kalerkantho


‘জিকা ভাইরাস’ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ফখরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি ‘ফার্মাকোলজি ও টক্সিকোলজি’ বিষয়ে গবেষণারত। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি আলোচিত ‘জিকা ভাইরাস’ নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন জাবি শুভসংঘের উপদেষ্টা তরুণ এই গবেষক

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



‘জিকা ভাইরাস’ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

বর্তমান বিশ্বে জিকা ভাইরাস একটি আলোচিত বিষয়। জিকা যে কারণে বিশ্বের মনোযোগ টেনেছে তা হলো, মাইক্রোসেফালি (একটি নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার) ও ভাইরাসটির মধ্যে যোগসূত্র।

মাইক্রোসেফালি এমন একটি অবস্থা, যেখানে বাচ্চার মাথা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ছোট হয়। জিকা ভাইরাসের কারণে মস্তিষ্কে ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ডেঙ্গু, পীতজ্বর, জাপানিজ এনসেফালাইটিস এবং ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস যে গোত্রের সদস্য, জিকা ভাইরাসও একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি ফ্লাভিভাইরাস। এই ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে, তার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরের কিছুটা মিল লক্ষ করা যায়। উগান্ডার জিকা বন থেকে ‘জিকা’ নামটি নেওয়া হয়েছে। ১৯৪৭ সালে হলুদ জ্বর নিয়ে গবেষণার সময় সেখানেই বানরের দেহে সর্বপ্রথম এ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। পরে ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়ায় মানবদেহে প্রথমবারের মতো শনাক্ত করা হয় ‘জিকা’। ২০১৫ সাল নাগাদ আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন নাগরিকের শরীরেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ৬৭ বছর বয়স্ক একজন পুরুষের দেহে জিকা ভাইরাস পাওয়া গেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক, যদিও আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জিকা ভাইরাস মূলত দুই ধরনের এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়; অবফবং ধবমুঢ়ঃ (গ্রীষ্মমণ্ডল ও এর নিকটবর্তী অঞ্চলে) এবং অবফবং ধষনড়ঢ়রপঃঁং (শীতপ্রধান অঞ্চলে)। শুধু স্ত্রী মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটেছে এমন কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ানোর মধ্য দিয়ে এর স্থানান্তর হয়। পরে ওই মশা অন্য ব্যক্তিদের কামড়ালে তা ছড়াতে থাকে। জিকা ভাইরাস শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমেও ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডাক্তারদের মতে, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এর উপসর্গ কিন্তু খুব মারাত্মক কিছু নয়। জ্বর, হালকা মাথা ব্যথা, অবসাদগ্রস্ততা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, পেশিতে ব্যথা, শরীরে লালচে দাগ বা ফুসকুড়ি ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে এই ভাইরাস কয়েক দিন থাকে, তবে কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। এই রোগে মৃত্যুর ঘটনা খুবই বিরল। গর্ভবতী মহিলারা এই রোগে আক্রান্ত হলে এটি গর্ভের সন্তানকে আক্রান্ত করতে পারে। বাচ্চা মাইক্রোসেফালি নিয়ে জন্মায়। এর কারণে শিশুদের মধ্যে বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দেয় এবং কখনো কখনো মৃত্যুও হতে পারে।

বিশ্বে এই রোগের কোনো ওষুধ বা টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। এ রোগে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, প্রচুর পানি পান করতে হবে যেন পানিশূন্যতা না হয়। ব্যথা ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রুফেন, ন্যাপ্রক্সেনজাতীয় ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এতে উচ্চ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে। জিকা ভাইরাস সংক্রমিত অঞ্চল বা দেশগুলো ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। মশার কামড় থেকে বাঁচার উপায়গুলো মেনে চললেই এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচা যাবে। জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে যেন মশা না কামড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এডিস মশা সাধারণত বালতি, ফুলের টব, গাড়ির টায়ার প্রভৃতিতে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। তাই সেগুলোতে যেন পানি না জমে থাকে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপত্তার জন্য মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।

     অনুুলিখন : ইন্দ্রজিত ভৌমিক


মন্তব্য