kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

সুন্দর আগামীর লক্ষ্যে তৈরি করছে শিশুদের

জাকারিয়া জামান   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুন্দর আগামীর লক্ষ্যে তৈরি করছে শিশুদের

আজকের শিশুই আগামীর কর্ণধার। তাদের বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে কেমন হবে আগামীর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকই (৫০.৫৩ শতাংশ) শিশু। এই শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

শিশুদের শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হিসেবে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সারা দেশের ৬৪টি জেলাসহ এই একাডেমির মোট ৭০টি শাখা রয়েছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। প্রথমে এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল সেগুনবাগিচায়, পরে ১৯৭৭ সালে এটি স্থানান্তরিত হয় পুরনো হাইকোর্ট এলাকায়। প্রায় ৩.৬৯ একর ভূমির ওপর চারটি ভবনে শিশু একাডেমির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচি যেমন কুইজ, বিতর্ক, আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিশু একাডেমি কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া প্রতিবছর শিশুদের জন্য জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, মৌসুমি প্রতিযোগিতা ও আনন্দমেলার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের শিশুদের আন্তর্জাতিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং ভালো ফলের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করেন শিশু একাডেমির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ ছাড়া শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিভিন্ন দেশে শিশু সাংস্কৃতিক দল প্রেরণে সদা সচেষ্ট থাকেন তাঁরা। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক তথ্যসমৃদ্ধ একটি শিশু জাদুঘর পরিচালনা করে শিশু একাডেমি। এই জাদুঘরে একটি শিশু কিছুক্ষণ সময় কাটালে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কে অনেক তথ্য তাদের আয়ত্তে চলে আসবে। বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসসহ রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ঐতিহ্যগত আচার অনুষ্ঠান উদ্যাপনসহ শিশুদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে শিশু একাডেমি। বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার শিশুতোষ বইসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শিশু একাডেমির রয়েছে একটি সুবিশাল লাইব্রেরি। একসঙ্গে ২০০ শিশু এখানে বসে তাদের মেধার চর্চা করতে পারে। সব ধরনের শিশুতোষ বই এবং দেশি-বিদেশি লেখকদের বইয়ের সমারোহ এই লাইব্রেরিটিতে। ইন্টারনেট সুবিধাও রয়েছে। শিগগিরই এই লাইব্রেরিতে একটি ই-বুক কর্নার খোলার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটি বছরব্যাপী যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার ৬২টি বিষয়ের ওপর উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক ও জাতীয়—এ চারটি পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর সারা দেশের প্রায় তিন লাখ শিশু এখানে অংশগ্রহণ করে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে। বিতর্ক, জারিগান ও জ্ঞান জিজ্ঞাসা—এই তিনটি বিষয়ের ওপর প্রতিবছর বর্ষায় মৌসুমি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। মূলত শিশুদের কর্মব্যস্ত রাখা এবং তাদের মধ্যে দলগত সমঝোতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করা হয়। শিশুদের তৈরি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও হস্তশিল্প নিয়ে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় শিশু আনন্দমেলা। সপ্তাহব্যাপী এ মেলায় বিভিন্ন সংগঠনের শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকে। শিশু নাট্যচর্চায় দেশের বিভিন্ন শিশু সংগঠনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন। প্রতিবছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ১৮ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত একটি বইমেলার আয়োজন করা হয়। বইমেলায় আবার প্রতিদিন শিশুদের নিয়ে নানা আয়োজন চলে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে রয়েছে শিশুদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। চিত্রাঙ্কন, সংগীত, নৃত্য, নাট্যকলা, আবৃত্তি, উচ্চারণ ও সরব পাঠ, তবলা, গিটার, স্পোকেন ইংলিশ ও কম্পিউটার বিষয়ে এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দরিদ্র শিশুদের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। শিশু একাডেমির উদ্যোগে ‘শিশু’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা এবং শিশুদের উপযোগী বই প্রকাশ করা হয়। এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মোট ৮২০টি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে আছে শিশু বিশ্বকোষ ও ছোটদের বিজ্ঞানকোষ নামের দুটি কোষগ্রন্থ। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রয়েছে ২৫টি সিরিজ গ্রন্থমালা।

 

২০১৩ সালের অক্টোবরে পরিচালক হিসেবে যোগদান করে আমি এই একাডেমির প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করেছি এবং সেগুলো দূর করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি এই শিশু একাডেমিকে শিশুবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমি প্রথমেই এই শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ বন্ধ করেছি। পাশাপাশি শিশুদের উপযোগী করে কিডস কর্নার বাগান ও একাডেমিক ভবনকে নতুন করে সাজিয়েছি। কারণ শিশুরা সৌন্দর্যের পূজারি। তাদের উপযোগী শিক্ষণীয় পরিবেশ তৈরি না করলে তারা শিখতে পারবে না। আমাদের মূল ভবনের পাশের জাদুঘরটি আমি এসে দেখি একেবারে ভঙ্গুর অবস্থা। ভেতরের যে শিল্পকর্মগুলো আছে সেগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম। আমি সেগুলো ঠিক করেছি। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় শিশুদের জন্য এখন এমন সুন্দর একটি জাদুঘর উপহার দিতে পেরেছি। শেখ রাসেলের একটি ভাস্কর্যও আমরা তৈরি করেছি। জাদুঘরের পাশেই আছে শেখ রাসেল মুক্তমঞ্চ। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব কিছুর একটি ধারণা আমরা এই জাদুঘরের মাধ্যমে তুলে ধরেছি। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। এ জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। আমাদের লাইব্রেরিতে প্রায় ৪০ হাজার শিশুতোষ বই রয়েছে। লাইব্রেরির পরিবেশ শিশুবান্ধব করে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমাদের এখানে প্রতিবছর একটি বইমেলা হয়। ছয় বছর ধরে আমরা এ মেলার আয়োজন করছি। এখানে বিভিন্ন প্রকাশনার অনেক স্টল থাকে, যেখান থেকে শিশু ও বড়রা সুলভ মূল্যে বই কিনতে পারে। এ ছাড়া মেলায় প্রতিদিনই শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। আমি এখানে শিশু একাডেমি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেল তৈরি করেছি। অব্যবহূত কম্পিউটারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস ঠিক করার এখন আমাদের আলাদা একটি সেল আছে। আমরা এক বছর ধরে চেষ্টায় আছি একটি শিশু টেলিভিশন তৈরি করার জন্য। শিশুরা তাদের তৈরি নানা অনুষ্ঠান ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখানে দেখতে পাবে। আমরা একটি শিশু স্টুডিও তৈরি করেছি। আমাদের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশের সব জেলার অনুষ্ঠান নিয়ে আমরা এই টেলিভিশন অনুষ্ঠান সাজাব। আমরা প্রতিটি জেলায় একটি করে লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম কর্নার করব।

 

শিশু একাডেমির পাঁচটি বিভাগের মধ্যে লাইব্রেরি অন্যতম। আমাদের এই লাইব্রেরিতে এখন ৪০ হাজার বই আছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য এই বইয়ের সংখ্যাটাকে এক লাখে নিয়ে যাওয়া। আমাদের এখানে শুধু বই পড়া কিংবা বই বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা আসে না, তাদের আমরা এখানে অনেক কিছু শেখাচ্ছি। শিশুদের আরো বেশি তথ্যসমৃদ্ধ করতে আমরা লাইব্রেরিতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থাও রেখেছি, যাতে করে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে। এখনকার সমাজ শুধু জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নয়। এখনকার সমাজ জ্ঞান ও তথ্যভিত্তিক, সেই সঙ্গে আছে সৃজনশীলতা। আমরা শিশুদের সৃজনশীল করা এবং প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা খুদে লেখক কর্মশালা করছি। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আমরা লাইব্রেরিতে বই পড়ার ব্যবস্থা করছি। শিশুদের নিয়ে আমরা আয়োজন করি গল্প বলা প্রতিযোগিতা। সর্বশেষ আমরা ক্যান্সারে আক্রান্ত ৬০ শিশুকে নিয়ে গল্প বলা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি।


মন্তব্য