kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তুমি এবং সেই কাঁঠালিচাঁপাগাছটি

রাকিবুল প্রিয়   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তুমি এবং সেই কাঁঠালিচাঁপাগাছটি

একসময় বাড়ির পেছনের কাঁঠালিচাঁপাগাছটি ফুলের ভারে নুয়ে পড়ত। রোজ তোমার জন্য কিছু কাঁঠালিচাঁপা ফুল তুলে রাখতাম।

তুমি এসে নিয়ে যেতে। তোমার খুব প্রিয় ছিল কিনা! একদিন ফুল না পেলে রেগে আগুন হয়ে যেতে। আমায় সহ্য করতেই পারতে না। বলতে, যেখান থেকে পারো আমার ফুল এনে দাও। আমি কত কিছু যে করতাম! দৌড়ে যেতাম তন্বীদের বাড়ি। ওর কাছ থেকে ফুল এনে দিলে তবেই আমার রক্ষা হতো। ও, ভালো কথা, তন্বীর পরিচয়টা দিয়ে নিই। তন্বী আমার ক্লাসমেট, বান্ধবী। মেয়েটি ভীষণ রকমের মিষ্টি। যতটা না মিষ্টি, তারচেয়েও দ্বিগুণ সহজ-সরল। প্রতিদিন দুজন একসঙ্গে স্কুলে যেতাম, আবার একসঙ্গে ফিরতাম। একদিন যদি ওকে রেখে স্কুলে যেতাম, তবে আমার আর রক্ষে ছিল না। আমার সঙ্গে কয়েক দিন কথাই বলত না। পরে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার বাগে আনতাম। এই মেয়েটিরও কাঁঠালিচাঁপা ফুল ভীষণ রকমের পছন্দের ছিল। তার এক মামাতো বোন বিজলির কাছ থেকে ছোট্ট একটা চারা নিয়ে এসে রোপণ করে। অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পরিপূর্ণ গাছে পরিণত হয়। চমত্কার সব ফুল ফোটে। একদিন বিকেলবেলা আমি বাজারে যাচ্ছিলাম। ওর বাড়ির পেছনেই লাগানো ছিল ফুলগাছটি। আমার রাস্তাও ছিল ফুলগাছ ঘেঁষে। যাওয়ার পথে উজ্জ্বল ফুল দেখে আমারও ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়। বাজার থেকে ফিরেই ওকে বলে ফুলগাছের একটা ডাল এনে রোপণ করি। সেই থেকে আমার বাড়িতেও হয়ে গেল এই কাঁঠালিচাঁপাগাছটি। একদিন তুমি আমার বাড়িতে এলে। কাঁঠালিচাঁপাগাছের চমত্কার মনকাড়া ফুলের ঘ্রাণে তোমার উতলা হিয়াকে মুগ্ধতায় পাগল করে তুলল। যাওয়ার সময় বলে গেলে, রোজ যেন তোমার জন্য একটা করে ফুল নিয়ে স্কুলে যাই। সেই থেকে রোজই একটা করে ফুল বুকপকেটে ভরে স্কুলে নিয়ে যেতাম। তা দেখে তুমি পাগলিনীর মতো হয়ে যেতে। আমায় শুভকামনা জানাতে। ভালো গুণগান গাইতে। প্রশংসায় মাথায় তুলে রাখতে। আর আজ এতগুলো বছর কেটে গেল, তুমি নেই। চলে গেছ না ফেরার দেশে। আমাদের সম্পর্কের অল্পকাল পরেই যখন বিয়ের বনিবনা চলছিল, তখন একদিন হঠাৎ করেই তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে। দ্রুত শহরের নামকরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, তোমাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। মস্তিষ্কে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এই রোগের চিকিৎসা এখনো পরিপূর্ণভাবে আমাদের দেশে কার্যকর হয়নি। এ কথা শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম এবং প্রচণ্ড রকম ভেঙে পড়লাম। কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি তোমাকে হারাতে চাই না। ডাক্তার বললেন, তোমাকে বিদেশে নিয়ে যেতে। কিন্তু অনেক টাকার প্রয়োজন। এত টাকা পাব কোথায়! বাধ্য হয়ে আমার নিজের একটা কিডনি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে ফেলি। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। অবশেষে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে, আমাকে একা ফেলে চলে গেলে দূর নক্ষত্রের মাঝে। সেই থেকে এই বিরহেই হয়তো আমার কাঁঠালিচাঁপাগাছটায় আর ফুল ফোটে না। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, বসন্ত ফুরিয়ে আবার আসে; শুধু আমার কাঁঠালিচাঁপায়ই বসন্ত আসে না। আমি প্রতি চন্দ্রিমায় আকাশে যখন উজ্জ্বল তারকারাজি খেলা করে, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি, আর তোমাকে খুঁজে ফিরি।

                                                 (বন্ধু নং ৫০১০৯)


মন্তব্য