kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কৃতী বন্ধু

‘প্রোগ্রামিং সৈনিক’ নাফিস

ওয়ালীউল্লাহ মিঠু   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘প্রোগ্রামিং সৈনিক’ নাফিস

কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রোগ্রামিংয়ে ব্যস্ত। রাত বা দিন কোনো অনুভূতিই মনিটর থেকে তাঁর চোখ ফেরাতে পারে না।

বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেই হবে তাঁকে। আর তাতেই যেন রাজ্যের শান্তি এসে আলিঙ্গন করে। অনলাইনে রুমে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন নিয়মিত। এভাবে জটিল সব কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে নিজেকে বেশ ভালোভাবেই প্রস্তুত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শুভসংঘ বন্ধু নাফিস সাদিক।

যেমন পরিশ্রম করেছেন তেমনি দেখা পেয়েছেন অনেক সাফল্যের। সিঙ্গাপুরের গ্রাবট্যাস্কি কম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ডাক পেয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। গত ২৯ জুলাই নাফিস তাঁর স্বপ্ন নিয়ে উড়ে গেছেন। এ পর্যায়ে আসার আগে আরো সাফল্য রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোকিত করেছেন, সঙ্গে নিজেকেও। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দলের তিনি অন্যতম সদস্য।  

মা-বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে নিজের ভালো লাগাটা প্রেশার মাপার যন্ত্র স্টেথোস্কোপ থেকে কম্পিউটারের মাউসের প্রতিই ঝুঁকতে থাকে। গণিত অলিম্পিয়াডে কলেজ পর্যায়ে দিনাজপুর পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন ২০০৯ সালে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি তখন থেকেই মনোযোগ বেড়ে যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ভর্তি হওয়ার পর সেই সুযোগ আরো বেড়ে যায়। নিজের বিভাগে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকেন্দ্রিক লেখাপড়া আর রুমে বসে অনলাইনে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দক্ষ হয়ে ওঠেন নাফিস সাদিক।

সর্বশেষ গত মে মাসে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটিং মেশিনারি ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্ট ২০১৬’-তে তাঁর দল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়। আন্তর্জাতিক পর্বে অংশগ্রহণ করার জন্য আগে আঞ্চলিক পর্বে (বাছাই পর্ব) লড়তে হয়। সেখানেও তাঁর দল ঢাকা পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়। আঞ্চলিক পর্বে বাংলাদেশের শীর্ষ তিনটি দলকে আন্তর্জাতিক পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১২ সালে প্রথম আঞ্চলিক পর্বে অংশগ্রহণ করার সুযোগ আসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালের হয়ে। সেবার দেশের মধ্যে ২২তম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হন। কিন্তু দমে যাননি। চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ২০১৩ সালের শেষের দিকে আবার অংশগ্রহণ করেন। এবার বাংলাদেশ পর্বে তৃতীয় স্থান দখল করে নেয় তাঁর দল। বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও অংশ নিতে পারেননি তাঁরা।

২০১৪ সালে আঞ্চলিক পর্বে সেকেন্ড হওয়ার ফলে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পর্বে রাশিয়ার মস্কোতে অংশগ্রহণ করে বিশ্বের ১২৮টি দলের মধ্যে ৫৯তম স্থান অর্জন করে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে ২০১৬ সালে আঞ্চলিক পর্বে চ্যাম্পিয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্বে দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে নাফিসের দল।   

২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার আয়োজিত জাতীয় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান এবং ২০১৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে বেসরকারিভাবে আয়োজিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায়ও চ্যাম্পিয়ন হয় নাফিসের দল।

এভাবে নাফিস ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং দলের হয়ে লড়েছেন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। আর একাকী লড়েছেন অনলাইনে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতায়। অনলাইনে লড়া প্রোগ্রামারদের রেটিং নির্ধারণ করে ‘কোড ফোর্সেস’ এবং ‘টপ কোডার’। কোড ফোর্সেসে ২৪০০ এবং টপ কোডারে ২২০০ পয়েন্টধারীদের বলা হয় ‘রেড কোডার’। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার কম্পানির পক্ষ থেকে এদের ডাক পড়ে। নাফিস এখন পর্যন্ত কোড ফোর্সেসে ২৪৬১ এবং টপ কোডারে ২০৮০ পয়েন্ট তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাফিসের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা অনিন্দ মজুমদার গত বছর শুরুতে গুগলে স্থান করে নিয়েছেন। নাফিস সাদিকের চোখও কি তবে গুগলের দিকেই? এমন প্রশ্নের জবাবে নাফিস বলেন, ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে আরো ভালো করতে চাই। আরো এগিয়ে যেতে চাই বাংলাদেশের পতাকা হাতে। তবে সেটা গুগলেই সীমাবদ্ধ নয়। ’


মন্তব্য