kalerkantho

কালু

সুজন শান্তনু

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কালু

ধপাস করে মাটিতে পড়ল কালু। মাটি কই—কাদামাটি। এক আছাড়েই কোমর বাঁকা। আর ওমনি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে সে।

—মা গো, বাবা গো, গেছি গো। মইরা গেছি গো।

এদিক-ওদিক তাকায় সে। না, কেউ নেই। আয়েশ করে আরো কিছুক্ষণ কোঁকায়, যাতে ব্যথাটা চলে যায়। মানুষজন থাকলে অবশ্য সে কোকানো দূরে থাক, যতই ব্যথা পাক না কেন, এমন একটা ভাব দেখাত যে এটা এমন কী! সে মোটেই ব্যথা পায়নি। আছাড় খাওয়ার পর এটাও একটা ইজ্জতের ব্যাপার।

আর মানুষজনের খাসলত এমন যে কাউকে আছাড় খেতে দেখলেই হো হো হো করে হেসে উঠবে। কালুর আশপাশে হাসার তো লোক নেই। মনে মনে সে খুশি হয়। কোনো রকমে কোমর বাঁকা করে সে উঠে দাঁড়ায়। ব্যথা কমানোর আরেকটা কৌশল তার জানা আছে। যদিও ছেলেমানুষি, তবু সে তা-ই করে। যেখানে আছাড় খেয়ে পড়েছে, সেখানে মাটিতে গুনে গুনে দশটা লাথি মারে। আশ্চর্য ব্যাপার! ছেলেমানুষি তো নয়—ভাবে সে, সত্যি সত্যিই তো ব্যথা কমে গেছে। ময়মুরব্বির পথ্য বলে কথা। মৃত ময়মুরব্বির জন্য তার হৃদয়টা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। সদাইসুদ্ধ পলিব্যাগটা নরম কাদায় পড়ে গেছে। কালু  তাড়াতাড়ি সেটি হাতে তুলে নিল। না, ফাটে-ছিঁড়েনি। ভাগ্য ভালো। এই সদাই আনতে গিয়ে তাকে এক রকম দোকানি কুদ্দুসের পায়ে পড়তে হয়েছে।

—কুদ্দুস মামু, তিন সের চাউল দেও। ডাল; না, ডাউল আইজ লাগবি না। তয় কেজিখানেক আলু দিলে চলব।

—ওরে হারামিজ্জাত! নবাবজাদা অইছিস্? অর্ডার দেওন চো...। গত এক মাসের বাকি, টাকা দেওনের  কোনো নাম নেই। নগদা ছাড়া সদাই দিবার পারুম না। যা, ভাগ হারামি...

মুখ খারাপ হলেও দোকানি কুদ্দুসের মন ভালো। কালু তা জানে। এসব মানুষ মনে যা আছে সব মুখে ঝেড়ে ফেলে। তাই এদের মন বরফের মতো সাদা। আর ওই যে বেশভূষায় পরিপাটি আর কথাবার্তায় খুব মোলায়েম—কালুর বিশ্বাস, সেই ভদ্রলোকগুলোর মন কুচ্ছার মতো কালো।  

কালু কাকুতি-মিনতি করে। কিছুতেই কুদ্দুসের মন টলে না। এবার কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে সে বলে,

তোমাগো মাইয়া সাত মাইস্যা। দিনকাল এমুন অবস্থা—কোথায় তারে ভালাবুরা খাওয়ামু, অহন দেখতাছি তারেও উপোস থাকতি অইব।

কালু গুঁটি ঠিক জায়গায়ই চালল। কালুর বউ মরিয়মের দূর-সম্পর্কের মামা হয় দোকানি কুদ্দুস। তাই তার কথা শুনেই কুদ্দুসের মন গলে গেল।

—দে দে, পলিব্যাগটা দে। এবারই কিন্তু শ্যাষবার, কইয়া দিলাম।  

কালু মনে মনে তার উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার জন্য খুব খুশি হয়। বাইরে মুখে বলে, নাহ্, থাউক—দেওনের দরকার নাই। আমি তো তোমার কাছে আর মাগনা নিবার আহি নাই। বর্ষার সিজন। দেশেরও অবস্থা খারাপ। কাজকাম নাই, তাই বাকি নিবার আহি। তুমি না দিলে এই সুজাপুরের বেবাক দোকানি আছে, আমারে বাকি দিবার চায়। তুমি খালি মরিয়মের আত্মীয় বলেই...

কুদ্দুস কালুর মুখের কথা কেড়ে নেয়। ধমকের স্বরে বলে, অত কথা কছ ক্যান? এই নে চাউল, আলু। সঙ্গে ডাউলও দিছি। যা অহন, ভাগ।

আজানের ধ্বনিতে কালু সংবিৎ ফিরে পায়।

এই রে জোহরের আজান দিয়া দিছে। বউ রানবে কহন আর খামু কহন?  

সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। কালু তাই দেরি করে বাজারে যায়। এখন অবশ্য বৃষ্টি নেই। আকাশে কালো মেঘ জমে আছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি আসবে। কালু ছোট রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় ওঠে। এই রাস্তায় তুলনামূলক কাদা কম। তবে একটা ভয়, এই রাস্তা দিয়ে যেকোনো সময় মিলিটারির জলপাই রঙের জিপ যেতে পারে। যুদ্ধের পাঁচ মাসে পাকিস্তানিরা হাজার হাজার বাঙালি নিরীহ মানুষ নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে শহীদ করেছে। আল্লাহও মজলুমের কান্না শোনে। এবার এমন বর্ষা দিল, সেই যে শুরু হয়েছে আর শেষ হওয়ার নাম নেই। পাকিস্তানি আর্মিরাও পড়ে গেল মহাবিপাকে। বিপাক কী, রীতিমতো কোণঠাসা। বাঙালি গেরিলা যোদ্ধারা পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। জায়গায় জায়গায় সেতু-কালভার্ট ভেঙে তাদের পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাদের অস্ত্র দিয়ে তাদেরই শিয়াল-কুকুরের মতো মারছে। রেডিওতে এসব খবর শুনলে কালুর মুখ দিয়ে এমনিতেই বেরিয়ে যায়—আলহামদুলিল্লাহ। কাজকাম নেই। তবু ঝম্পেশ বৃষ্টি দেখলেই সে বলে—আলহামদুলিল্লাহ্। সে অত কিছু বোঝে না। শুধু জানে, বৃষ্টি বেশি হওয়া মানে পাকিদের মরণ। এ দেশের মাটি থেকে তাদের লেজ গুঁটিয়ে পলায়ন। সে আরো জোর কদমে বাড়ির দিকে ছোটে। মনে মনে সেও অলির মতো স্লোগান দিয়ে ওঠে—‘জয় বাংলা। ’

আহা! অলির কথা মনে পড়লেই কালুর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কী সুখের সংসারই না ছিল পোলাডার। নিকা করছে সবে ছয় মাস হয়নি। অমনি দ্যাশে যুদ্ধ শুরু অইল। বাপের বেটা সাহসী ছেলের মতো যুদ্ধে চলে গেল। ঘরে একলা বউ  শেফালি। অলির যুদ্ধে যাওনের খবর রাজাকাররা পাকিস্তানি আর্মিদের কানে তোলে।

অলিকে তো কোথাও পাওয়া গেল না। পাকিস্তানি আর্মিরা রাজাকারদের সাহায্যে অলির বাড়িতে হামলা চালায়। উদ্দেশ্য গনিমতের মাল। গনিমতের মালের চেয়ে তাদের চোখ শেফালির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হলো। সেদিন যখন শেফালির বস্ত্রহরণ করে পাকিস্তানি আর্মিরা; অনেক কেঁদেছিল মেয়েটি, কেউ এগিয়ে আসেনি। আকাশের  দেবতারা তো নয়ই, জমিনের কোনো মানবও নয়। সম্পূর্ণ উলঙ্গ শেফালির দিকে এগিয়ে এলো পাকিস্তানি আর্মির হেড। বীরাঙ্গনা মেয়ে শেফালি! জীবনের চেয়ে সে ইজ্জতের দাম বেশ দিল। প্রচণ্ড ঘৃণায় সে মুখ বিকৃত করে থু করে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিল গোঁফওয়ালা আর্মির মুখে। প্রচণ্ড রাগে মুহূর্তেই ব্রাশফায়ার করে সে শেফালির নিষ্পাপ বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। এই ঘটনা মনে পড়লে এখনো কালুর গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। এরই মধ্যে সে তার বাড়ি এসে পৌঁছে।

—কই রে মা পুলি! 

—আইতাছি বাজান।

—সদাইগুলো নিয়া তাড়াতাড়ি রান্না কর, মা।

পুলি কালুর একমাত্র মেয়ে। বয়স কতই বা হবে। এই তেরো কি চৌদ্দো বছর। স্ত্রী মরিয়মের পেটে অবশ্য আরেকজন পয়দা হওয়ার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। কালুর আশা, এবার তার ছেলেসন্তান হবে। মেয়ে সন্তান সে আর চায় না। মাইয়া অইল কাঁধের বোঝা, হাতের ময়লা। খাওয়াইয়া-দাওয়াইয়া বড় করো আর ডাঙর অইলে নিকা দেও। তাও কি এমনি এমনি? যৌতুক তো কম না। ভিটেমাটি ব্যাচার জো অয়। না বাবা, এবার একটা ছেলেসন্তান চাই। মনে মনে এসব ভাবলেও বাইরে কালু তার মেয়ে পুলিকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। বউয়ের শরীর খারাপ, তাই তার মেয়েটাকে   সংসারের কাজকর্ম করতে হয়—এটা দেখেও তার মন ব্যথিত হয়।  

কালু গামছা নিয়ে পুকুরে গোসল করতে যায়। পুকুরের ভরাজলে একরাশ ফুটন্ত শাপলা ফুল। সে ঝাঁপ দিয়ে পুকুরের জলে নামে। জলতরঙ্গ পুকুরের জলে ছড়িয়ে পড়ে, তাতে শাপলা ফুলগুলো দোল খাচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখতে তার বড্ড ভালো লাগে। সে সাঁতরে গিয়ে কিছু শাপলা তুলে নেয়। রাত্রিভোজের জন্য সেগুলো সালন হিসেবে মন্দ না। গুনে গুনে তিন ডুব দিয়ে সে শাপলার আঁটি নিয়ে ঘরে ফেরে। উঠোনে মাচার ওপর আঁটিটা রেখে লুঙ্গি পাল্টায় সে। রসুইঘরে গিয়ে দেখে—আশ্চর্য! এরই মধ্যে পুলি রান্না শেষ করে ফেলেছে। কালু আদুরে গলায় তার মেয়েকে জিগায়, এত ত্বরা কইরা ক্যামনে রান্ধন হিকলি, মা? পুলি হাসে।

—তুমি আওনের আগে থেইক্কা আমি চুলায় গরম পানি বহাই রাখছি।

মেয়ের বুদ্ধিমত্তায় কালু বেজায় খুশি। কাজকর্মে এই মেয়ে যে তার মায়ের চেয়েও পটু।

—ত অহন ভাত-সালন নিয়া দাওয়ায় চইলা আয়, মা। অনেক বেলা অইছে। খিদাও লাগছে জব্বর। তোর মায়েরেও আইতে ক। হগ্গলে একলগে খাই।

কালু গিয়ে দাওয়ায় একটা চাটাই বিছিয়ে দেয়। পুলি ভাত-সালন নিয়ে আসে। এতক্ষণে মরিয়মও সেখানে এসে বসে। পুলি তিন প্লেটে ভাত-সালন বেড়ে নেয়। আর একটা মালসায় ফেন ও কিছু ভাত নেয়। ফেন-ভাত পুলির পোষা কুকুরের জন্য। বড়ই ভদ্র সেই কুকুর। খুব শিকারি। খাওয়া-দাওয়া যতক্ষণ না দেয় ততক্ষণ সে টুঁ শব্দও করে না। খুব প্রভুভক্ত। কালুও তাকে খুব পছন্দ করে। পুলি তুতু করে ডাকতেই সে দাওয়ার পাশে এসে হাজির। অনবরত লেজ নাড়াচ্ছে খুশিতে। পুলি মালসাটা তার দিকে এগিয়ে দেয়। কুকুরটি আয়েশ করে খেতে শুরু করে। পুলি বাপের পাতে কিছুটা সুরুয়া ঢেলে দেয়।

—নেও বাজান, খাও। মা, তুমিও শুরু করো।

খাওয়ার সময় কালুর কথা বলার অভ্যাস পুরনো। তাই সে বউ ও মেয়ের সঙ্গে হাবিজাবি বিষয় নিয়ে কথা বলে। হঠাৎ মরিয়মকে উদ্দেশ করে সে বলে, বুঝলি বউ, দ্যাশ স্বাধীন অইতে আর বেশি দিন দেরি নাই।

মরিয়ম কিছুটা শুকনো গলায় বলে, দ্যাশ স্বাধীন অইলেও কী আর না অইলেও কী! আমরা তো আমরাই থাকমু। কালি, কালির বউ, কালির মেয়ে। আমগো অবস্থার কোনো পরিবর্তন অইব না।

পুলি বলে, কী যে কও, মা! দ্যাশ স্বাধীন অইলে আমার যে কী আনন্দ অইব!


মন্তব্য