kalerkantho

লাল দেয়াল

ফজলে রাব্বী দ্বীন

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



লাল দেয়াল

দুপুরের ক্লান্ত রোদ যখন নক্ষত্রের সঙ্গে আড়ি দিয়ে পৃথিবীর ওপর হামলা করে, তখন কি সুখপাখিরা বাঁচতে পারে! রো নদীর মতো ক্রমেই ভ্যানিশ হয়ে যায় প্রহরের হামলায়। অস্থিরতা দিন দিন নদীভাঙনের মতো কুঁকড়ে মারছে বিহানের পুষ্পকলিদের।

আর আমি তা নিস্তব্ধ পায়রার মতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি। যেন নিরুপায় এক নিয়মবন্দি শালিকের দাঁতভাঙা ছাও। তিন-চার বছরের মা-ছাড়া ছেলেটা আমারই মতো ছন্মছাড়া পথের পাশে শিশির কুড়িয়ে দুঃখ ছোঁয়। যখন তার মুখে বাবা নামের একটা শব্দ তরঙ্গিনীর ঢেউয়ের মতো ভাসতে ভাসতে আমার কানে এসে ধাক্কা খায়, তখন আমি তার দিকে ফিরে তাকাই। ওর চোখ দুটি যেন পদ্ম বানে। নিয়মভাঙা জীর্ণ-মলিন জীবনের সুতো অতীতের দিকে ফিরে তাকায় সন্ধ্যার লগ্নে। এ আমি কী করলাম?

ভোর ৬টা। ঘুম থেকে ওঠার আগে মনে হয়েছিল, এখনো রাত ফুরায়নি। এক বালিশে দুই মাথা ঠেস দিয়ে আছি।

আমি ও আমার চার বছরের মানিকসোনা অনল। পাশের বালিশটা ফাঁকা পড়ে আছে। কাঁথাটা পায়ের কাছে পরিত্যক্ত শেওলার মতো লুটোপুটি খাচ্ছে রীতিমতো। চোখটাকে ঝাপসা থেকে পরিষ্কার এঙ্গেলে তুলে ধরলাম দরজার দিকে। দরজাটা খোলা। মস্তিষ্কে শীতল হাওয়ার দখলদারি। অনল আমার বুকটাকে এমনভাবে জাপটে ধরে আছে যে আমার এ বন্ধন টুটে বাইরে যাওয়ার কোনো সাধ্যি নেই। আগন্তুক সন্দেহের এক ঝড় বাইরে থেকে ক্রমাগত যেন ডাক দিতে শুরু করল। অনলের হাতটাকে আমার শরীর থেকে আস্তে করে সরাতেই তার চোখে আলো এসে ঢুকল। ঘুম ভেঙেও ভাঙল না। নিস্তব্ধ সুরে বাইরের দিকে পা বাড়াতেই পরনের লুঙ্গিটা ঢিলা হওয়ার উপক্রম। শক্ত করে কোমরের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে সূর্যছায়ার আলিঙ্গনে হাত বাড়ালাম। বুকটা ধুঁক করে উঠল। কবিতা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। কিন্তু তার সামনে আরেকটা সন্দেহের মূর্তি। আমার পুরনো বন্ধু অর্কিড। নয়নের জলে অগ্নির খেলামেলা। লাল হয়ে উঠল আমার শুষ্ক চুলের গোড়ালির মতো রেটিনার সামনের লেন্সটি। চিৎকার দিয়ে বললাম, ‘কবিতা। ’

কবিতা এখন ঘরের ভেতর নিরুত্তর-নিশ্চুপ। আমার হুঙ্কারে দেয়ালের টিকটিকিরা লেজ ফেলে পালায়। তেলাপোকার সন্ধি করা কুঁড়েঘর ভেঙে পড়ে তরঙ্গের ঢেউয়ে। ‘আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছ কেন? কারো সঙ্গে কথা বলা আমার অপরাধ হয় নাকি?’ পয়তাল্লিশ সেকেন্ড পর দুইটা বাক্য বের হলো কবিতার কাঁপতে থাকা মুখ থেকে।

‘হ্যাঁ, অপরাধ হয়। বড্ড অপরাধ। কেন তুই কথা বলিস ওই ছোটলোকটার সঙ্গে? জবাব দে?’

‘ও তোমার বন্ধু। ’

‘ছিল। এখন নেই। বন্ধুত্ব চিলে উড়াল দিয়ে নিয়ে গেছে। এখন আমার জ্বালা হয়। ওকে দেখলেই আমার োথা দিয়ে আগুন জ্বলে। কত দিন বলেছি ওই পিশাচটার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখতে, তার পরও কেন আমার অগোচরে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলি? ও তোর কে হয়?’

‘বলছি তো, কেউ না!’

‘তুই আমাকে কী ভাবিস? আমি টের পাব না? আরে, তোর পায়ের প্রতিটি শব্দ দশ মাইল দূর থেকেও আন্দাজ করতে পারি। দাঁড়া! এই পায়ের নূপুর আগে ছিঁড়ে ফেলতে হবে। এই নূপুরের আওয়াজ শুনেই ওই নর্দমার কীটটা বাড়ির সামনে আসার সাহস পায়। ’

রাগের গভীরতা মাপার মতো থার্মোমিটার কি আবিষ্কার হয়েছে আজও? হয়ে গেলে তো ব্যস, আর না হলে তার নাম যেন রাগথার্মো হয়। দুনিয়ার কোনো পারদগলা মিটার-সেন্টিমিটার নেই যে আমার চুলের আগায় আঁচল এলিয়ে কঠিন শিলায় রূপান্তরিত হবে। কবিতার দুই পা থেকে নূপুরের ঝনঝনানি কাঁঠালপাতার মতো হেঁচকা টেনে ছুড়ে মারলাম দুপুরের উত্তপ্ত কার্নিসে। ও বিষবৃক্ষের মতো চোখেমুখে সর্দি লাগা কান্নার প্যাচাল তুলে অন্য রুমে দৌড়ে ছুটল। একটু শান্ত হওয়ার আলপনা আঁকতে লাগলাম। আমার কবিতা ভূগোলের মতো বদলে গেছে। এখন আর আগের মানুষটি নেই। তাই এখন আর আগের মতো ওকে নিয়ে কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে না! কী নেই আমার মধ্যে? ক ছিল না আর কী থাকবে না? তার পরও কেন কবিতা আমাকে ঠকানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে? ও শুধু আমার রাগত মুখের ছবিটাই দেখে। বুকের ভেতরটায় কত যে ভালোবাসা তার জন্য উপচে পড়ে, তা কি ও বুঝতে পারে না?

আধা মিনিট পর। কপালের দেয়ালে জমে ওঠা স্বচ্ছ কাচের মতো ঝকঝকে কতকগুলো ঘামের ফোঁটা রুমালের গায়ে লাগিয়ে দিলাম। বাইরে বেরোতেই বারান্দায় ছুড়ে মারা কবিতার নূপুর দুটি চোখে পড়ল। কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। এ নূপুর তো ভালোবাসার জালে বুনা জন্মদিনে গিফট দেওয়া আমার নূপুর নয়। তাহলে? চিন্তার মোড় বদলে গেল অতীতের খামে। প্রায় বছরখানেক আগের কথা। অনলের বয়স তখন চার। অনলের জন্যই আমরা সপরিবারে ঘুরতে গিয়েছিলাম কক্সবাজার। সেখানে এক হোটেলে উঠতে গিয়েই নিচতলায় তাকিয়ে দেখি আমার সেই পিশাচ বন্ধুটা। হাতে তার দুটি রুপোর নূপুর। কী যেন করতে যাচ্ছে মনে হয়েছিল। যদিও শেষমেশ ওর জন্যই আমাদের শুভ ভ্রমণটা অশুভে রূপান্তরিত হয়েছিল, তবুও সেই দিনটার কথা কখনো ভোলার নয়। এটা এখন আরো স্পষ্ট যে সেই দিন অর্কিড কক্সবাজার গিয়েছিল শুধু কবিতার জন্য এবং সেই দিনই কবিতাকে সে নূপুর দুটি গিফট করেছিল আমার অগোচরে। আর কবিতাও আমার ভালোবাসার কথা ভুলে গিয়ে সেই নূপুরের স্নেহে মেতে উঠেছিল, যা এখনো কন্টিনিউ করে যাচ্ছে।

অর্কিড আর আমার সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বলতে গেলে তার থেকেও হাজার গুণ বেশি। একদিন ও ট্রাকচাপা পড়ে মারা গিয়েছিল। সবার মুখের এমন উড়ো খবর শুনে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনি। সিরাজগঞ্জ শহরে থাকাকালে সাত বছর পর শুনি, সে আজও বেঁচে আছে। সেদিন ও ট্রাকচাপা পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল তত্ক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিধায় এবং এত দিন ও লুকিয়ে ছিল সবার আড়ালে। ভোলা জেলায় গিয়ে মনের দুঃখ সব ভুলে একলা হয়ে দিন কাটিয়েছিল সাত বছর এবং যখন তাকে সামনা-সামনি দেখতে পেয়েছিলাম, তখনো ও সুস্থ ছিল না। কবিতার অমত থাকা সত্ত্বেও অর্কিডের থাকা এবং সুস্থতার জন্য জায়গা দিয়েছিলাম নিজের বাসায় এনে। সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার বাসা থেকে এক পাও নড়তে দিইনি। সব কিছু অল্পের থেকেও বেশি হয়ে যাচ্ছিল। হয়তো সেই বেশিত্বই শনি হয়ে বারবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আজ। যা আগে কোনো দিন আন্দাজও করতে পারিনি। সেই সময় আমার নববধূ তার কোথায় হাত বুলিয়ে দিত, পরম স্নেহে রুটি ভেজে ঝোল খাওয়াত। আর আমি তা দেখে আনন্দে বউয়ের কপালে চুম আঁকতাম। ভাবতাম, ও সত্যিই লক্ষ্মী হয়ে ঘর আলোকিত করতে শুরু করেছে।

অতিভক্তি এবার নিজেকেই ঠকিয়ে মারছে। আমার স্বপ্নের নূপুর দুটি আলমারির খাঁজে নেতিয়ে পড়ে। এতে বাহবাহ দেওয়া ছাড়া আর কী-ই বা থাকতে পারে!

পরদিন বারোটা বেজে তিন মিনিট। অফিসের জমে থাকা কাজের তিমিরে নিজেকে নিয়ে নাচানাচি চলছিল। হঠাৎ অনলের ফোন। ‘আব্বু, তুমি এত খারাপ কেন? তুমি সত্যিই ভালো মানুষ নও। ভালো মানুষ হলে তো কথা দিয়ে কথা রাখতে। ’

ছেলের মুখের তিরতিরানো মিষ্টি মধুর কথাগুলো শুনে বেশ ভালোই লাগছিল। অফিসের কাজ ফেলে ফোনকলের দিকে নে দিয়ে তত্ক্ষণাৎ বললাম, ‘কেন, কী হয়েছে মানিক আমার?’

‘সেই যে কালকে তুমি আমাকে বলেছিলে, রাতের বেলা ঘুমোলে নাকি সবচেয়ে সুন্দর লাগে আমাকে। তাই একটা কবিতা লিখেছ। কই? পত্রিকার লোকটা তো মোট সাতটা পত্রিকা বেল বাজিয়ে দিয়ে গেল, কিন্তু কোথাও তো আমার নাম নেই! তুমি কি সত্যিই কবিতা লিখোনি আমার জন্য? নাকি আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলেছিলে?’

চার বছরের একটা ছেলের মুখ থেকে এমন সুন্দর সুন্দর পাকা পাকা কথা শুনলে কার না নে ভরবে! হাসি দিয়ে তত্ক্ষণাৎ বললাম, ‘লিখেছি তো সোনা। কিন্তু সেটা আজ না, পত্রিকায় কাল আসবে। ’

কথাটা শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠল আমার ছোট্ট মানিক। তারপর শুধু বলল, ‘ওকে। কালকের জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। যদি না আসে তাহলে কিন্তু তোমার সঙ্গে আর কথা বলব না। একদম আড়ি দিয়ে দেব। তখন আর ময়না, সোনা বলেও কোনো লাভ হবে না। এমনকি দোকান থেকে চকোলেট আনলেও না। ’

আমি অবাক হয়ে শুনছি অনলের মুখের মিষ্টি কথাগুলো। এমন সময় অনলের পাশ থেকে গ্লাস ভাঙার শব্দ কানে এলো। আগের হাসিমুখের প্রসঙ্গটা অশান্তিতে রূপ বদলাল। মিষ্টি কথা ছেড়ে অনলকে বললাম, ‘কিসের শব্দ হচ্ছে অনল? আর তুমি গ্লাস হাত থেকে ফেলে দিলে নাকি?’

উত্তর এলো, ‘আমি কি কখনো গ্লাস ভেঙেছি আব্বু? তুমি শুধু মিছেমিছি আমাকে দোষ দিচ্ছ। গ্লাস ভাঙার শব্দ তো ওই রুম থেকে আসছে। ’

‘ওই রুম থেকে মানে’—পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম।

‘হ্যাঁ, ওই রুম থেকেই। ’

‘তোমার আম্মু কোথায়? তোমার আম্মুকে ফোনটা এবার দাও দেখি। তোমার জন্য যে কবিতাটা লিখেছি, সেটি তোমার আম্মুকে না জানালে কি হবে?’ মিষ্টি সুরে শিশু ভঙ্গিমায় উচ্চারিত হলো কথাগুলো।

‘মা তো আংকেলের সঙ্গে ওই রুমে গল্প করছে। ’ কোন আংকেল? প্রশ্নটা আর করতে ইচ্ছা করল না। সব কিছু মেঘজমা কালো আঁধারির মতো হয়ে যাচ্ছে। এক নিমেষে গোলমাল হয়ে গেল সব। ব্যাপারটা মোটেও ঠিক ঠেকছে না। অনলের ফোনটার লাইন কেটে দিলাম হুট করে। অফিসের কাগজ, ফাইল—সব কিছু টেবিলের ওপর রেখেই সোজা বাইক স্টার্ট করলাম বাসার দিকে। বাড়ি প্রায় পৌঁছে গেছি।

দরজায় পা দিতেই শরীটা কাঁটা দিয়ে উঠল। ঘরের ভেতর পরপুরুষের পদচ্ছবি। সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুই জোড়া অসহায় স্যান্ডেল। নিজের পায়ের শু জোড়া খুলতে পারলাম না। ঘামের দুর্গন্ধ ক্রমশ পা ছুঁয়ে নাকের ডগায় পৌঁছার জন্য অপেক্ষমাণ। ঘরে ঢুকে অনলকে খুঁজে পেলাম না। সম্ভবত বাইরে খেলতে গেছে আর না হয় জোর করে পাঠানো হয়েছে। পশ্চিম পাশের রুমটা হালকা খোলা। দরজার সামনে শাড়ির আঁচল পড়ে আছে। ড্রইংরুমের পাশটায় দাঁড় করিয়ে রাখা শাবল দেখে মুষ্টিবদ্ধ করে নিলাম সিটি। তারপর রক্তাক্ত খিস্তি বেরিয়ে এলো সামনে।

কবিতার ডায়েরিতে রক্তের ছাপ লাগানো। দেয়ালের নীল রঙে দুটি খুন অনায়াসেই ঝুলতে থাকল। বাঁদরের বাঁদরামিটা আর কখনো দেখব বলে আশা নেই। শাবল ঢুকিয়ে দিয়েছি বুকের পাটায়। যৌক্তিক আর অযৌক্তির প্রশ্নের কোনো জায়গা নেই এই অকল্পের গল্পে। নামতা পড়া অনলের বইটা পায়ের সামনে পড়ল। অ-তে অজগরটি ঐ আসছে তেড়ে, ই-তে ইঁদুরছানা ভয়ে মরে—আরো কত কী! বইটা ফ্লোরের ওপর থেকে তুলতে ইচ্ছা করল। কিন্তু লোহিত বর্ণ এই হাত দিয়ে তুলতে পারলাম না। ওই বইটা অনলকেই মানায়। অ, ই পড়ে পড়েই তো প্রতিদিন ও অজগরের তাড়া খায়, ইঁদুরের ভয়ে মরার দৃশ্য দেখে। হয়তো একদিন ঈ-তে ঈগলের ওড়াউড়ি সম্পর্কে জানতে পারবে। তারপর একদিন ও থেকে ঔ-তে দৌড়ে ছুটে যাবে। শুধু আমার হাতের আদর পাবে না। কারাগারের অন্ধকারে থাকলে কী করে শুনবে বাঘ মামাদের নিয়ে লেখা আমার ছন্দের বাহারি যত্তসব শব্দ, একটা প্রতীক্ষার কবিতা পড়ার জৌলুস? অন্ধকারে হয়তো সারা জীবন ডুবে মরতে হবে আমাকে। ভবিষ্যৎ তো এখন তা-ই বলবে!

আচমকা পেছন থেকে অনলের ডাক, ‘আব্বু। ’ মায়া দিয়ে বানানো আব্বু নামের ডাকটা হৃদয়ের সব শক্ত জোড়াকে নিমেষেই চুরমার করে দিল। দুই হাত আস্তে করে বাড়িয়ে দিলাম। অনল এক লাফে আমার রক্তাক্ত শরীরের ভালোবাসায় সিক্ত হলো। কোলে উঠে চোখের নোনা জল মুছে দিতে দিতে বলল, ‘আমার জন্য কি আর কবিতা লিখবে না...?’


মন্তব্য