kalerkantho


সাক্ষাত্কার

আমার অনেক মহান নায়কের কাতারে এসেছি

৫ অক্টোবর ২০১৭ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর টেলিফোনে সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেন নোবেল মিডিয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথ। শিলালিপির পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন ফাহমিদা দ্যুতি

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



অ্যাডাম স্মিথ : নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
ইশিগুরো :
আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনাকে অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত। এখানে একেবারে গোলমেলে অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। হঠাত্ করে সংবাদপত্রের অনেক লোক এসে জড়ো হয়েছেন। রাস্তায় তাঁরা সারি ধরে দাঁড়িয়ে গেছেন।

স্মিথ : কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি আমিও। তাহলে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিতভাবে আপনার দিনটা নিশ্চয়ই বদলে গেছে। খবরটা পেলেন কিভাবে?
ইশিগুরো :
কিচেনে বসে এক বন্ধুর কাছে একটা ই-মেইল লিখছিলাম। তখনই ফোনটা বেজে উঠল। তখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার এজেন্টদের লোকেরা পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠান সরাসরি দেখছিলেন। আমার মনে হয়, তাঁরাও আশা করেননি, আমিই পুরস্কারটি পেতে পারি। তাঁরা শুধু শুনতে চাচ্ছিলেন, এবারের নোবেল পুরস্কার কে পাচ্ছেন। তারপর একের পর এক ফোন আসতে থাকে। আমরা যাচাই করে দেখার চেষ্টা করি, কেউ চাতুরী করছে কি না, ভুয়া খবর দিচ্ছে কি না কিংবা খবরটা আসলে কী ইত্যাদি। তারপর ধীরে ধীরে নিশ্চিত হতে থাকি। যখন বিবিসি থেকে ফোন আসে, তখন সত্যি বলে মনে করি। তবে আমার এখানকার অবস্থা আগের মতোই চলতে থাকে, কাজ-কর্ম একই রকম চলে। অনেকটা পরিত্যক্ত মেরি সেলেস্তের মতো। সকাল এগারোটার সময় যেমন চলছিল, তেমনই। লোকজনের ভিড় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তেমনই চলছিল। তারপর শুরু হয়ে গেল হৈচৈ-বিশৃঙ্খলা। রাস্তায় লোকজন সারি ধরে ভিড় করে আছে, আমার সাক্ষাত্কার নিতে চাচ্ছে।

স্মিথ : তাহলে এতক্ষণে কিছুটা থেমেছে?
ইশিগুরো :
না, না। আমার মনে হয়, থামতে সময় লাগবে। নোবেল পুরস্কার পাওয়া তো দারুণ একটা মর্যাদার বিষয়; এ পুরস্কার পাওয়ার পর এসব চলেই। আমি মনে করি, নোবেল পুরস্কারের চেয়ে বেশি সম্মানজনক পুরস্কার আর হতে পারে না। এ পুরস্কার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে বলতে হয়, এ পুরস্কারের মর্যাদার পেছনে একটা বড় কারণ হলো, সুইডিশ একাডেমি সফলভাবে সব রকম বিভাজন কিংবা দলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছে। মানুষের কাছে সম্মান পাওয়ার মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এ একাডেমি এখন পর্যন্ত শুদ্ধতা ধরে রাখতে পেরেছে। সারা বিশ্বের মানুষের শ্রদ্ধা পাওয়ার কারণ এটাই। সুতরাং আমি মনে করি, সুইডিশ একাডেমির বাস্তব মান-মর্যাদার কারণেই এ পুরস্কার পাওয়াটা এতটা আনন্দের। আর আমার মনে হয়, সেটি একাডেমির নিজেরই এক বিশাল অর্জন। জীবনের অনেক স্তরে সুইডিশ একাডেমি যোগ্য মানুষদের সম্মান দেখিয়ে আসছে বলে এত বছর ধরে একাডেমি এমন একটা উচ্চ আসন ধরে রাখতে পেরেছে। আরেকটা কারণ হলো, এ পুরস্কার পাওয়া আমার জন্য বিস্ময়কর একটা সম্মান। কারণ যাঁদের আমার মহান নায়ক বলে মানি, তাঁদের কাতারে আমার নাম যুক্ত হলো। নিঃসন্দেহে তাঁরা মহান লেখক। ইতিহাসের মহোত্তম লেখকরা এ পুরস্কার পেয়েছেন। আমাকে বলতেই হবে, বব ডিলানের মতো মহান ব্যক্তির পরের বছর এ পুরস্কার পাওয়া সত্যিই বিরাট ব্যাপার। আমার বয়স তোরো বছর থেকে তাঁকে আমার নায়ক মনে করে আসছি। সম্ভবত তিনি আমার মহোত্তম নায়ক।

স্মিথ : দারুণ সৌভাগ্যময় সঙ্গ।
ইশিগুরো :
অবশ্যই। আমি প্রায়ই বব ডিলান হওয়ার অভিনয় করে থাকি। তবে আপনার জন্য তেমন কিছু এই মুহূর্তে করছি না।

স্মিথ : তাহলে তো করুণার কথাই। কমপক্ষে তেমন কিছু শুনতে পেলে ভালো লাগত। আপনি ডিসেম্বরে স্টকহোমে এলে দেখা যাবে আশা করি।
ইশিগুরো :
চেষ্টা করে দেখা যাবে।

স্মিথ : অবশ্যই করতে হবে। এ মুহূর্তে ব্রিটেনে খুব মজা হচ্ছে। আপনার এ পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের কি বিশেষ কোনো তাত্পর্য আছে?
ইশিগুরো :
আমি মনে করি আছে। বলতে চাচ্ছি, আপনাকে ফোন দিতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি প্রেস রিলিজের জন্য একটা বিবৃতি লিখছিলাম। ভাবছিলাম, তিন লাইনের মধ্যে কী কী লেখা যেতে পারে। আমার মনে হয়, সময়টা আমার জন্য প্রাসঙ্গিক। কারণ বুঝতে পারি, আমার বয়স প্রায় তেষট্টি বছর। আমার তেমন কোনো সময়ের কথা মনে পড়ে না, যখন আমাদের পশ্চিমা জগতে মূল্যবোধ সম্পর্কে আমরা এতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। আমি মনে করি, আমাদের মূল্যবোধ সম্পর্কে, আমাদের নেতৃত্ব সম্পর্কে আমরা একটা কঠিন অনিশ্চয়তার সময় পার করছি। মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে। সুতরাং আমি অবশ্যই আশা করি, নোবেল পুরস্কারের মতো বিষয় পৃথিবীর ইতিবাচক বিষয়ে ও পৃথিবীর শোভন মূল্যবোধে অবদান রাখবে, মানুষের চলমানতার বোধে এবং শিষ্টাচারেও অবদান রাখবে।

স্মিথ : আমার ধারণা, আপনি ইদানীং যেসব লেখা লিখছেন, সেগুলোতে কোনো না কোনোভাবে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক, পৃথিবীর আর সবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কবিষয়ক প্রসঙ্গ এসে থাকবে। আপনি এ রকম বিষয়বস্তুই মনে হয় বেশি পরীক্ষা করে দেখেন, তাই না?
ইশিগুরো :
আমি বলব, সে রকমই। মানে আমি মনে করি, আরো একটু ক্ষুদ্র পরিসরে বললে, যেসব বিষয় আমার মনোযোগ কেড়েছে, সেগুলোর অন্যতম হলো, আমরা কিভাবে একই সময়ে ছোট জগতে আর বড় জগতে বাস করছি সেটি। আরেকটি হলো, আমাদের একটা ব্যক্তিগত কর্মক্ষেত্র আছে; সেখানে আমাদের পূর্ণতা আর ভালোবাসা খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। সে চেষ্টা অন্য জগতের সঙ্গেও জড়িত। সেখানে রাজনীতি কিংবা খারাপ জগতেরও প্রাধান্য থাকতে পারে। সুতরাং আমি মনে করি, আমার আগ্রহ সেটিতেও ছিল এবং আছে। আমরা একই সময়ে বড় জগত্ এবং ছোট জগতে বাস করি এবং কোনোটাকেই ভুলে যেতে পারি না।

স্মিথ : ধন্যবাদ। যা-ই হোক, মনে হয় এসব বিষয় নিয়ে আরেক দিন কথা বলা যেতে পারে।
ইশিগুরো :
হ্যাঁ, বলা যায়।

স্মিথ : এ মুহূর্তে আপনাকে ভাবতে হবে, কিভাবে সংবাদপত্রের মানুষদের সামাল দেবেন। শুধু একটি বিষয় সম্পর্কে বলুন—আপনি যে বিশাল মনোযোগের উচ্ছ্বাস পেতে যাচ্ছেন, তাতে কেমন অনুভব করছেন?
ইশিগুরো :
অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কিছুটা অস্থির লাগার মতোও বটে। কারণ আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় ভাবিইনি, আজকের দিনটা সাধারণ একটা দিন নয়; অন্য রকম একটা দিন হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি, সংবাদপত্র, মিডিয়া—এরা সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারটাকে যে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, এটা তো একটা দারুণ ব্যাপার। যদি এ রকম কখনো দেখতে হয় যে কেউ সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার পেলেন, অথচ কেউ আগ্রহই দেখাচ্ছে না, এমনটা আমার জন্য এক ভয়ানক আতঙ্কের হবে। সে রকম হয়ে থাকলে বুঝতে হবে, পৃথিবীতে কিছু জঘন্য ঘটনা ঘটেছে।

স্মিথ : সাহিত্যের জন্য উদ্যাপন করার মতো একটা দিন নিশ্চয়ই খুশির দিন।
ইশিগুরো :
ঠিকই। আমি মনে করি, সাহিত্য দারুণ সুন্দর হতে পারে, কখনো কখনো খারাপ কিছুর শক্তিও থাকতে পারে সাহিত্যের মধ্যে। আমার মতে, সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের মতো বিষয়ের অস্তিত্বই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে, সাহিত্য এক মাঙ্গলিক শক্তি।

স্মিথ : দারুণ! ঠিক আছে, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনাকে ডিসেম্বরে স্টকহোমে দেখার জন্য অপেক্ষায় রইলাম।
ইশিগুরো :
অবশ্যই আসব। ঠিক আছে। মিস্টার স্মিথ, আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।

স্মিথ : আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
ইশিগুরো :
ভালো থাকবেন।


মন্তব্য