kalerkantho


কাজুও ইশিগুরোর প্রবন্ধ

স্মৃতিময় মানবিক আখ্যানের রূপকার ইশিগুরো

ইশিগুরো আসলে একজন সিরিয়াস ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে নতুন নতুন এমন কিছু বিষয়ের উপস্থাপনা ঘটিয়েছেন, যা পাঠক ও সমালোচকদের কাছে সত্যিকার অর্থেই আকর্ষক মনে হয়েছে। উপন্যাসের থিম নিয়ে তাঁর এক ধরনের আচ্ছন্নতা আছে। ইতিহাসের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তিক পরিচয়ের সম্পর্ক, আর আবেগের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ককে তিনি পরম্পরিত করে ব্যক্তিমানুষের অবস্থানকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন

মাসুদুজ্জামান   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতিময় মানবিক আখ্যানের রূপকার ইশিগুরো

একটা অপ্রিয় প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করি। আমাদের দেশে নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে কেউ কেউ মন্তব্য করে থাকেন যে এই পুরস্কারটি নাকি রাজনৈতিক হয়ে পড়েছে।

তখনই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক কারণে পুরস্কার পেয়েছিলেন? এরও অনেক পরে জাঁ পল সার্ত্র যখন নোবেল পুরস্কার পান, সেটা কী ছিল? হ্যাঁ, স্নায়ুযুদ্ধের কালে বা কখনো কখনো এমন দু-একজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যখন সেই লেখক নিজের দেশের অনাচার-অবিচার ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন আর পশ্চিমা ধাঁচের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক মতাদর্শ সম্পর্কে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। সোলঝিনিিসনকে যখন পুরস্কার দেওয়া হয় তখন এ রকমই একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু এর পরও এ রকম যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁরা লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। খ্যাতিও অর্জন করেছিলেন। একেবারে অখ্যাত ও অজ্ঞাত লেখকদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ফলে নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে এই যে তর্কটা তোলা হয়, সেটি অজ্ঞতাপ্রসূত। আমাদের দেশেই শুধু যাঁরা তাঁদের লেখা পড়েননি, তাঁরাই এ রকম প্রশ্ন তোলেন। না পড়েই ‘নাম শুনিনি’ বা ‘অখ্যাত লেখক’—এ রকম তকমা দিয়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেন। কিন্তু আমি পড়িনি বলে তিনি আমার কাছে অখ্যাত হতে পারেন। কিন্তু অন্যদের কাছে, যাঁরা তাঁর লেখা পড়েছেন, তাঁদের কাছে তো তিনি অপরিচিত নন। এবারও ঠিক এমনটাই ঘটেছে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরোকে কেন্দ্র করে।

ইশিগুরো জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক। চারবার বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে ছিলেন, আর ১৯৯৩ সালে ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ বুকার পুরস্কার জিতে নেয়। ইশিগুরো লিখছেনও সেই ১৯৮২ সাল থেকে। ওই বছরই তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আ পেল ভিউ অব হিল্স্’ প্রকাশিত হয়। তখন ইশিগুরোর বয়স আটাশ বছর। প্রথম উপন্যাসই অর্জন করেছিল উইনিফ্রেড হল্টবাই পুরস্কার। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ (১৯৮৬) বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল আর অর্জন করে ‘হোয়াইটব্রেড বুক অব দ্য ইয়ার’-এর সম্মাননা। ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ (১৯৮৯) হচ্ছে তাঁর তৃতীয় উপন্যাস। এটিই পেয়ে যায় বুকার পুরস্কার। চতুর্থ উপন্যাস ‘দি আনকনসোল্ড’ (১৯৯৫) নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল সমালোচক আর পাঠকদের মধ্যে। কেউ কেউ সফল নিরীক্ষার জন্য উপন্যাসটির প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকেই সেই নিরীক্ষাটা ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেছেন।

ইশিগুরো আসলে একজন সিরিয়াস  ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে নতুন নতুন এমন কিছু বিষয়ের উপস্থাপনা ঘটিয়েছেন, যা পাঠক ও সমালোচকদের কাছে সত্যিকার অর্থেই আকর্ষক মনে হয়েছে। উপন্যাসের থিম নিয়ে তাঁর এক ধরনের আচ্ছন্নতা আছে। ইতিহাসের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তিক পরিচয়ের সম্পর্ক, আর আবেগের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ককে তিনি পরম্পরিত করে ব্যক্তিমানুষের অবস্থানকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। প্রতিটি উপন্যাসে তিনি এই সব বিষয়-আশয়েরই পুনঃপুনঃ উপস্থাপনা ঘটিয়েছেন। কিন্তু এসব করেছেন তিনি নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-পরিমণ্ডলে। এভাবেই তিনি সাহিত্যিক অনুসন্ধিত্সার সীমাকে ক্রমশ বিস্তার দিয়ে চলেছেন।

তাঁর প্রথম তিনটি উপন্যাসের অন্তর্লীন মিলটা বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। প্রতিটি গল্প একজন বর্ণনাকারীর জবানিতে বলা হয়েছে, বর্ণনাকারী নিজের মানসিক আবেগিক অবস্থা অনুধাবন করতে চায়নি, স্বপ্ন-ঘোরের মধ্যে থেকেছে, যা অনিবার্যভাবেই তার নিজের পতন ডেকে এনেছে। গল্প থেকে গল্পে সরে আসার মধ্যেও এক ধরনের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। অতীত কিংবা বর্তমানের নানা স্মৃতির টানে একটা গল্প থেকে আরেকটি গল্পে সরে এসেছে উপন্যাসের কাহিনি। যে দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে একেকটি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিচরণ করে বা যা সে হারায়, যে মারাত্মক ভুলটি সে করে, সেসবের মুখোমুখি হয়। কিন্তু এর সবই ঘটে বৃহত্তর কোনো রাজনীতির প্রভাবে। তার সংগ্রাম ও জীবন যুক্ত থাকে ওই রাজনীতির সঙ্গে। প্রথম তিনটি উপন্যাসের সেই রাজনৈতিক পটভূমি হচ্ছে আতঙ্কগ্রস্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর উপন্যাসের বর্ণনাকারীরা এক ধরনের বিভ্রমের মধ্য দিয়ে পেছনের দিকে ফিরে দেখার চেষ্টা করে। ভাবার চেষ্টা করে। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের বুঝতে পারে না। উপন্যাস যত এগোয়, ততই তারা তাদের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয় আর তাদের জীবনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া অতীত, টুকরো টুকরো আবছায়া ধরনের স্মৃতি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আত্মযন্ত্রণাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু একসময় সেই অনিবার্য দুঃসহ আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি তাদের হতেই হয়, আর তখনই নিষ্ফল জীবনের কথা ভেবে তারা অতলস্পর্শী দুঃখময়তার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

‘আ পেল ভিউ অব হিল্স’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এতসুকো। তিনি ইংল্যান্ডে বসবাসরত একজন জাপানি নারী।

উপন্যাসটি শুরু হয় তার বড় মেয়ে আত্মহত্যা করার পর থেকে। ব্যক্তিক এই ট্র্যাজেডির কথা ভাবতে না পেরে স্মৃতির ওপর ভর করে সে চলে যায় নাগাসাকিতে বোমা ফেলার পরের দিনগুলোতে। বোমা কিভাবে পড়েছিল কিংবা মেয়ের আত্মহত্যার কথা কখনো উল্লেখ না করে সে তার জীবনের দুর্ভাগ্যের বিষয়টি উন্মোচন করেছে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, কন্যার আত্মহত্যার জন্য সে নিজেকেই দায়ী করছে।

‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’-এর কাহিনির পটভূমি যুদ্ধোত্তরকালের জাপান। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র মাসুজি ওনো, সে-ই গল্পের ন্যারেটর। ওনোর কন্যার বিয়ের আয়োজনের ঘটনা দিয়ে উপন্যাসটির শুরু। এই বিয়ের আয়োজনের সময়ই ওনো তার অতিবাহিত জীবনের কথা স্মরণ করতে থাকে আর উপলব্ধি করতে শুরু করে, কেমন ছিল সেই জীবন। কেমন আছে সে বর্তমানে আর কেমন কাটবে ভবিষ্যত্। যুদ্ধের কারণেই সে তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে হারিয়েছে। হারিয়েছে জীবনীশক্তি আর সম্মান, যা সে অর্জন করেছিল। সম্ভাব্য পাত্রপক্ষ, দেখা যাবে, তার মেয়েকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। আগে যেসব মানুষ তাকে গুরুত্ব দিত, তারা তাকে এড়িয়ে চলছে। ওনো এর সব কিছুই নিজের জন্য লজ্জাকর ব্যাপার বলে মনে করে আর আবিষ্কার করে যে যুদ্ধোত্তর জাপানে তার সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে গেছে সে।

পরের উপন্যাস ‘দ্য রিমেইন্স্ অব দ্য ডে’তে ইশিগুরো তাঁর দৃষ্টি জাপান থেকে সরিয়ে আনলেন। এই উপন্যাসের বর্ণনাকারী একজন খানসামা, নাম স্টিভেন্স। সে তার সম্পূর্ণ জীবনটাই নিজের কাজ আর পূর্বতন চাকরিদাতা লর্ড ডার্লিংটনের জন্য উত্সর্গ করেছে। উপন্যাসটি শুরু হয় ডার্লিংটনের মৃত্যুর পর। ডার্লিংটন একজন ধনী আমেরিকান। উপন্যাসের শুরুতে স্টিভেন্স প্রত্নযুগের একটা গাড়ি নিয়ে গ্রামের দিকে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। এই গাড়ি চালাতে চালাতেই ভাবছে নিজের জীবনের কথা। কিভাবে সে অনেক বড় একজন নাপিত আর প্রভুর জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হয়ে উঠেছিল, কিভাবে এক নারীর সংস্পর্শে এসেছিল—যে তাকে যথার্থই ভালোবাসতে পারত। পিতার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু এসবের বদলে সে নিবেদিত থেকেছে ডার্লিংটনের প্রতি, যে আসলে জার্মানির নািসদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই লোকটি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর আমেরিকা যাতে জার্মানির সঙ্গে মিলে জোট গড়ে তোলে, সেই লক্ষ্যে একটা ব্যর্থ সম্মেলনের আয়োজন করে। এসবের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে স্টিভেন্স বুঝতে পারে, জীবনে যা কিছু সে করেছে, সবই ব্যর্থ হয়ে গেছে।

এই প্রথম তিনটি উপন্যাসের ন্যারেটর বা বর্ণনাকারীরা এক ধরনের টানাপড়েন বা আকর্ষণ-বিকর্ষণের মধ্য দিয়ে গেছে : চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে আর সেই দুঃসহ আতঙ্কজনক বিপর্যয় এড়াতে চেয়েছে। কিন্তু পরিণামে সবাই নিজেদের সীমাবদ্ধতা কোথায়, সেটিও অনুধাবন করতে পেরেছে। ‘আনকনসোল্ড’ উপন্যাসে ইশিগুরো প্রথম তিনটি উপন্যাস যেভাবে রচনা করেছিলেন, তা থেকে সরে আসেন। উত্তম পুরুষের জবানিতে আবারও লিখলেন এই উপন্যাস। এর প্রধান চরিত্রটিও মরিয়া হয়ে নিজের জীবনের সমস্যাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে এখন আর আগের উপন্যাসগুলোর ন্যারেটরের মতো স্মৃতিকাতর নয়, বরং স্মৃতিই হারিয়েছে। রাইডার, কনসার্টে বেহালা বাজায়, একটা অচেনা-অজানা শহরে এসে পড়ে। এই শহরের স্থাপত্যই যেন তার অতীতকে ধরে রেখেছে। সে বেহালা বাজাবে—এ রকম একটা অনুষ্ঠানসূচি মনে রাখার চেষ্টা করে, আদতে যে অনুষ্ঠানের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। সে এমন সব সমস্যার সমাধান করার কথা ভাবে, যে সমস্যাও বাস্তবে নেই। সবই কাল্পনিক, কিন্তু সে মনে করে বাস্তব। এই উপন্যাস স্মৃতির লজিক নয়, বরং স্বপ্নের লজিক ধরে এগোয়। এর কাহিনি যখন অন্তিমে পৌঁছে, তখন দেখা যায়, নায়ক তার পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের ছেঁড়াখোঁড়া স্মৃতিভ্রমের কারণে শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক গোলকধাঁধার চক্করে পড়েছে। শহরের ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সঙ্গে নতুন ঘরানার সংগীতের দ্বন্দ্ব বেধে যায়। নগরপিতারা দেখলেন, এই সংকট থেকে রাইডারই তাদের উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু রাইডার এতে সাফল্য পায় না। সে তখন ধীরে ধীরে অবাস্তব অসম্ভবের দুর্বোধ্য একটা জগতে তলিয়ে যেতে থাকে।

ইশিগুরোর কাজগুলোতে এভাবেই দেখা যাবে, গভীর ভাবনার তীব্র সংবেদনশীল উপস্থাপন। কী পরিবেশে, কী ধরনের চরিত্র, কী রকম ভাষায়, কী ধরনের আচরণ করতে পারে, তা বেশ ভালোই জানেন তিনি। তাঁর উপন্যাসের কাহিনি আর বহুমুখী চরিত্রগুলোর নমনীয়তা বিস্ময়কর। নানা ধরনের চরিত্র নির্মাণ আর ঘটনার শৈল্পিক উপস্থাপনার কৌশলটা ভালোই আয়ত্তে আছে তাঁর। কমিকধর্মী ইংরেজি থেকে শুরু করে, যে চরিত্র ইংরেজিভাষী নয়, ইংরেজিতে কথা বলতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এ রকম সবার মুখেই তিনি যথাযথ ভাষা দিতে পেরেছেন। অভিজাত ও পরিশীলিত ইংরেজি, ব্রাত্যজনের ঘরোয়া ইংরেজি কিংবা ডায়াসপোরার ভুলভাল ইংরেজি—যে চরিত্রের ভাষা যেমন হওয়া দরকার, দক্ষতার সঙ্গে তিনি তা ব্যবহার করেছেন। খানসামা থেকে অভিবাসী জাপানি নারীর ভাষা ব্যবহার লক্ষ করলে ইশিগুরোর কৃতিত্বটা সহজেই চোখে পড়বে। চরিত্রচিত্রণে তিনি যে কর্তৃত্ব দেখান, তাতেও বোঝা যায়, উপন্যাস রচনায় তিনি কতটা সিদ্ধহস্ত। বাস্তবের ইংল্যান্ড ও জাপান আর স্বপ্নলোকের স্বনির্মিত জগত্—সব কিছুই তিনি দারুণ দক্ষতার সঙ্গে নির্মাণ করেছেন।

অনেকেই ইশিগুরোকে একজন জাপানি ঔপন্যাসিক হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা মনে করেন, তাঁর উপন্যাস বিষয়-আশয় আর সাহিত্যরীতির দিক থেকে প্রাচ্য-প্রভাবিত। ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায় গ্যাব্রিয়েল আনান যেমন বলেছেন, ইশিগুরোর উপন্যাস জাপানি ভাবাদর্শে রচিত। তাঁর উপজীব্য হচ্ছে ‘দায়িত্বশীলতা, আনুগত্য আর ঐতিহ্য। ’ চরিত্রগুলোও তিনি নির্মাণ করেছেন অনেক উঁচু ভাবাদর্শে, স্খলন ঘটলেই তারা শাস্তি ভোগ করে। ‘দ্য স্পেকটেটর’ পত্রিকায় সমালোচক ফ্রান্সিস কিং ‘আ পেল ভিউ অব হিল্স্’ উপন্যাসটিকে টিপিক্যাল জাপানি উপন্যাস বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, উপন্যাসটিকে তিনি কাওয়াবাতার ছায়া বলে মনে করেন। কিন্তু ইশিগুরো নিজে বলেছেন, ‘জাপান সম্পর্কে আমি সামান্যই জানি, বিশেষ করে আধুনিক এই সময়ের জাপানকে। ’ জাপানি ঔপন্যাসিক—এই চিহ্নায়ন তাই তাঁকে অস্বস্তি দেয়। ‘কনটেম্পরারি লিটারেচার’ পত্রিকায় গ্রেগরি ম্যাসনের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘আমি অনুভব করি যে আমার মধ্যে পশ্চিমা ঐতিহ্য পুরোপুরি বিরাজমান। আমি বেশ কৌতুক অনুভব করি, যখন দেখি আমার বইয়ের সমালোচকরা আমাকে জাপানি বলে উল্লেখ করছেন। তাঁরা না বুঝে ও না জেনেই আমার প্রসঙ্গে কয়েকজন জাপানি লেখকের কথা বলেন, হয়তো মিশিমা অথবা অন্য কারোর সঙ্গে তুলনা করেন। এ রকম ভাবাটা সম্পূর্ণ অবান্তর। ’

ইশিগুরো তাই বলা যায়, তিনি নিজে এবং বেশির ভাগ সমালোচক যেমনটা মনে করেন, একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক। ফলে ইয়োকি মিশিমা, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, শুসাকো এনদোর সঙ্গে তাঁর তুলনা করাটা অযৌক্তিক। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের বাইরে বা ক্ষয়িষ্ণু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে যেসব ব্রিটিশ লেখকের জন্ম, যেমন সালমান রুশদি অথবা ভি এস নাইপলের সঙ্গে সমপঙিক্ততে রেখে তাঁর লেখালেখিকে বিবেচনা করা যাবে না। তিনি আবার জোসেফ কনরাড অথবা ভ্লাদিমির নভোকভও নন, যাঁরা তাঁদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে ইংরেজিতে উপন্যাস লিখেছেন। তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে আসেন। ১৯৮৯ সালের আগে জাপানে আর পা রাখেননি। একজন ইমিগ্র্যান্টের সন্তানের বাড়িতে জাপানি ঐতিহ্যের বিলীয়মান চর্চা থাকলেও জাপানি ঐতিহ্য তাঁর মধ্যে গভীরভাবে শিকড়িত হয়নি, আবছা প্রভাব হিসেবে থেকে গেছে মাত্র। কয়েকটি উপন্যাসে এর প্রতিফলন দেখা যায়। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে তাঁকে ডায়াসপোরা লেখক বলা যায়। তবে তিনি জন্মভূমির স্মৃতি আর আচ্ছন্নতা কাটিয়ে ক্রমশ হয়ে উঠেছেন একজন ব্রিটিশ লেখক। তাঁর উপন্যাস তীব্রভাবে মানবিক ভাবনায় আর মানুষী সংগ্রামে। তবে শেষাবধি পরাভবই যেন মানুষের নিয়তি।

নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় তাঁকে অভিনন্দিত করি।


মন্তব্য