kalerkantho

গহ্বর

জোবায়ের মিলন   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গহ্বর

কনকনে শীত। অর্জিতা সন্ধ্যায় স্কুল থেকে বাসায় ফিরে গায়ে উলের জ্যাকেট জড়িয়ে মায়ের কাছ ঘেঁষে জলসা টিভি দেখতে বসেছে। ‘জল নূপুর’ সিরিয়ালটা তার খুব পছন্দ। পারি বুর চরিত্রটা আরো পছন্দ। ‘পারি’ যখন ভারসাম্যহীন শরীরটা নিয়ে কথা বলে তখন অর্জিতা দুই চোখ এক করে এক চোখে তাকিয়ে থাকে আর মায়ের কাছে প্রশ্ন করে, আম্মু, পারি বু তো পাগল, তাহলে এমন সুন্দর সুন্দর কথা বলে কী করে? পাগল মানুষ কি সুন্দর কথা বলতে পারে? গান গাইতে পারে? এ রকম অনেক প্রশ্ন। অর্জিতার মা কোনো উত্তর করে না। পাশে বসে তিনিও সিরিয়ালটা মন দিয়ে দেখেন। পারির চরিত্রটা এলেই মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকেন। কেন তাকিয়ে থাকেন ছোট্ট অর্জিতার মতো তিনিও জানেন না। কিন্তু তাকিয়ে থাকেন।

অর্জিতা কোনো উত্তর না পেয়ে মায়ের শরীর ঘেঁষা থেকে একটু সরে আবার প্রশ্ন করে, আম্মু, মিতু আপু্ও তো পাগল, তবে আপু কেন পারি বুর মতো সুন্দর করে কথা বলে না। আম্মু, মিতু আপু কি সত্যিই পাগল? জানো, মিতু আপুকে সবাই যখন পাগল বলে আমার তখন খুব কান্না পায়। আমার কষ্ট হয়। সবাইকে আমার বলতে ইচ্ছা করে, ‘মিতু আপু পাগল না, মিতু আপু আমার আপু, তাকে পাগল বলছ কেন? তোমরা পচা। ’ কিন্তু আমি বলতে পারি না। পাশের বাড়ির আন্টিও সেদিন মিতু আপুকে পাগল বলে খেপিয়েছে। আন্টি আমাদের বাসায় এলে আর জায়গা দিয়ো না আম্মু। অর্জিতার কথায় তার মা কোনো কথা না বলে পাশের বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা মিতুর কাছে গিয়ে বসে। ঘুমন্ত মিতুর মাথায় হাত বোলায়।

মিতুর বয়স ১৫। অর্জিতা থেকে ৯ বছরের বড়। কামাল সাহেবের এই দুটিই মেয়ে। অর্জিতা আর মিতু। অর্জিতা হওয়ার ৯ বছর আগে মিতুর জন্ম। জন্মের পর সারা পাড়ায় ডাক পড়ে গিয়েছিল, কামালের ঘরে পরি হইছে রে, পরি। আর অর্জিতার মা নুসরাত বেগম কামাল সাহেবকে কানে কানে বলেছিলেন, তোমার মতো হলেও আপত্তি ছিল না। রং দিয়ে কি কিছু হয়! মানুষ মানুষের মতো হয়ে ওঠাটাই জরুরি। কামাল সাহেব স্ত্রীর কথায় লজ্জা পেলেও ভালোই লেগেছিল তাঁর। মেয়েটা তাঁর মতো শ্যাওলা রং পায়নি। মেয়েটার রং হয়েছে হলুদ ফরসা। যদিও কামাল সাহেবের কিছুটা সন্দেহ ছিল এই ভেবে যে জন্মের পর পর সব বাচ্চাকেই ফরসা দেখায়, পরে রং বদলায়। কিন্তু দাদি-নানিরা তাঁদের আদি চোখ দিয়ে আদি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, কামাল, তোর মেয়ে ফরসাই হবে রে। অপ্রকাশ্য হলেও শান্তি পেয়েছিল কামাল। কালো না হয়ে অস্বস্তি থেকে বাঁচিয়েছে বলে মিতুর প্রতি টানও ছিল অনেক। তিনি মেয়েকে ছেড়ে কোথাও একবিন্দুও যেতে চাইতেন না। সব সময় খেলনার মতো মেয়ের ছায়ার সঙ্গে সঙ্গে ছায়া হয়ে লেগে থাকতেন। এখনো থাকেন। তবে আগের মতো উত্ফুল্লতা নেই।

জন্মের কিছু সময় পরই মিতুর মধ্যে দেখা দেয় কিছুটা ভারসাম্যহীনতা। ‘মামণি’ বলে ডাকলে অন্য বাচ্চারা যেমন চোখের দিকে তাকায়, হাসে, সাড়া দেয়, হাত বাড়ায়, তখন দেখা যেত ছোট্ট মিতুর খেয়াল অন্যদিকে। হাত-পা ধরতে চাইলে কখনো বাড়িয়ে দিত না নিজ থেকে। নানাজন নানা পরামর্শ দিলেও মিতু বড় হতে থাকল মানসিক জড়তা নিয়েই। ডাক্তার, কবিরাজ, পীর, মাজারে দেখিয়েও আর কাজ হলো না। জানা গেল, এটা জন্মগত। মানসিক প্রতিবন্ধকতা কোনো অসুখ নয়, তবে সঙ্গ ও পরিচর্যাই তার ওষুধ। মিতু সেই থেকে চোখে চোখেই থাকে।

অর্জিতা তার মায়ের কাছ ঘেঁষে আবার প্রশ্ন করে, আম্মু, আপুর কি অসুখ হয়েছে?

—না।

তবে আপুকে যে অনেক ওষুধ খেতে দাও। পারি বু তো কোনো ওষুধ খায় না। আপু খায় কেন?

—আপুর জ্বর হয়েছে।

কী জ্বর?

অর্জিতার মা শেষ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন না। মিতুর দিকে চোখ দিয়ে রাখে। অর্জিতা ‘পারি’ চরিত্রটা এলেই শত শত প্রশ্ন করে, কেন করে তা অর্জিতা যেমন জানে না, তেমনি তার উত্তর কী তাও জানেন না অর্জিতার মা। তাঁর চোখে কেবল একরাশ কাশফুল মেঘের মতো কালো হয়ে উড়ে যায় কাকের ডানার মতো। তাঁর চোখে কেবল সেদিনের একটা শব্দ—‘মা, আমি ব্যতা পাচিচ, আম্মু তক্ত। ’ এক থোক কুয়াশার চাকা তার চোখে। অর্জিতার শত প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি জানেন কিন্তু কোনো উত্তর তাঁর মুখ দিয়ে আসে না। কেবল ভেতরে ভাসে, ‘পারি’ অভিনয়, আর মিতু সত্য। এ সমাজ মিতুদের মেনে নেয় না, সুযোগ পেলেই মিতুদের ব্যবহার করতেও ছাড়ে না। তাই মিতুদের ওষুধ খেতে হয়, ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। তাই অর্জিতার মতো ছোট্ট শিশুটিকেও মা হয়ে মিথ্যা বলতে হয়, আপুর জ্বর হয়েছে!

মিতুকে আজ চার সপ্তাহ ধরে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। জেগে উঠলেই অনবরত কাঁদতে থাকে, মা, ব্যতা...ব্যতা। আমিকে মেলেছে, তয়তান চাচ্চু মেলেছে। সহজে থামানো যায় না মেয়েটাকে। কয়েক দিন আগেও সুস্থ ছিল সে। প্রতিবন্ধী হলেও কখনো জ্বালাতন করত না। এলোমেলো কথা বলত, কাউকে আঘাত করত না। কিছু নষ্ট করত না। অর্জিতার সঙ্গেই সব সময় খেলা করত। বাড়ির বাইরে যেত না তেমন একটা। গেলে অর্জিতার সঙ্গেই যেত, আবার ফিরে আসত একটু পরই। কিন্তু ঘটনার দিন অর্জিতার পরীক্ষা ছিল বলে নুসরাত বেগমকে অর্জিতার সঙ্গে স্কুলে যেতে হয়েছিল। কামাল সাহেবও অফিসের কাজে ছিলেন ঢাকার বাইরে। মিতুকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন ভেবেও নুসরাত বেগম কী যেন ভেবে মিতুকে বাসায় রেখে গেলেন। একটু পরই তো ফিরে আসবেন, তাই। মিতুকে ঘরে রেখে বাইরে থেকে টিপতালা লাগিয়ে গেলেও ভুল করে চাবিটা ফেলে গেলেন গ্রিল করা বারান্দার কাছে ডাইনিং টেবিলের ওপর।

পথেই নুসরাত বেগম বুঝেছিলেন চাবিটা টেবিলের ওপর রেখেই তালাটা মেরে এসেছেন, তবুও পরীক্ষার সময় বেশি বাকি না থাকায় ফিরে আসা হলো না। আর যখন ফিরে এলেন তখন দেখেন ঘরের দরজা খোলা। আঁতকে উঠল নুসরাত বেগমের মন। বড় বড় হয়ে গেল চোখ। দরজা খুলল কী করে? মিতু বাইরে বের হয়ে যায়নি তো? দৌড়ে ঘরে ঢুকেই দেখেন, না, মিতু আছে কিন্তু মেয়েটা কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে কাঁদছে পেটে হাত দিয়ে। চুল এলোমেলো। নুসরাত বেগম জানতে চাইলেন, দরজা খুলেছে কে, কী করে দরজা খুলল? তুমি বাইরে গিয়েছিলে তালা খুলে?

মিতু কোনো উত্তর দেয় না। মিতু অস্পষ্ট ভাষায় কী যেন বলে মাকে। নুসরাত বেগম বুঝতে পারেন না। আবার জানতে চান, কী হয়েছে? তিনি নিজেই মিতুর পেটে হাত দেন। মিতু ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে মাকে ইঙ্গিত করে, আরো নিচে...। নুসরাত বেগম মিতুকে পাশের রুমে নিয়ে যান। পায়জামার ফিতাটা খোলাই ছিল, ভালো করে দেখে নুসরাত বেগম শিউরে ওঠেন! চিৎকার করে বলেন, এ কী করে হলো, কে এসেছিল? দরজা খুলল কী করে? আকাশ ফাটা কান্না তাঁর বুকটাকে চৌচির করে দিল। হায়, এ কী সর্বনাশ হলো! তখন মিতুর পা গড়িয়ে রক্ত পড়ছিল।

চার দিন পর হসপিটাল থেকে ফিরে মিতুর ভাঙা ভাঙা ভাষা থেকে জানা গেল, বাড়িওয়ালা বয়স্ক আউয়াল মানসিক ভারসাম্যহীন মিতুকে চকোলেট, শনপাপড়ি দেখিয়ে সেদিন চাবিটা তার হাতে নিয়েছিলেন। তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর...। কামাল সাহেব প্রতিবেশীকে সব জানালে তার ওপরই সবাই চাপিয়ে দিয়েছিল সব অপরাধ। কেউ কেউ বলেছিল, এসব বিষয়ে শব্দ না করাই ভালো। কেউ কেউ বলেছিল, আপনি বরং বাসাটা ছেড়ে অন্য মহল্লায় চলে যান। নুসরাত বেগম বলেছিলেন, থানা পুলিশ করতে। কিন্তু কামাল সাহেব এই ভেবে চাননি বিক্ষত মেয়েটাকে আবার করাতের নিচে ফেলতে যে এ কেস প্রমাণ করতে হলে সাক্ষাৎ-যন্ত্রণার চেয়ে অধিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয় সব ভিকটিমকে। সে যন্ত্রণা আরো যন্ত্রণার।

কামাল সাহেব কাউকে আর কিছুই বলেননি। গত মাসে বাড়িটা ছেড়ে আসার সময় আউয়াল সাহেবের বড় মেয়েকে সামনে পেয়ে শুধু বলেছিলেন, তোমার বাবা একটা কুকুর!

মিতু ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। নুসরাত বেগম তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে রেখেছেন। মিতুর মুখ থেকে বের হচ্ছে, মা ব্যতা...ব্যতা।


মন্তব্য