kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভ্রমণ কাহিনী

প্রবালদ্বীপে জোছনাস্নান

মাহতাব হোসেন

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রবালদ্বীপে জোছনাস্নান

গাড়ি থেকে ঘুম ঘুম চোখে টেকনাফে নামলাম। দুই হাতে চোখ ডলে সামনে তাকিয়ে মনে মনে একটি শব্দ খেলে গেল, অপূর্ব।

স্থির নাফ নদী, আলো-আঁধারীতে জলের ওপর ভাসমান গাছপালায় স্নিগ্ধতা। ওপারে বার্মা পাহাড়। রাতের অন্ধকার সরে গিয়ে নতুন দিনের আলো-আভা। লালচে আভায় কী অদ্ভুত সুন্দর হয়ে উঠেছে নাফ নদীর দুই পার। সবাই গাড়ি থেকে নেমে গেছে। ৩৫ জনের বড় দল। যে যার মতো নেমে চোখ-মুখ ধুয়ে ফেলছে। আমার সঙ্গে তাহমিদ। ওকে নিয়ে গেলাম জাহাজের কাছে। পাটাতনের সাঁকো যেন জাহাজের কাছে নয়, ঠেকেছে স্বর্গের কাছে। নাফ নদীর কাছে সকালটা এত সুন্দর হয়ে ওঠে কিভাবে!

ফিরে এসে নাশতা করলাম। চাটাই মোড়ানো একটা চায়ের দোকানে গরম গরম দুইটা পরোটা, ডাল আর ডিমভাজি। নাশতা সেরেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ‘মাথিনের কূপ’ দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। কেননা জাহাজ ছাড়তে তখনো তিন ঘণ্টার মতো বাকি। মাথিনের কূপ নিয়ে আমার আগ্রহের শেষ নেই। এইটে পড়ার সময়ই ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ পড়ে শিহরিত হয়েছি। তারপর টেকনাফ আসার সুযোগ হলো ১৭-১৮ বছর পর। আমার সঙ্গী শুধু তাহমিদ। পরে আরো কয়েকজন যুক্ত হলো—ফারিয়া, শান্তু, নাফিসা আপা, রতন ও আলী ভাই। মাথিনের কূপ দেখলাম। টেকনাফ থানার সামনে একটা বেশ বড় কূপ রেলিং দিয়ে মোড়ানো। পাশে লেখা মাথিনের কূপের ইতিহাস। দেখার সময় এর কোনো বিশেষত্ব চোখে পড়ার কিছু নেই। কিন্তু আমার কাছে অনেক কিছু।

জাহাজের কাছে এসে ধাক্কা খেলাম। জাহাজ আজ যাবে না। সমুদ্র অনুকূল নয়। তাই বলে টেকনাফ এসে সেন্ট মার্টিনস যাব না? দলের সিদ্ধান্ত হলো, ট্রলারে যাওয়া হবে। ট্রলার শুনে কেউ কেউ চিন্তিত হলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হলো, সবাই যাবে। আমরা টেকনাফ সদরে এলাম পুরো দল। ট্রলার রিজার্ভ করা হলো। ট্রলারে উঠতে গিয়েই হলো বিপত্তি। সমুদ্রের এসব ট্রলার ভারসাম্যের ওপরই অধিকতর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের এলোমেলো ও তাড়াহুড়োর কারণে ট্রলার উল্টে যায়। বড় ধরনের কোনো ক্ষতি না হলেও আমার মতো কয়েকজনের মোবাইল সাময়িক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চলে যায়।

সেদিন সেন্ট মার্টিনস যাওয়া বাতিল হলো। আমরা টেকনাফ বিচের কাছে সেন্ট্রাল রিসোর্ট নামের একটা রিসোর্টে উঠলাম। আহা, সমুদ্রের কাছেই এত চমৎকার একটি রিসোর্ট। সারা বছর এখানে থেকে যেতে মন চায়। রিসোর্টের কটেজে উঠে, ব্যাগপত্র রেখেই সমুদ্রে চলে এলাম। কক্সবাজারের সৈকতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় টেকনাফ সৈকত। বরং কক্সবাজারের সৈকতের সিজনাল ঘিঞ্জির চেয়ে অনেকটাই বেটার এই সৈকত।

পরের দিন আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবারও ট্রলার, তবে রিজার্ভ নয়। সেন্ট মার্টিনসের নিয়মিত যাত্রীর সঙ্গেই আমরা যাচ্ছি। আমার সামনে একজন হুজুর ও তাঁর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। আশপাশে ছড়ানো-ছিটানো আমাদের সদস্যরা। বুকের ভেতর তোলপাড়। আতঙ্ক মেশানো একটা ঢেউ যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাফ নদী থেকে যখন আমাদের ট্রলার সমুদ্রে পড়ল, তখন কিছুটা ঢেউয়ের দেখা পেলাম। হুমায়ূন আহমেদের রুপালি দ্বীপের বর্ণনা অনুযায়ী তিনতলা ঢেউয়ের দেখা পেলাম না। তবে ট্রলারের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে আছড়ে পড়ার মতো বিষয় তো ছিলই।

যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেই রিসোর্টের নাম ‘ব্লু লেগুন’। সৈকতের একেবারে পাশে। পুরো বিকেল প্রবাল সৈকতে কাটানোর পর রাতে বারবিকিউ হলো। কিন্তু কোথাও যেন একটা অপূর্ণতা থেকেই যাচ্ছিল। মনে হলো, রাতের সমুদ্রে গোসল। আমাদের টিম লিডারদের অন্যতম একজন প্রিয়া আপু। তাঁকে বললাম। তিনি রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত নানা কাজে তিনি রয়ে গেলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তীরে নামল নীরবতা। নেমে পড়লাম রাতের সমুদ্রে।

শুয়ে আছি বিস্তৃত সৈকতে, জোছনামাখা বালুতে, অবারিত জোছনায়। এই জোছনার জন্য ছিল কত অপেক্ষা। মেঘে মেঘে অস্থিরতা, প্রবালে প্রবালে অভিমান। রাত বাড়তে লাগল। এরপর মেঘ কেটে গিয়ে জোছনা উঠল। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নিজেকে ঢুকিয়ে ফিনকি দিয়ে আকাশময় ছড়িয়ে পড়ছে আশ্বিনী জোছনা। মাইনাস টু পয়েন্ট ফাইভ চশমার কাচ ভেদ করে চোখে জোছনা ঢুকে যাচ্ছে। শরীরে জোছনার প্লাবন। শোঁ শোঁ শব্দ করে একেকটা জলের ঢেউ ছুটে আসছে। শরীরের ওপর আছড়ে পড়ে ফের পিছিয়ে যাচ্ছে। শরীরের ওপর যে জোছনার স্তর, তার ওপর লবণাক্ত জলের আস্তরণ ফেলে ফের ছুটে আসছে আরেকটা ঢেউ। আকাশে বড় একটা চাঁদ মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন ঘুরে যায়, আর আমি একটু একটু করে সমুদ্রের জোয়ারের জলের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিই...

আহমেদ ভাই, আমি, শান্তু, আরিফ, তামান্না, কুশ প্রধান, তানজিলা আপু, সুমন ভাই, প্রিয়া আপু ভোর ৪টা পর্যন্ত বিচে কাটালাম। তার পরও পরের দিন ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশে খুব সকালেই রওনা দিলাম। রেস্কিউ বোটে বাংলাদেশের শেষ সীমানার মাটিতে পা স্পর্শ করতে চললাম। আকাশ পরিষ্কার। সাদা পেজা মেঘ উড়ে যাচ্ছে। পানির ওপর দিয়ে আমাদের বোট ভেসে চলছে। এখানের পানি এত গাঢ় নীল, এত গাঢ়! যদি ছেঁড়াদ্বীপ না যেতাম, হয়তো বুঝতে পারতাম না। ছেঁড়াদ্বীপে একমাত্র বসবাসকারী পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। প্রচুর ছবি তুলে যখন সেন্ট মার্টিনসের মূল ভূখণ্ডে ফিরলাম, তখন আমাদের ‘ট্রাভেলার্স নেস্ট’ পরিবারের সেন্ট মার্টিনস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।

     ছবি : আহমেদ উল্লাহ


মন্তব্য