kalerkantho


ভ্রমণ কাহিনী

সাফারি পার্কে একদিন

মশিউর রহমান   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সাফারি পার্কে একদিন

সাফারি পার্ক ভ্রমণে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুভসংঘের বন্ধুরা

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) কেবলই পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সামনে ঈদ, তাই নেই কোনো পড়াশোনার চাপ। হাতে নেই অন্য কোনো কাজও। শুভসংঘের বন্ধুরা চিন্তা করলেন, এই একটু অবসরে শিক্ষাসফর করলে কেমন হয়? যেই ভাবা, সেই কাজ। সব সদস্যের মধ্যে পড়ে গেল সাজ সাজ রব। সম্মতি প্রদান করে তাঁদের উৎসাহের আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন উপদেষ্টারা। এবার শুধু বাকি জায়গা নির্বাচন। সবাই একত্রে বসে ঠিক করলেন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। এরই মধ্যে যাওয়ার দিনও ঠিক করে ফেললেন বন্ধুরা।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৬ আগস্ট শুভসংঘের একদল বন্ধু হারিয়ে গিয়েছিলেন প্রকৃতির মধ্যে। আনন্দে নাচে-গানে ভরপুর কাটল সবার সারা দিন।

সারা রাত বৃষ্টির কারণে সকালে ঘুম থেকে ওঠা সাত রাজ্য জয় থেকেও কম না। শুভসংঘের বন্ধুরাও আর কম কিসে? তাঁরা এই অসাধ্য সাধন করে সকাল ৭টার মধ্যেই শেকৃবির কেন্দ্রীয় মাঠে হাজির। হাসি-আনন্দ আর হৈহুল্লোড়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বাসটি ছেড়ে দিল সাফারি পার্কের উদ্দেশে। সকাল ১১টায় বন্ধুদের বহনকারী বাস পৌঁছে গেল বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, গাজীপুরে। বাসেই সকালের নাশতা করে নিয়েছেন সবাই। শুভসংঘ বন্ধু সজল আর নাদেরের বাসের হেলপারি ও নাচ মাহফুজের পাগলামো কথাবার্তা—এগুলো কোনোটাই ভোলার মতো না। সাফারি পার্কে ঢুকে সবাই দল বেঁধে চলে গেলেন সাফারি কোরে। এখানে বাঘ, সিংহ, ভালুক, জিরাফ—সবই দেখা যায় চিড়িয়াখানার মতোই। পার্থক্য শুধু চিড়িয়াখানায় প্রাণীরা থাকে খাঁচায় আর মানুষ থাকে উন্মুক্ত। এখানে প্রাণীরা তাদের নিজস্ব পরিবেশে ঘোরাফেরা করছে, মানুষ তাদের বাস থেকে অবলোকন করছে। খোলা জায়গায় বাঘ-সিংহ বিচরণ করতে দেখে, তাদের এত কাছ থেকে দেখায় ব্যস্ত সময় কাটতে লাগল বন্ধুদের। এখান থেকে সবাই মিলে ঘুরতে বের হলেন। এর মধ্যেই অনেকে আবার হাতির পিঠে চড়লেন, কেউ আবার প্রজাপতিদের দেখছেন, কেউ বা ঢুকে গেছেন পাখির রাজ্যে। সবাই মিলে উপভোগ করলেন বিভিন্ন রাজহাঁসের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য আর সঙ্গে বিভিন্ন রঙের কার্পজাতীয় মাছ।

এগুলো দেখতে দেখতে একসময় বন্ধুরা সবাই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সবাই চলে এলেন গাড়ির কাছে। একটি ছায়াময় স্থান খুঁজে বের করে ৫৫ জন বন্ধু ঢাকা থেকেই রেডি করে আনা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলেন। এবার সবাই মিলে প্রস্তুত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার জন্য। উপদেষ্টা স্যারদের সম্মতি পেয়ে গাড়ি ছুটে চলল ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। শালগাছের বনাঞ্চল ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে এসে সবাই মিলে ভেতরে ঢুকে একটি সুবিধামতো জায়গা পছন্দ করলেন। খেলাধুলার জন্য এর মধ্যেই ফুটবল নিয়ে হাজির শুভসংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক তনু। শুভসংঘের আরেক সদস্য হাজির একটি বড় ছবি ও কালো টিপ নিয়ে। সিদ্ধান্ত হলো, ছেলেরা ছবির কপালে টিপ দেবেন চোখ বাঁধা অবস্থায় আর মেয়েরা খেলবেন ফুটবল। বিজয়ীর জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কার। ফুটবল খেলায় সিনিয়র সব আপু ও তাঁর বান্ধবীদের হারিয়ে পুরস্কার ছিনিয়ে নিল পূজা। টিপ পরানোয় মহাব্বত স্যার, শিমুল স্যারসহ সবাই অনেক চেষ্টা করলেও সঠিক স্থানে টিপ পরাতে একমাত্র বাপ্পীই সফল এবং সে-ই হলো বিজয়ী। ততক্ষণে বিকেলের সূর্যটাও পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। সবার মধ্যেই দেখা গেল ক্যাম্পাসে ফেরার তাড়া। সবাই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে এসে বাসে উঠে পড়ল। বাস চলতে শুরু করল ক্যাম্পাস অভিমুখে। বাসে উঠে সবাই বললেন, এবার হবে লটারি। শেকৃবি শুভসংঘের সভাপতি মশিউর প্রস্তাব করলেন—লটারির মাধ্যমে এত দিন আমরা বের করেছি কে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান, আজকে আমরা বের করব আমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে দুর্ভাগা। সবাই মশিউরের অন্য রকম চিন্তাকেই সমর্থন করলেন। একটি পাত্রে সবার নাম লিখিত চিরকুট রাখা হলো এবং একে একে সবাই একটা একটা করে তুলতে থাকলেন, যাঁদের নাম উঠছে তাঁরা সবাই সৌভাগ্যবান, সবার শেষের জন হবেন সবচেয়ে দুর্ভাগা। অবশেষে বাকি থাকলেন দুজন। সবার প্রিয় মহাব্বত স্যার ও দিলজাহান। সবার মধ্যে তখন তুমুল উত্তেজনা। কে হবেন সবচেয়ে বড় দুর্ভাগা। সব শেষে হেলাল স্যার মহাব্বত স্যারের নাম তুলে স্যারকে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগা হতে দিলেন না। আমরা পেয়ে গেলাম আমাদের বিজয়ীকে। তবে তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, আজকের দিনে দুর্ভাগা হতে পেরেই তিনি অনেক খুশি। বাসের মধ্যেই বিজয়ী তিনজনকে দেওয়া হলো আকর্ষণীয় পুরস্কার। এর মধ্যে সবাইকে বিকেলের নাশতা দেওয়া হয়ে গেছে। হঠাৎ বাসের সামনের সারি থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। শিমুল স্যার দরাজ গলায় গেয়ে চলছেন—একদিন বাঙালি ছিলাম রে...। বন্ধুরা সবাই যোগ দিলেন। স্যারের সঙ্গে কোরাসে চলতে থাকল—গাড়ি চলে না, যমুনার জল দেখতে কালো, মধু কই কই বিষ খাওয়াইলা...। তারপর শুরু হলো নাচ। সবাই নাচতেছেন, বাস ততক্ষণে ঢুকে গেছে ঢাকা শহরে, ছুটছে শেকৃবি ক্যাম্পাস পানে। পেছনে উচ্চস্বরে বেজে চলছে গান, ভেতরে সবাই নাচে মশগুল, ক্লান্ত বাস ততক্ষণে ঢুকে পড়ল ক্যাম্পাসে।


মন্তব্য