kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

আলতার আলতা

হাসিনা সাঈদ মুক্তা

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আলতার আলতা

অঙ্কন : মাসুম

প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে। মিলি আবারও এসেছে গ্রাম দেখতে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত গৌরীপুর গ্রাম। সে এখানে একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক পদে নিযুক্ত হয়ে এসেছিল। এসেছিল অনেকটা শান্তির অন্বেষণে। সবুজ, শান্ত, নীরবতা আর স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের আবীর মাখানো অভয়ারণ্য। নির্মলতা, বিশুদ্ধতার প্রতীক। তাকে ঘিরে ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি। মনের আয়নায় বিচরণ করে বারবার। বর্তমানে মিলি ঢাকায় মহিলা অধিদপ্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে সে দুস্থ নারী ও শিশুদের সেবামূলক কার্যক্রম ও পরামর্শদাতারূপে নিয়োজিত। গ্রামে বেড়াতে এসে মিলির উচ্ছ্বাস বেড়ে যায় শত গুণ, বেড়ে যায় আবারও সেই সখ্য গাঁয়ের সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে, তার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। লক্ষ করে দেখে মিলি, তারা বেশ বড় হয়ে গেছে এবং তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজেও বেশ দক্ষ। ফের উদ্যোগী হয় মিলি গ্রামটাকে আরো ভালোভাবে দেখার। দেখে তার চিরচেনা এই গাঁয়ের মেঠো পথ। স্কুলের পাশে সেই সুদৃশ্য নার্সারি। একে ঘিরে বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া। ঝাউগাছগুলোর ঘন পাতা, সঙ্গে পাগলা হাওয়ায় ছন্দ তোলা ঝিরিঝিরি শব্দ। আর নার্সারিজুড়ে শোভা বর্ধনকারী অসংখ্য রংবেরঙের ফুল। আগের মতোই মনটা ভরে ওঠে মিলির। ভীষণ ভালো লাগে তখন তার। তবে মিলির সবচেয়ে প্রিয় দক্ষিণ পাড়ের পুকুরটি। বর্তমানে এটি কলঙ্কজনক ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে। মিলি লক্ষ করল, চারপাশের পরিবেশে দিনবদলের ছোঁয়া। পুকুরটি বাঁধানো হয়েছে। তার আশপাশে জঙ্গল, গাছগুলোও নেই। তাতে খানিকটা মনঃক্ষুণ্ন হয় তার। গাছগুলোয় নীল, হলুদ ছোট ছোট বুনো ফুল ফুটত তখন, তার সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে।

স্কুলে প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করে মিলি। এই দুই বছরে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা আবার কিছু তিক্ততাপূর্ণ অভিজ্ঞতাও লাভ করে সে। আলতা নামে তার একজন খুব প্রিয় ছাত্রী ছিল। স্কুলে সে ছিল মেধাবী, একই সঙ্গে খেলাধুলা ও হস্তশিল্প বিষয়েও পারদর্শী। কিন্তু হঠাৎ করে যেন কী হয়ে যায় মেয়েটির। সমগ্র চোখেমুখে ভয়, আতঙ্কের ছাপ সার্বক্ষণিক যেন কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে।

কী হয়েছে আলতা? আলতাকে প্রশ্ন করে মিলি। মেয়েটির মুখের দিকে তাকানোই যায় না। কিছু বলতে না পেরে আলতা জাপটে ধরে মিলিকে। অস্ফুট স্বরে কেঁদে ওঠে তত্ক্ষণাৎ।

পরে মিলি জানতে পারে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রামে প্রভাব বিস্তারকারী অসাধু ব্যক্তির চোখ পড়েছিল আলতার ওপর। কিন্তু তার বয়সই কত? অথচ সেই অসাধু ব্যক্তি মাদকদ্রব্য চোরাচালানের আসামি। তা ছাড়া গ্রামে কিছু কুখ্যাত ঘটনার সঙ্গেও জড়িত সে। অথচ কোনো এক রহস্যজনক কারণে তার জেল হয় না। খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে যায় সে। ফলে ক্রমেই অন্ধকার দেখতে থাকে আলতা ও তার পরিবার।

একদিন অনেক রাতে তারা আসে মিলির কাছে, সাহায্যের আবেদন জানায়। মিলি নিজেও এ বিষয়ের প্রতি উদ্যোগী হয়। কিন্তু গাঁয়ের সুধীমহল এ বিষয়ে নীরবতা পালন করে। এতে রীতিমতো স্তম্ভিত হয় মিলি। ফলে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। অবশেষে একদিন লাঞ্ছিত হওয়ার উপক্রমও ঘটে তার। মিলি সেদিন কী করবে ভাবতে পারে না। ভীষণ ব্যথা ও ক্ষোভে আঁতকে ওঠে সে। প্রভাবশালীরা মিলির বাবাকে হত্যা করার হুমকি দেয়। স্বার্থলোভী মানুষ, সামান্যতেই যারা দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়, তারা কি মানুষ? হাল ছেড়ে দেয় মিলি তথাকথিত শক্তির কাছে। কিন্তু কোনোমতে বেচারী আলতার জন্য কিছু করতে না পারলে নিজেকেও যেন ক্ষমা করা যায় না। তাই ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেয় সে...।

কিন্তু হঠাৎ করেই তো সব সিদ্ধান্ত একেবারে নেওয়া যায় না।

মিলিকে স্কুলের কাজে যেতে হবে ময়মনসিংহে। পরদিন খুব ভোরে চলে যায়। যাওয়ার আগে আলতার সঙ্গে দেখা করে সে। আলতা মিলিকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদে। মিলি সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পায় না। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আলতা, একদম কাঁদবি না। এই দেখ, আমরা আছি না? তোর কিছু হবে না। আমি ময়মনসিংহ যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব? আলতা এনো। আলতার মুখ দিয়ে হঠাৎ করেই বের হয় এই শব্দটি। মেয়েটা খুব সাজতে পছন্দ করে। নূপুর পরা ফরসা পায়ে আলতা পরলে ভারি মানাবে তাকে। এসব কথা বাসে বসে ভাবতে থাকে মিলি। পরদিন স্কুলের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় মিলির। কাজ শেষে শহরের একটি মেলায় যায় মিলি। সেখানে নাগরদোলা, পুতুলনাচ, সাজ-পসরা কত কী? দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। ইস, আলতা সঙ্গে থাকলে খুব ভালো হতো! আলতার জন্য আলতা কেনে। লাল টকটকে সিঁদুরের রং। ভালো রংবেরঙের রেশমি কাচের চুড়িও কেনে মিলি। মনে মনে ভাবে, আলতাকে বউ সাজালে কী অপরূপই না লাগবে...! অথচ ফুলের মতো নিষ্পাপ মিষ্টি মেয়েটির জীবনে কিনা কাঁটার আঘাত! কী করে রুখবে তাকে? তাই যেভাবে হোক, গ্রাম থেকে আলতাকে নিয়েই শহরে চলে যাবে সে।

কিন্তু যা হওয়ার তা তো হলোই। সেদিনই যে মিলির সঙ্গে আলতার শেষ দেখা হবে তা-ই বা কে জানত? আলতার বাড়িতে খোঁজ করে দেখে সে নেই। আলতাকে পাওয়া গেছে সেই পুকুরপাড়ে। ...তবে (!?) অচেতন, প্রাণহীন আলতা, হতভাগী আত্মহত্যা করে প্রাণে বাঁচতে চেয়েছে।

আলতার অসাড় দেহটা তুলে এনেছে ডুবুরিরা। তার ফরসা, আলতাবরন চেহারাটা ধীরে ধীরে নীল বর্ণ ধারণ করেছে। আলতার আর আলতা ও কাচের চুড়ি পরা হলো না। আলতাকে দেখা মাত্রই এগুলো ছিটকে পড়ে যায় মিলির হাত থেকে।

আলতা, খুব কষ্ট হয়েছে তোর? বলেই বসে পড়ে মিলি। আলতার লাল রঙে ভিজে যায় মাটি ঠিক সেখানে, যেখানে আলতাকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ লক্ষ করে, আকাশে গুটিকয়েক মেঘ জমেছে। তার একটু পরেই হালকা গর্জে বৃষ্টি নামে। তাতে ধুয়ে মুছে যায় আলতার রং...। সেদিকে হতবাক ও নির্বাক নয়নে চেয়ে থাকে পুরো গ্রামবাসী। তবে কি একটা অসহায় জীবনের মৃত্যুতে আকাশও কাঁদে।

ঠিক পাঁচ বছর পর একই প্রশ্ন আকাশকে করে মিলি। পেছনে ফেলে আসে গৌরীপুর গ্রাম। সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় পাঁচ দিনের স্মৃতি। সেই পুকুরঘাটের কথা মনে পড়তেই বিষাদে ভরে যায়। নয়ন দুটি ঝাপসা হয় সঙ্গে সঙ্গেই। ফের অশ্রুসিক্ত আঁখিতে আকাশটা দেখে। কত কিছুই তো হয় পৃথিবীর বুকে। খুন, ধর্ষণ, লুটপাট—কয়টির বিচার হয়? কয়জনেরই বা হয়? আর পুরো পৃথিবীর নীরব সাক্ষী ওই আকাশ। এত বিশাল, তবু সে কিছু করতে পারে না। কখনো হয়তো গর্জে নিজেই ফেটে পড়ে। কিন্তু তাতে ক্ষতি হয় অসহায় মানুষগুলোর। তবু দৃঢ় বিশ্বাস আর আশীর্বাদে মিলি অপেক্ষা করে। যেন অন্তিম সময়েও সৃষ্টিকর্তার দণ্ডবিধি থেকে রেহাই না পায় কোনো পাপী।

                         (বন্ধু নং ৫০০০১)


মন্তব্য