kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভ্রমণ কাহিনী

বাংলার ভূস্বর্গে

সুমন বর্মণ

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলার ভূস্বর্গে

সমতল ভূমির মানুষ আমি। শৈশব থেকেই পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

কলেজের শিক্ষা ভ্রমণে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে একাধিকবার প্রকৃতির অপার সৃষ্টি পাহাড় ও সমুদ্র দর্শনের সুযোগ হয়েছে। যতবারই দেখেছি মুগ্ধ হয়েছি সৌন্দর্যে, একই সঙ্গে হৃদয়ে পাহাড়ের প্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কে জানার ক্ষুধা সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ভ্রমণবিষয়ক গ্রুপ ‘ট্রাভেলারস নেস্ট বাংলাদেশ’ ঈদের ছুটিতে বান্দরবানের দুর্গম অরণ্যে ক্যাম্পিং ‘আমিও খুম সাথে নাফাখুম ও অন্যান্য...’ আয়োজন করে। গ্রুপে পোস্ট করা স্থানগুলোর কিছু মনোমুগ্ধকর ছবি দেখে আমি মুগ্ধ হই। মনস্থির করি ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার। ক্যাম্পের ছবিগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। তাই গ্রুপের অ্যাডমিন শরিফুল সুমন ভাইকে কল করি। আমার পাহাড় নিয়ে আগ্রহের পাশাপাশি ট্র্যাকিংভীতির কথা শুনে তিনি সাহস জোগান।

বেশ বড় একটা দল নিয়ে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে আমরা গন্তব্যে যাত্রা করি গত ৭ জুলাই রাত ১০টায়। ঈদের ছুটিতে মহাসড়ক ফাঁকা থাকায় বুলেট গতিতে ছুটে চলে বাস। ভোর ৪টায় আমাদের বহনকারী বাসটি বান্দরবান পৌঁছে যায়। চালকের সহকারীর ডাকে যখন জেঁগে উঠে শুনি বান্দরবানে পৌঁছে গেছি, তখন সবাই অবাক না হওয়ার উপায় নেই। আগে থেকেই ভাড়া করা চাঁদের গাড়িতে বান্দরবান জেলা শহর থেকে ৭৯ কিলোমিটার দূরত্বের থানচি উপজেলা সদরে পৌঁছতে আমাদের সময় লাগে ৩ ঘণ্টা। সাঙ্গু নদীর পারে অবস্থিত থানচি বাজার। সেখানে সবাই সকালের খাবার খেয়ে নিই। এরপর স্থানীয় গাইড সেলিমকে নিয়ে থানা ও  বিজিবির কাছে রিপোর্ট করি। পরে সাঙ্গু নদী ধরে ইঞ্জিনবোটে উজান ঠেলে আমরা রওনা হই পদ্মঝিরি অভিমুখে। প্রকৃতি এত সুন্দর আর নির্মল হতে পারে, কল্পনা করা যায় না। নদীর দুই পাশে সবুজে মোড়ানে প্রতিটি পাহাড় যেন মেঘের কোলে শুয়ে আছে অবলীলায়। অসাধারণ সে দৃশ্য। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে তুলির আঁচড় বুলিয়ে পুরো চিত্রটা ক্যানভাসে এঁকে রেখেছে। যেদিকে তাকাই, কেবলই মুগ্ধ হওয়ার পালা। দুই ঘণ্টার ট্রলারযাত্রা শেষে আমরা পৌঁছে যাই পদ্মঝিরিতে। নৌকা থেকে নেমে শুরু হয় আমাদের মূল অভিযান পর্ব। অর্থাৎ হাঁটা পর্ব, মানে ট্র্যাকিং। পাহাড় পেরিয়ে ও খালের পাড় ধরে চলে আমাদের ট্র্যাকিং। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা পৌঁছি ত্রিপুরাপাড়ায়। সেখানে খানিক সময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা যখন থুইসাপাড়ার উদ্দেশে রওনা হই, তখন আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। সুউচ্চ পাহাড় পেড়োনোর পরই অঝোর বৃষ্টি। কিন্তু অভিযাত্রিক দলের যাত্রা থেমে নেই। ঝুম বৃষ্টিতেই আমরা এগিয়ে চলি। বৃষ্টির সঙ্গে চারদিকে শুভ্র সবুজ দেখে মন ভরে যায়। যে ভালো লাগা একটিবারের জন্যও কমেনি। পাহাড় পেড়োনোর পরই ঝিরিপথ। ততক্ষণে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। ঝিরিপথের দুই পাশে পাহাড়, ঘন জঙ্গল। কখনো বা বড় শুকনো গাছের গুঁড়ি কিংবা গর্ত। সন্ধে যত গাঢ়  হয়, রাত  যত বাড়ে, বিচিত্র অন্তরঙ্গ শব্দরা আস্তে আস্তে ভিড় জমায়। গা ছমছম করা পিচ্ছিল এই ঝিরিপথ পেরিয়ে রেমাক্রি খালে পৌঁছতেই রাত ১০টা বেজে যায়। অগত্যা পাহাড়িদের সহযোগিতায় প্রবল স্রোতের সেই খাল পার হয়ে থুইসাপাড়ায়   পৌঁছতে রাত ১২টা। সেখানে স্নান শেষে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খাই। থুইসাপাড়ার হেডম্যান থুইসা খিয়াংয়ের ঘরেই আমাদের রাতযাপনের ব্যবস্থা হয়। সারা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত সবাই নিমেষে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। পরদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিয়া আপুর ডাকে ঘুম ভাঙে। দ্রুত সকালের নাশতা সেরে সবাই রওনা দিই। আবারও পাহাড় পেরিয়ে ঝিরিপথ পার হতে হলো। এরপর আমরা উঠে যাই দেবতা পাহাড়ে। পাহাড়ে ওঠার পর দেখা গেল, সামনে সুউচ্চ দুটি পাথরের পাহাড়। আর তার নিচ থেকে অবিরাম ভেসে আসছে পানি পড়ার শোঁ শোঁ শব্দ। বুঝতে বিলম্ব হয় না, জলপ্রপাতের অনেকটা ওপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এবার নামার পালা। কিন্তু তা যথেষ্টই কষ্টসাধ্য, ঝুঁকিও আছে। কারণ দেবতা পাহাড় থেকে নামতে হয় ৮৫ থেকে ৯০ ডিগ্রি খাড়া পথ বেয়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা বেয়ে বেয়ে নেমে আসি পাহাড়ের নিচে। দুঃসাধ্য সেই পথে নামতে না পেরে দলের কয়েক সদস্য ফিরে যায় থুইসাপাড়ায়। পাথর আর সবুজে ঘেরা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে রেমাক্রি খাল। খালে বিশাল সব পাথর। খালের পাশ দিয়ে পাথর পার হয়ে একটু উজানে যেতেই চোখের সামনে বিস্ময় আমিয়াখুম জলপ্রপাত। পাথর আর সবুজে ঘেরা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবল বেগে নেমে আসছে জলধারা। দুধসাদা রঙের ফেনা ছড়িয়ে তা বয়ে চলেছে পাথরের গা বেয়ে। নিমেষেই ভিজিয়ে দিচ্ছে পাশের পাথুরে চাতাল। সঙ্গে অবিরাম চলছে জলধারার পতন আর প্রবাহের শব্দতরঙ্গ। বাংলাদেশে এমন ঐশ্বর্যের অবস্থান দেখে আমরা বিমোহিত। হারিয়ে যায় এত কষ্ট স্বীকার করে এখানে আসার সব ক্লান্তি ও অবসাদ। আমিয়াখুমে আমরা পৌঁছতেই শুরু হয় বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেই আমরা আমিয়াখুম জলপ্রপাতেই তাঁবু দিয়ে ক্যাম্প করি। সারা রাত থেমে থেমে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরেছে। এরই ফাঁকে তাঁবু থেকে বেরিয়ে জ্যোত্স্না আকাশে শুনেছি ঝরনার শব্দের ছন্দ মিলানো নতুন এক ধ্বনি। সংগীতময়তা পাওয়া যায় তাতে। অনুভূতি হয় স্বর্গীয়। রাত পেরিয়ে যখন সকাল হলো, বৃষ্টির তীব্রতা আরো বাড়ল।

সেখান থেকে আমরা চলে যাই আরেক অপরূপ ঝরনা নাফাখুম দেখতে। এর মধ্যে কমে আসে বৃষ্টি। কয়েকটি পাথরের ধাপে ধাপে জলরাশি প্রবল বেগে নেমে আসছে। বৃষ্টিহীন প্রকৃতির সুযোগে সবাই নাফাখুমের অপরূপ সৌন্দর্যে নিজেকে ফ্রেমবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। খানিক সময় পর আবার মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। দেরি না করে আমরা খালের পাড় ধরে রওনা দিই। পিচ্ছিল সেই পথের বেশ দূর যাওয়ার পর চোখে পড়ে মনোরম দৃশ্য। পুরো খালে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় অজস্র পাথর। সবাই খালের শীতল জলে গা ভিজিয়ে ক্লান্তি দূর করে। একই পথ ধরে কখনো পাহাড়, কখনো পিচ্ছিল পাথর দিয়ে এগোতে হয় আমাদের। হাঁটতে হাঁটতেই আমরা পৌঁছে যাই হেডম্যানপাড়ায়। সেখানে যাত্রাবিরতি   দিয়ে ইঞ্জিনের নৌকায় প্রথমে রেমাক্রি বাজার ও পরে আমরা থানচি পৌঁছি। নৌকা যখন নদীর জল কেটে ভাটির দিকে আসছিল দুই পাশের শিল্পিত সুউচ্চ সবুজ পাহাড় ও তাদের গা ঘেঁষে ছুটে চলা মেঘ যেন আমাদের বিদায় জানাচ্ছিল।


মন্তব্য