্যাম কি

বিরাজ বনিতা সব দৌড় দৌড় ঘর বার ত্যজি।

শ্রবণ সুখ দায়ী তনমন লুভায়ী।

সব গোয়ালন কর শৃঙ্গার সাজি।

অদ্ভুত চিত্রকল্প। শ্যামের মোহন বাঁশি বাজছে। ব্রজের রাখালের বাঁশি শুনে যত গোয়ালিনী সুন্দর সেজেগুজে ছুটছে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে, বিলাসখানি তোড়ি রাগটি মিঞা তানসেনের সৃষ্টি। আবার কেউ বলে, এই রাগটি গোয়ালিয়রের রানি মৃগনয়নীর সৃষ্টি। গোয়ালিয়র একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের ওপর একটি সেমিনারে গিয়েছিলেন আজিজুল। পরে গোয়ালিয়র কেল্লা দেখতে দেখতে সেখানে রানি মৃগনয়নীর একটি ছবি দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। গুজরাটি এই রাজকন্যা গোয়ালিয়রের নৃপতি রাজা মান সিং তোমাদের বধূ হতে রাজি হন তিন শর্তে। একটি শর্ত হলো—তাঁকে দিতে হবে আলাদা প্রাসাদ, যেখানে জল আসবে রাইন নদ থেকে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, আদর্শ ক্ষত্রিয়াণী হিসেবে রাজার সঙ্গে সব যুদ্ধে তিনি থাকবেন। তৃতীয় শর্ত হলো, তিনি সংগীত চর্চা করতে চান। ভাবা যায়, একজন নারী এত সুন্দর রাগ সৃষ্টি করেছেন? কেউ কেউ আবার বলেন, মিঞা তানসেনের ছেলে বিলাস খাঁ এই রাগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর নামেই রাগটির নাম বিলাসখানি তোড়ি। মিঞা তানসেন তো গোয়ালিয়র রাজদরবারের নবরত্নসভার একজন ছিলেন। আকবরের নবরত্নসভারও নাকি একজন ছিলেন। একসঙ্গে কতজনের সভায় ছিলেন? নাকি আজকের দিনেও সেলিব্রিটিরা যেমন নানা সভায় ট্রাস্টি হন, সে রকম কিছু ছিল বিষয়টা? তা সেই গোয়ালিয়র কেল্লায় গুর্জরীমহল বা রানি মৃগনয়নীর জন্য নির্মিত মহলে গিয়ে রানি মৃগনয়নী সেতার বাদন করছেন—এমন একটি ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন আজিজুল অনেকটা সময়। আজ ভোরের বাতাস যেন সেই ছবির পরিচ্ছন্নতা অনেকটাই ধারণ করে আছে। বন্দিশ শেষ করে এখন দ্রুত লয়ের তান বাজাতে হবে। প্রথমে আট মাত্রা, তারপর ১১ মাত্রা ও সব শেষে ১৬ মাত্রার তান।

সর গপ ধর্স নধ পম ধপ মগ রস।

গপ ধন র্সর র্গর র্সন ধপ মগ মপ র্সন ধপ মগ রস।

সর গপ ধন সন ধপ মগ সর গপ ধস নধম ন ধপ সর গর মগ রস।

সেতারে দ্রুত তান তোলা শুরু করেন আজিজুল। মনে হচ্ছে, খোদ রানি মৃগনয়নীর সামনে তিনি বসে আছেন। যেন গাঢ় রক্তবর্ণ কাঁচুলি আর ওড়নার সঙ্গে বাসন্তী রঙের ঘাগরা পরে তাঁর সামনে বসে আছেন খোদ রানি মৃগনয়নী।

—আর কতক্ষণ রেওয়াজ করবে? ডিপার্টমেন্টে ৮টায় ক্লাস—খেয়াল আছে তো?

—হুম। এখন তো মাত্র সাড়ে ৬টা বাজে। আরো আধঘণ্টা রেওয়াজ করার পর শাওয়ার নিয়ে, খেয়েদেয়ে বের হব। সাড়ে ৭টায় বের হলেই চলবে।

স্ত্রী লিকার চায়ের কাপ রেখে গেল। এবার আজিজুল রহিম ধরলেন রাগ শিবরঞ্জনী। পঞ্চম এবং নিষাদবর্জিত এই রাগ কাফি ঠাটের আওতায় পড়ে। যদিও দক্ষিণ ভারতীয়রা বলে শিবরঞ্জনী তাদের আবিষ্কৃত। উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি সংগীতকে এই কৃতিত্ব তারা দিতে চায় না। কেউ কেউ আবার বলে, শিবরঞ্জনী রাগ ভূপালির সহোদর। সেটি কী করে হয়? ভূপালিতে শুদ্ধ গান্ধার চলে আর শিবরঞ্জনীতে কোমল গান্ধার। কখনো কখনো শুদ্ধ-কোমল দুটির মিশ্রণও চলে। আশাবরী ও জৈনপুরীর ভেতর যেমন অনেক মিল সত্ত্বেও সামান্য অমিল আছে, যা সংগীতবোদ্ধাদের কান ফাঁকি দিতে পারে না, ভূপালি ও শিবরঞ্জনীর ভেতরও তা-ই।

—এই...পৌনে ৭টা বেজে গেল! এখনো রেওয়াজ থেকে উঠবে না?

স্ত্রী আবার এসে তাড়া লাগাল। এবার উঠলেন আজিজুল। পাঁচ মিনিটে শেভ করে ঢুকলেন বাথরুমে। পনেরো থেকে কুড়ি মিনিটের ভেতর শাওয়ার নিয়ে, খেয়ে বের হলেন সাড়ে ৭টায়। সকালবেলার সবুজ মতিহার ক্যাম্পাসের সত্যি তুলনা নেই। কাজলা গেটের সামনে দিয়ে হনহন করে হেঁটে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। আজ সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে পড়াতে হবে কোলরিজের কুবলাই খান।

In Xanadu did Kubla Khan 
A stately pleasure-dome decree : 
Where Alph, the sacred river, ran 
Through caverns measureless to man 
Down to a sunless sea.

—নাস্তিকরে ধর—নাস্তিকরে ধর!

রানি মৃগনয়নীর উদ্দেশে সেতার বাদন ভুলে মাত্রই শানাডুতে কুবলাই খানের প্রাসাদে চলাচল শুরু করেছিলেন অধ্যাপক আজিজুল। ‘ধর! ধর!’ শব্দ শুনে ঘাড় তুলে তাকানোর আগেই এক লহমায় হিম হয়ে গিয়ে দেখলেন, তাঁর এক হাতের ভেতর একটি হোন্ডা এসে থামতে না থামতে দুজন যুবক লাফিয়ে নামল। গোটা বিষয়টা ভালো করে বোঝার জন্য ঘাড় ঘোরানোর আগেই সকাল সাড়ে ৭টার রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠল একটি চাপাতি। পেছন ফিরে ঘোরার আগেই তিনি বুঝতে পারেন যে ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা কী যেন স্পর্শ করেই গেঁথে গেল...গেঁথে গেল অনেকটা মাংস আর চামড়াসুদ্ধ আর তিনি অসহায়ের মতো মাটিতে পড়ে যেতে থাকলেন।

২. সাক্ষ্য পর্ব

—খুকি, তোমার নাম কী?

—নাম বলতে নিষেধ আছে।

—বয়স কত তোমার?

—বারো।

—কোন ক্লাসে পড়ো?

—ক্লাস এইটে।

—তুমি কি অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকি হত্যার সময় আশপাশে কোথাও ছিলে?

—জি...আমি আজিজুল আংকলদের ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটেই চার তলায় থাকি।

—অধ্যাপক আজিজুলকে যখন খুন করা হয়, তুমি সেটা কিভাবে দেখলে? তুমি তখন কোথায় ছিলে?

—আমি আমাদের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে গোলাপের চারায় পানি দিচ্ছিলাম। তখন দেখি, নিচে আজিজুল আংকল হাঁটছেন। হঠাত্ তাঁর পিছে একটি হোন্ডা আসল...।

—তারপর?

—সেই হোন্ডা থেকে দুজন লোক ইয়া বড় দুইটা ছুরি নিয়ে ওনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল!

—তারপর?

—আমি গোলাপের চারায় পানি ঢালছিলাম তো আমার হাত থেকে ঝাঁজরিটা পড়ে গেল। তারপর মিনিটের মাথায় লোক দুটি আংকলের ঘাড়ে কয়েকটা কোপ দিয়ে আবার হোন্ডায় উঠে স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। তাকিয়ে দেখি কী আজিজুল আংকল উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন আর দেখতে দেখতে রক্তের পুকুর হয়ে গেল জায়গাটা!

—আশপাশের মানুষজন কিছু বলেনি?

—সকালবেলা। আশপাশে খুব বেশি মানুষজন ছিলও না। হঠাত্ খুব জোরে শব্দ করতে করতে হোন্ডাটা এসে—খুনটা করেই—চোখের পলকে মিলিয়ে গেল। তখন তো দেখতে দেখতে অনেক মানুষ জড়ো হলো।

শাহাদাতউদ্দিন

ভারপ্রাপ্ত অফিসার, বোয়ালিয়া থানা, রাজশাহী।

—ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরপরই আমরা আক্রান্তকে দেখতে পাই। নিহতের দেহে বেশ কিছু ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। তাঁকে পেছন থেকে আঘাত করা হয়েছিল। আমরা সন্দেহ করছি যে জঙ্গিরাই এই অপরাধ সংঘটন করেছে। কারণ এর আগেও ব্লগারদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপককেও হত্যা করা হলো। পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে তিনবার আক্রমণ করা হয় এবং তাঁর ঘাড়ের ৭০-৮০ ভাগই কাটা পড়ে ফাঁক হয়ে যায়। আক্রমণের প্রকৃতি পরীক্ষা করে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে যে কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠীই এই কাজ করেছে।

রবিকিরণ রায়

সাংগঠনিক সম্পাদক দ্যুতি সাংস্কৃতিক সংসদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

—অধ্যাপক আজিজুল রহিম দ্যুতি সাংস্কৃতিক সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, তাই না? ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? তিনি কি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন? কিংবা কারো সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল? মানে, হঠাত্ খুন হলেন কেন? আপনার কী মনে হয়?

—স্যার নির্দিষ্টভাবে কোনো রাজনৈতিক দল করতেন না। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্যানেল রাজনীতিতেও তিনি জড়িত ছিলেন না। তবে সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির প্রতিই অনুগত ছিলেন। ভিসি-প্রক্টর হওয়ার জন্য কোনো দৌড় তাঁর ছিল না। তবে রাবি শিক্ষক সমিতি নির্বাচনে ভোটটি তাঁর দিনের শেষে ওই নিশ্চিত রবীন্দ্র প্যানেলের বাক্সেই পড়ত।

—তবে হঠাত্ এত বড় বিপদ কেন হলো বলে মনে হয়?

—আসলে স্যার সেতার বাজাতেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এই দ্যুতি সাংস্কৃতিক সংসদও তাঁর হাতে গড়া। তবে তাঁর গ্রাম দরগামারিয়া, কিন্তু বাগমারা উপজেলায়—কোন বাগমারা, বলেন তো? জেএমবির ঘাঁটি যে বাগমারা, সেই বাগমারা। ওই গ্রামে ইমন-ভূপালি নামে তিনি একটি গানের স্কুল খুলেছিলেন বছর তিনেক আগে। তখন থেকেই জেএমবি এর বিরোধিতা করছিল। তাঁকে বেশ কয়েকবার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। স্কুল বন্ধ করতে তাঁকে ওরা অনেক দিনই চাপ দিচ্ছিল। তা স্যার সে কথা শোনেননি। উল্টো নিজের আয় থেকে নিয়মিত স্কুলটায় টাকা দিতেন। আমাদের মনে হচ্ছে, জেএমবিই এ কাজ করে থাকবে।

জাহিদুল রহিম

উপজেলা শিক্ষা অফিসার, সিংড়া, নাটোর জেলা।

(নিহত রাবি শিক্ষকের ছোট ভাই)

—বড় ভাইয়ের তো কোনো বাজে নেশা ছিল না। রাজনীতি করেননি—কোনো শত্রুও ছিল না। তাঁকে কে খুন করবে তা বুঝতে পারছি না!

মমতাজ আরা (নিহতের স্ত্রী)

জীবন বলতে তাঁর ছিল এই ঘরভর্তি বই আর ওই সেতার। আর দশটা দিনের মতো গতকালও ক্লাসে যাওয়ার সময় এলেন। ভোরে উঠে রেওয়াজেও বসছিলেন সেতারে। তারপর আমি তাড়া দিলাম, পরে বাথরুমে গেলেন। শাওয়ার নিলেন। ডিম-রুটি-চা খেয়ে ক্লাস নিতে গেলেন। বাসা থেকে হাঁটা দূরত্বে ডিপার্টমেন্ট। এটুকু রাস্তা, রিকশা নিতেন না। মাত্র তিনি বের হওয়ার পর দরজা আটকালাম—কয়েক মিনিট পরেই শুনি কারা যেন বলছে : শতাব্দীর বাবা মারা গেছেন! শতাব্দী আমার বড় মেয়ে!

নিশাত ইমরোজ গৌরব (নিহত শিক্ষকের পুত্র)

—আমার বাবাকে কারা খুন করতে পারে—বাবার মতো মানুষকেও যে কেউ খুন করতে পারে, সেটাই ভাবতে পারছি না। তবে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এরই মধ্যে খুনের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশে যে সত্যি সত্যি আইএস আছে, তা এত দিন আমরা কল্পনাও করিনি। জিহাদি গ্রুপগুলোর সংবাদ সংস্থা আমাক নিউজ এজেন্সি সংবাদ ছেপেছে : ‘নাস্তিকতার ডাক’ দেওয়ার জন্য আইএসের যোদ্ধারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে হত্যা করেছে।

৩. প্রতিবাদ মিছিল ও পুরিয়া ধানেশ্রী

—আজিজুল স্যারের রক্ত বৃথা যেতে দেব না—আজিজুল স্যারের রক্ত বৃথা যেতে পারে না!

—আজিজুল স্যার নিহত কেন? সরকার জবাব চাই—প্রশাসন জবাব চাই!

বেশ কয়েক শ ছাত্র আধঘণ্টা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথে অধ্যাপক আজিজুল রহিমের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিল শেষ করে এগিয়ে গেল ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের দিকে। এখন খোদ হাইওয়েই ব্লক করতে হবে। আর কোনো মাঝামাঝি রাস্তা নেই। তবে বড় দুই দলের ছাত্র সংগঠনের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ছে না। ঘুরে ফিরে ওই ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট বা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ কিছু বাম সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক কিছু প্রতিষ্ঠানের ছেলে-মেয়ে—এই যা। বাম দলগুলোর ছেলে-মেয়েদের হস্তাক্ষর যেমন খানিকটা সুন্দরতর হয়, অন্য দলগুলোর হাতে লেখা পোস্টারগুলোর চেয়ে বা বানান কিছুটা নির্ভুলতর হয়, তেমন সুন্দর হাতের লেখায় কিছু পোস্টার। কী বা লাভ? ক্যাম্পাসে যেকোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে থাকে কিছু বাম সংগঠনই। এদের ছেলেরা চাঁদাবাজি বা টেন্ডারের কমিশন নিতে যায় না। কিন্তু দিনের শেষে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। সুযোগ-সুবিধা বড় দুই দলের ছেলেরাই নেয়। মন্ত্রী-সংসদ সদস্যও তাঁরাই হয়। ‘বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর অর্ক হাতে মাইক তুলে নেয় :

—প্রিয় বন্ধুরা,

আমাদের প্রাণপ্রিয় সবুজ মতিহার ক্যাম্পাসে আবারও একটি নিদারুণ দুঃখজনক হত্যাকাণ্ড ঘটল। আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এই হত্যার প্রতিবাদে রুটিনমাফিক সব ক্লাস আর পরীক্ষা বয়কট ঘোষণা করেছে। নিয়মমাফিক দু-একটি মিছিল বা মানববন্ধন হবে। তারপর? বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ভিসির মাধ্যমে পৃথক পৃথক স্মারকলিপি পাঠানো হবে, কিন্তু স্মারকলিপি দিলেই বা কী আসবে-যাবে?

আপনারা জানেন, বন্ধুরা—যে সদ্য নিহত ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আজিজুল রহিমসহ এই মতিহার ক্যাম্পাসে আমাদের মোট চারজন প্রাণপ্রিয় শিক্ষক খুন হলেন। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে খুন হয়েছেন সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক নূর-উল-ইসলাম। তাঁর দোষ কী ছিল? না, তিনি মাজারে যেতেন। এই ভারত উপমহাদেশে তরবারি নয়, সুফি-সাধকদের প্রেমের মন্ত্রেই কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তবে আজ কেন সুফি মাজারে যাওয়ার অপরাধে কাউকে খুন হতে হবে? এ ছাড়া নূর স্যার বাউলদের আস্তানায়ও যেতেন। কিন্তু সে অপরাধে তাঁকে খুন হতে হবে? তারও আগে ২০০৬ সালে ভূতত্ত্ব ও খনিজ বিজ্ঞান বিভাগের ড. শেখ তাহের আহমেদ স্যার খুন হয়েছিলেন। ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের কাছে শুনেছি যে তাঁর মাথা, পিঠ, হাত আর পায়ে ছুরি মেরে স্যুয়ারেজ ট্যাংকের ভেতর ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ ইউনুসকেও রাজশাহীর বিনোদপুরে তাঁর বাসার পাশে খুন করে দুজন জঙ্গি। আমাদের প্রশ্ন—এ রকম খুন আর কত?

—বিচার চাই—বিচার চাই!

—আমাদের দাবি মানতে হবে!

হাইওয়ে বারবার ধাবমান বাস-ট্রাকের দিকে লাঠিসোঁটা আর হাতে পেট্রলের ক্যান ও দিয়াশলাই নিয়ে ছুটে যায়—ছুটে যেতে থাকে অর্করা। একা পূরবী ছুটতে পারে না। তার কেমন কান্না পেতে থাকে। দ্যুতি সাংস্কৃতিক সংসদে আজিজুল রহিম স্যারের কাছে সে সেতার শিখত। গত ক্লাসে রাগ দপুরিয়া ধানেশ্রীর একটি বন্দিশ তুলতে সে বারবার ভুল করছিল আর স্যারও তাকে বেশ ধমকাচ্ছিলেন। এই গোটা মতিহারে—এই মফস্বলে আর সেতার শেখানোর মানুষ কই? পূরবীর কাজিন নীলারা যেমন ঢাকা থেকে বেড়াতে এলেই অবাক হয়, রাজশাহী শহর দেখলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে রচনার স্থান ও সময় বোঝাতে যেমন শিলাইদহ বা শাজাদপুরের পাশে ১৮৯৮ বা ১৯০৩ সাল লেখা থাকত—তেমন সময়ের একটা শহরে এসে পড়েছি! পূরবীর বাবা স্যারের বন্ধুস্থানীয়। স্যারের রিকমেন্ডেশনেই দুই মাস আগে ঢাকা বেতারে সে প্রথম ১০ মিনিটের একটি খেয়াল বাজিয়ে এসেছে। এখন আজকের যে সেতার ক্লাস হওয়ার কথা ছিল—সেই ক্লাসের জন্য দপুরিয়া ধানেশ্রীর বন্দিশ সে কার কাছে বাজাবে?

পায়েলিয়া ঝঙ্কার মোরি ঝনন ঝনন বাজে ঝঙ্কারি,

পিয়া সমঝাত নাহি সাস ননদ মোরি দেগি গালি।

...রাইকিশোরী তার আরাধ্য শ্যামের কাছে যেতে পারছে না। বাড়ি থেকে বের হতে গেলেই তার পায়ের পায়েলিয়া ঝনঝন করে বাজছে আর ঘুম থেকে জেগে উঠছে শাশুড়ি ও ননদ।


মন্তব্য