kalerkantho


পারিবারিক রাতের খাবার

কাজুও ইশিগুরো, অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



পারিবারিক রাতের খাবার

অঙ্কন : মানব

জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ফুগু নামের এক প্রকার মাছ পাওয়া যায়। আমার জীবনে এই মাছের একটা বিশেষ তাত্পর্য আছে : আমার মা এই ফুগু মাছ খেয়ে মারা যান।

এই মাছের যৌন লালাগ্রন্থির হালকা পর্দার থলেয় বিষ থাকে। মাছ কেটে তৈরি করার সময় সতর্কতার সঙ্গে ওই থলে ফেলে দিতে হয়। নইলে খাবারের সঙ্গে মিশে গেলে বিষক্রিয়া অনিবার্য। আগে থেকে বলাও মুশকিল, ঠিকমতো থলে অপসারিত হলো কি না। খাওয়ার সময় বোঝা যায়।

ফুগু মাছের বিষক্রিয়া ভয়ানক; সব সময়ই বিপজ্জনক। মাছ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষক্রিয়া শুরু হয় না। রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড জ্বালা-যন্ত্রণা। আক্রান্ত ব্যক্তি সারা রাত যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে গড়াগড়ি যায়।

ভোরের দিকে মৃত্যু অবধারিত। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানে এই মাছের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। রান্না করার আগে এত সব ঝামেলা না থাকলে, এত নিয়ম-কানুন মানতে না হলে নিজের রান্নাঘরে বসে মাছের নাড়িভুঁড়ি ফেলে এই মাছ তৈরি করে প্রতিবেশী, বন্ধু-মেহমানদের টেবিলে বসানোর জন্য এই মাছ বেশ ফ্যাশনেবলও হতে পারত।

মা মারা যাওয়ার সময় আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলাম। সে সময় মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল। মা মারা যাওয়ার আগে পরের ঘটনার বিস্তারিত কিছু আমার জানা ছিল না। দুই বছর পর টোকিওতে আসার পর সব বিস্তারিত শুনেছি। মা সব সময় ফুগু মাছ খাওয়া এড়িয়ে চলতেন। সেবার মায়ের স্কুলজীবনের এক বান্ধবী নিমন্ত্রণ করেছিলেন। মা তাঁকে নিরাশ করতে চাননি বলেই ফুগু মাছের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে কামাকুরা ডিস্ট্রিক্টে আমাদের বাড়িতে যাওয়ার পথে বাবার কাছ থেকে এ রকমই শুনলাম। আমরা যখন বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন শরতের রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।

চা খাওয়ার রুমে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, বিমানে কিছু খেয়েছিলে?

হালকা নাশতা দিয়েছিল।

ও, তাহলে তো তুমি ক্ষুধার্ত। ঠিক আছে, কিকুকো এলেই আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে নেব।

বাবার চেহারায় একটা কঠিন ভাব ছিল : শক্ত চোয়াল, ঘন কালো ভ্রু। অনেকটা চৌ এন লাইয়ের মতো। অবশ্য বাবা হয়তো এ রকম সাদৃশ্য কখনোই মনে আনেননি। বাবার পরিবারের পূর্বসূরিদের চেহারায় আসল সামুরাই রক্তের ধারা বহমান। আজকের আলাপের মুহূর্তে যে রকম মনে হলো, বাবার এ রকম নমনীয় চেহারা আগে কখনো দেখিনি। ছোটবেলার কথা মনে আছে। বাবা আমাকে খুব শাসনে রাখতেন। বকবক করার অপরাধে বাবা আমাকে বেশ কয়েকবার মেরেছিলেন। বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে আসা পর্যন্ত আমাদের আলাপ মোটামুটি থেমে থেমেই চলল। দু-চারটি কথা বলার পর আবার একটুখানি নীরবতা—এ রকমই চলল।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর বললাম, তোমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটা বসে যাওয়ার কথা শোনার পর থেকে আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার কথার সঙ্গে বাবা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।

আসলে ঘটনার শেষ এখানেই নয়। এই বিপর্যয় সহ্য করতে না পেরে ওয়াতানাবে আত্মহত্যা করে। এই কলঙ্করেখা মুখে লেপে সে আর বেঁচে থাকতে চায়নি। আমরা সতেরো বছর একসঙ্গে ব্যবসা করেছি। আমি ওর সততাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আবার ব্যবসা শুরু করবে?

আমি তো এখন অবসরেই চলে গেছি। নতুন কোনো ব্যবসার ঝামেলা আর আমার সহ্য হবে না। ব্যবসাপাতির ধরনও আর আগের মতো নেই; অনেক কিছুই বদলে গেছে। বিদেশিদের সঙ্গে ওঠাবসা, তাদের মন-মর্জি মাফিক কাজ করা আমার হয়ে উঠবে না। ওয়াতানাবেরও এসব পছন্দ ছিল না। কড়া নীতিবান লোক...। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

বারান্দার যেখানে আমরা বসেছি, সেখান থেকে বাগান দেখা যায়। বাগানের সেই পুরনো কুয়োটা এখনো আছে। ছোটবেলায় ভাবতাম, ওখানে ভূতের আনাগোনা আছে। সূর্য নেমে আসায় ঘন ছায়ার আড়ালে পড়ে গেছে।

বাবা বললেন, তুমি ফিরে এসেছ ভেবে খুব স্বস্তি লাগছে। আশা করি, এবার খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে না।

পরিকল্পনা এখনো ঠিক করিনি। কী হবে, বুঝতে পারছি না।

অতীতে যা হয়েছে, তা আর মনে রেখে কী হবে। তোমার মা-ও খুব ভেঙে পড়েছিলেন তোমাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে। তুমি আরো আগে এলে আমরা তোমায় সাদরে বুকে টেনে নিতাম।

তোমার সহানুভূতির কথা বুঝতে পারি, বাবা। খুব তাড়াতাড়িই চলে যাব, এমন না-ও হতে পারে। পরিকল্পনা এখনো ঠিক করিনি।

বাবা আবার বললেন, আমরা জানি তোমার মনে কোনো দোষ ছিল না। অন্যদের কথায় হয়তো তোমার মন বদলে গিয়ে থাকবে। এ রকম অনেকের বেলায়ই হয়।

বাবা, তুমিই তো বললে, আমাদের ওসব ভুলে যাওয়া দরকার!

আচ্ছা, ঠিক আছে। ইয়ে, আরেকটু চা খাবে?

ঠিক তখন নারী কণ্ঠের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম।

বাবা উঠে দাঁড়ালেন, এই তো, অবশেষে কিকুকো এলো।

বোন এবং আমার মধ্যে বয়সের তফাত থাকলেও আমাদের মধ্যে অন্তরঙ্গতা ছিল। এত দিন পর আমাকে দেখে কিছুক্ষণ ও কিছুই বলতে পারল না। শুধু ভয় আর উত্তেজনা মেশানো হাসি হাসল। বাবা ওকে ওসাকা সম্পর্কে, ওর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে সামলে নিল। বাবার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে আমাকেও এটা-ওটা জিজ্ঞেস করল। তবে বেশিক্ষণ নয়। হয়তো ওর ভয় ছিল, না জানি কোনো অনাহূত পরিস্থিতি উঠে আসে। কিছুক্ষণ পর এসবও থেমে গেল। কিকুকো যে এসেছে, সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল।

বাবা উঠে পড়লেন, রান্নাবান্নার দিকে নজর দিতে হবে। আমি উঠলাম। কিকুকো তোমাকে সঙ্গ দেবে। দরকার হলে ওকে বোলো।

বাবা রুম ত্যাগ করার পর কিকুকো অনেকটা সহজ হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর বন্ধু-বান্ধব আর বিশ্ববিদ্যালয়ের খবরাখবর নিয়ে আলাপ শুরু করল। হঠাত্ ও বাগানে যাওয়ার কথা বলে বারান্দায় চলে গেল। তারপর আমরা হালকা চটি পরে বারান্দা থেকে বাগানে নেমে গেলাম। দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিকুকো সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, সিগারেটের নেশায় প্রায় আধা ঘণ্টা অস্থির হয়ে আছি।

এত নেশা তো এতক্ষণ স্মোক করিসনি কেন?

বাড়ির ভেতর দিকে অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত করে হেসে উঠল আমার বোন।

আমি বললাম, ও, আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি।

কী বুঝেছ? আরো আছে। আমার বয়ফ্রেন্ডও আছে।

তাই নাকি? তুই তো বেশ পাকা হয়ে গেছিস!

হুমম, এখন একটা সমস্যায়ও পড়ে গেছি, ভাইয়া। কী করব বুঝতে পারছি না। ও আমেরিকা যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। চাইছে, আমার পড়াশোনা শেষ করে আমিও ওর সঙ্গে আমেরিকা যাই।

আচ্ছা। তাহলে তুইও যাবি। এই তো?

হ্যাঁ, গেলে পয়সা বাঁচিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে হবে। লোকে বলে, এতে নাকি ঝুঁকি আছে। অবশ্য ওসাকায় এ রকম ছোটখাটো অভিযান চালিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ইচ্ছা করলে পারব।

বুঝলাম। তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যাটা কোথায় তোর?

পায়ে চলা ছোট পথ ধরে বাগানের ঘাস মাড়িয়ে সামান্য একটু ঘুর পথে পুরনো কুয়োটার কাছে চলে এলাম। কিকুকো মনে হলো, গভীর কোনো ভাবনায় মগ্ন হয়ে সিগারেটে জোরসে টান দিতে লাগল।

সমস্যাটা হলো, ওসাকাতে অনেক বন্ধু-বান্ধব হয়ে গেছে। আবার সুইচিকেও ভালোবাসি। সব সময় ওর সঙ্গেই থাকতে ইচ্ছা করে। ভাইয়া, তোমাকে কি বোঝাতে পেরেছি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। খুব বুঝেছি।

কিকুকো আবার হেসে উঠল। আমার থেকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কুয়োটার সামনে দাঁড়াল। আমি ওর কাছাকাছি পৌঁছলে বলল, তোমার মনে আছে ভাইয়া, ছোটবেলায় তুমি বলতে, এখানে ভূতের আনাগোনা আছে?

হ্যাঁ, মনে আছে। মা আমাকে বোঝানোর জন্য বহুবার বলেছেন, আমি রাতে যা দেখেছি সেটি ভূত ছিল না। সবজির দোকানের মহিলাকে আমি দেখেছি। কিন্তু আমার কিছুতেই ভয় কাটত না। মহিলা নাকি আমাদের বাগানের ভেতর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে যাচ্ছিল সে রাতে। তবে আমার চোখে এ রকম দেখলাম, যেন মহিলা বাগানের দেয়াল বেয়ে পার হচ্ছে।

কিকুকো হাসতে হাসতে বাগানের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

আমি নীরব রইলাম। কিকুকো অন্য রকম গলায় বলল, মা কিন্তু তোমার প্রতি কখনো বিরূপ হননি। বাবাকে তাঁর এবং বাবার দোষের কথাই বলতেন। তোমাকে ঠিকমতো ফেরালে নাকি তুমিও আমার মতোই সুবোধ হয়ে থাকতে। আমার প্রতি তাঁদের যে রকম নজরদারি ছিল, সেটা নাকি তোমার প্রতি ছিল না।

আমার দিকে তাকালে দেখলাম, ওর মুখে আবার সেই হালকা হাসিটা ফিরে এসেছে। তারপর বলল, মা কত সহজ-সরল ছিলেন!

আমিও বললাম, হ্যাঁ, মা আসলেই সহজ-সরল মানুষ ছিলেন।

তুমি কি ক্যালিফোর্নিয়া ফিরে যাবে আবার?

এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। দেখি কী হয়।

বাড়ির ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললাম, আমাদের মনে হয় এখন যাওয়া উচিত। বাবা একা একা খাবার তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

আমার দিকে সোজা হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, বাবা কি ওয়াতানাবের কথা সব তোমাকে বলেছেন?

আমাকে বলেছেন, ওয়াতানাবে আত্মহত্যা করেছেন।

না, এটুকুই সব নয়। তাঁর সঙ্গে তাঁর গোটা পরিবারও শেষ হয়ে গেছে। তাঁর স্ত্রী, ছোট ছোট দুটি মেয়ে—সবাই।

মেয়ে দুটির চেহারা মায়াভরা। ওরা সবাই রাতে ঘুমিয়ে ছিল। সে সময় বাবা গ্যাসের আগুনে ওদের পুড়িয়ে মেরেছেন। চাকু দিয়ে ওয়াতানাবের পাকস্থলী পর্যন্ত কেটে ফেলেছেন।

কিন্তু বাবা তো ওয়াতানাবের সততার কথাই বলেছেন!

অসুস্থ! বলে কিকুকো কুয়োর দিকে ফিরে দাঁড়াল।

বাগানের আলো নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। কয়েক গজ দূরে ফাঁকা জায়গাটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, ওই যে ওখানে দেখেছিলাম।

কিকুকো জিজ্ঞেস করল, ভূতটা দেখতে কিসের মতো ছিল?

আমি স্পষ্ট কিছু দেখিনি। অন্ধকার ছিল তখন। দেখলাম এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে চেয়ে।

কিকুকো কনুই দিয়ে আমাকে গুঁতো দিয়ে বলল—আহা, থামো তো ভাইয়া! আমাকে আবার ভয় দেখানো হচ্ছে!

চলো ভাইয়া, দেখি খাবার কত দূর।

রান্নাঘরে ব্যস্ত বাবা আমাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার কাজে মগ্ন হলেন।

কিকুকো হাসতে হাসতে বলল, একা একা রান্না করে খেতে খেতে বাবা একেবারে পাকা বাবুর্চি হয়ে গেছেন।

বাবা ওর দিকে ফিরে ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, আরে না, রান্নার তেমন কিছুই শিখিনি আমি। কিকুকো, আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাও না!

কিকুকো বেশ সুবোধ মেয়ে। জ্ঞানবুদ্ধি চমত্কার, বাবা ওর প্রশংসা করতে করতে এগিয়ে চললেন। বাবা এরুম থেকে ওরুম যেতে লাগলেন। আমি শুধু বাবার পেছন পেছন দেখতে লাগলাম—এই পুরনো বাড়িটা এখন আমার কাছে প্রায় অপরিচিতই মনে হচ্ছে। বিশাল বিশাল রুমের বেশির ভাগই ভয়ংকর রকমের ফাঁকা।

বাবা বললেন, আমার একার জন্য বাড়িটা বেশি বড় হয়ে গেছে। আর কেউ নেই। একদমই ফাঁকা। এতগুলো রুমও দরকার হয় না।

বাবা শেষে একটা রুম খুললেন। বই-পুস্তক আর কাগজপত্রে ঠাসা। ফুলদানিতে হরেক রকমের ফুল। দেয়ালে নানা রকমের ছবি টানানো। কোনায় ছোট একটা টেবিলে দেখলাম মজার একটা জিনিস। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, ওটা একটা প্লাস্টিকের যুদ্ধজাহাজ। বাচ্চাদের খেলনার মতো। চারপাশে খবরের কাগজের ওপর ছড়ানো আরো সব জিনিসের ছোট ছোট নমুনা। টেবিলের কাছে এসে বাবা নমুনাটা হাতে তুলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন, ব্যবসাটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমার হাতে এখন অঢেল সময়।

আমিও বাবার হাসির সঙ্গে আমার হাসির সায় দিলাম। প্ল্লাস্টিকের খেলনাটার দিকে নিবিষ্ট চিত্তে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, এসব কথা বলতে চাই না। কিন্তু না বলেও পারি না। তোমার মায়ের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়। হতাশা আর দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে।

আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল প্লাস্টিকের যুদ্ধজাহাজটির দিকে।

আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, মা আসলে চাননি, আমি চিরতরে তোমাদের ছেড়ে ওখানে থেকে যাই।

বেশির ভাগ মা-বাবার অবস্থা এ রকমই। সন্তান দূরে থাকুক এটা তো চানই না; আর অচেনা-অজানা জগতে সন্তান থাকলে তাদের চিন্তার অন্ত থাকে না।

যুদ্ধজাহাজটা আঙুল দিয়ে নাড়তে নাড়তে বাবা বললেন, এগুলো এখানে আঠা দিয়ে আটকে দিলে ভালো হয়, তাই না?

হ্যাঁ, ভালোই হয়। দেখতেও ভালো লাগবে।

রান্নাঘরের পাশে একটা আবছা আলোকিত রুমে খাবার প্রস্তুত ছিল। রুমে আলোর উত্স বলতে ছিল একটা লাইট, টেবিলের ওপর ঝুলানো। টেবিল ছাড়া রুমের বাকি অংশে প্রায় অন্ধকার। খাওয়া শুরু করার আগে একে অন্যের দিকে ঝুঁকে বসলাম।

খাওয়ার সময় কথাবার্তা তেমন একটা হলো না। খাবার সম্পর্কে আমি মৃদু বিনয়ী মন্তব্য করলে কিকুকো হাসি দিয়ে প্রত্যুত্তর করল মাত্র। ওর আগের সেই ভয়কাতুরে চেহারাটা আবার ফিরে এসেছে। বাবা সারাক্ষণ চুপ করেই ছিলেন। শেষে বললেন, শেষমেশ তোমার জাপানে ফিরে আসাটা বেশ অদ্ভুত মনে হচ্ছে, তাই না?

হ্যাঁ, কিছুটা অদ্ভুতই মনে হচ্ছে।

আমেরিকা ছেড়ে এসে কিছুটা খারাপ লাগার কথা...।

তা অবশ্য একটু লাগছে। তবে আমি ওখানে তেমন কিছু ফেলে আসিনি। মাত্র কয়েকটা ফাঁকা রুম।

ও, আচ্ছা।

টেবিলের ওপর দিয়ে বাবার দিকে তাকালাম। মুখটা পাথুরে কঠিন। আমরা আরো অনেকক্ষণ নীরবতায় ডুবে রইলাম।

রুমের পেছনে একটা জিনিস দেখে চোখ আটকে গেল। প্রথম কিছুক্ষণ চুপ থেকেই খেতে থাকলাম। তারপর আমার হাত আস্তে আস্তে থেমে গেল। বাবা ও কিকুকোর চোখ এড়ালো না। আমি বাবার কাঁধের ওপর দিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ওখানে ওই ছবিটা কার?

বাবা আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে একটুখানি মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ছবিটা?

সাদা কিমোনো পরা বৃদ্ধার ছবি। নিচের ওইটা।

বাবা ছবির দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে।

এবার কথা বলার সময় বাবার কণ্ঠ একটুখানি কর্কশ শোনাল, তোমার মায়ের ছবি। নিজের মায়ের ছবি চিনতে পারছ না?

মায়ের ছবি! ও, অন্ধকার তো; ভালো করে দেখতে পাইনি।

কিছুক্ষণ আমরা সবাই চুপ। তারপর কিকুকো উঠে গিয়ে ছবিটা নামিয়ে এনে আমায় দিল।

আমি বললাম, মাকে আসলেই অনেক বয়স্ক মনে হচ্ছে।

বাবা বললেন, ছবিটা তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে তোলা।

আমি বললাম, অন্ধকারের জন্য ভালো দেখতে পাইনি।

ছবি থেকে চোখ তুলে দেখলাম, বাবা এক হাত এগিয়ে দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ছবিটা বাবাকে এগিয়ে দিলাম। ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিকুকোর দিকে এগিয়ে দিলেন। কিকুকো বাধ্য মেয়ের মতো উঠে এসে ছবিটা নিয়ে দেয়ালে লাগিয়ে দিল।

তরকারির আরো পুরো এক পাতিল রয়ে গেছে টেবিলের মাঝখানে। কিকুকো ফিরে এসে বসার পর বাবা ঢাকনা খুললেন। একপ্রস্ত বাষ্পের মেঘ ওপরের আলোটার দিকে উঠে গেল। বাবা তরকারির পাতিলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন—নাও, তোমার নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা আছে এখনো। বাবার মুখের একপাশ আলোর বিপরীতে থাকার কারণে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না।

আমি চপস্টিক হাতে পাতিলটা আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে বললাম, ধন্যবাদ, বাবা। কী এটা?

মাছ?

পাতিলের ভেতর মাছের টুকরোগুলো তাপে কুঁকড়ে গেছে। আমি একটা তুলে পাতে নিলাম।

বাবা বললেন, নিয়ে খাও। অনেক আছে।

ধন্যবাদ বলে আমি আরো একটা নিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে দিলাম। বাবাও কয়েক টুকরো নিলেন। তারপর কিকুকো নিল। আমাদের নীরব দৃষ্টি তখন ওর দিকে। বাবা আবার বললেন, তোমার অবশ্যই ক্ষুধা আছে এখনো। নিয়ে খাও। বাবা নিজে আরেক টুকরো মুখে দিলেন। আমিও নিলাম। জিবের তলায় বেশ নরম নরম স্বাদ পেলাম মাছটার। বললাম, খুব সুস্বাদু!

আমরা তিনজন নীরবে খেতে লাগলাম।

খাওয়া শেষে বাবা দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে আয়েশের হাই তুলতে তুলতে ডাকলেন—কিকুকো, এক কেটলি চা বানাও দেখি।

কিকুকো বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। বাবা উঠতে উঠতে বললেন—চলো দেখি, অন্য রুমে যাই। এখানে গরম খুব বেশি।

বাবার পিছে পিছে আমিও উঠে পড়লাম। চা খাওয়ার রুমে গিয়ে বসলাম। বিশাল বিশাল জানালাগুলো খোলা। বাগান থেকে বাইরের ঠাণ্ডা মৃদু হাওয়া আসছে। কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। তারপর আমি বললাম, বাবা।

হ্যাঁ, বলো।

কিকুকো বলল, ওয়াতানাবে নাকি তাঁর গোটা পরিবারসহ আত্মহত্যা করেছেন।

বাবা দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে মাথা ঝাঁকালেন। কয়েক মুহূর্ত বাবা গভীর চিন্তামগ্ন রইলেন। শেষে বললেন, ওয়াতানাবে ব্যবসার প্রতি খুব নিবেদিতপ্রাণ ছিল। এ জন্য বিপর্যয় মেনে নিতে পারেনি। ওর নিজের প্রতি আস্থাও শেষ হয়ে গিয়েছিল।

বাবা, তোমার কী মনে হয়, তার ভুল হয়েছিল?

না না, অবশ্যই না।

আমরা আবার নীরবতায় ডুবে গেলাম। বাগান থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। কুয়োটা আর দেখা যাচ্ছে না। বাবা জিজ্ঞেস করলেন—কী করবে ঠিক করেছ, জাপানে কিছুদিন থাকবে?

আমি আসলে আগে থেকে কিছুই ভেবে রাখিনি।

তুমি এই বাড়িতে যদি থাকতে চাও অবশ্যই ওয়েলকাম। বুড়ো বাপের সঙ্গে থাকতে তোমার আপত্তি যদি না থাকে।

ঠিক আছে, বাবা। এ নিয়ে পরে ভেবে দেখব।

আমি আবার বাগানের অন্ধকারের দিকে তাকালাম।

বাবা বললেন, অবশ্য এই বাড়িটা এখন পোড়ো অবস্থায় আছে, লোকজন নেই। হয়তো তোমার বেশি ভালো লাগবে না। শিগগিরই তুমি আমেরিকায় চলে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠবে।

হতে পারে। আমি এখনো নিশ্চিত নই।

বাবা কিছুক্ষণ হাতের তালুর উল্টো দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নীরবতা ভেঙে বললেন, কিকুকো আগামী বসন্তে পড়াশোনা শেষ করবে। তারপর আশা করি, ও এখানে চলে আসবে। নিজের মেয়ে বলে বলছি না; আসলেই কিকুকো খুব ভালো মেয়ে।

সম্ভবত ও আসবে।

আসলে ভালোই হবে। সব কিছু বদলে যাবে।

হ্যাঁ, আমিও নিশ্চিত। সব কিছু বদলে যাবে। সুন্দর হয়ে যাবে।

আমরা আবার নীরবতায় ডুবে গেলাম। অপেক্ষায় থাকলাম, কিকুকো চা নিয়ে আসবে।


মন্তব্য