kalerkantho

গায়ে হলুদ

একালের গায়ে হলুদ

গায়ে হলুদের আয়োজনেও। লেগেছে ডেস্টিনেশনের হাওয়া। মানে দূরে কোথাও প্রকৃতির মাঝে গায়ে হলুদের আয়োজন। বিস্তারিত জানিয়েছেন জেনিফার ডি প্যারিস

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



একালের গায়ে হলুদ

মডেল : সারাকা শেরিনা ও ফজলে রাব্বি পোশাক : বিশ্বরঙ মেকওভার : পুতুল নন্দী, উজ্জ্বলা ভেন্যু কৃতজ্ঞতা : বিয়ে বাড়ি রেস্টুরেন্ট ফুলের গয়না : তারিশাস আলমিরাহ্ ছবি : আবু সুফিয়ান নিলাভ

আগের দিনে বাড়ির ছাদেই সেরে ফেলা হতো গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। শামিয়ানা টানিয়ে, সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া করে নিজেরা হৈচৈ করে হলুদ মাখিয়ে বর-কনেকে বিয়ের জন্য তৈরি করা হতো। গত কয়েক বছরে আবার গায়ে হলুদের জন্য রেস্তোরাঁর হল ভাড়া করার চল দেখা গেছে। তবে এই আয়োজনকে আরো স্মরণীয় করে রাখতে এখন যোগ হচ্ছে আরো অনেক কিছু।

ডেস্টিনেশন ওয়েডিং শব্দযুগল আমাদের দেশে কিছুটা নতুন হলেও পাশ্চাত্যে কিন্তু এটি অনেক দিন ধরেই প্রচলিত। ইদানীং দূরদেশে গিয়ে শুভ কাজ সারার ট্রেন্ড চালু হয়েছে বলিউডে। তার হাওয়া এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। বিদেশে না হোক, বিয়ের অনুষ্ঠান করতে পরিবারের সবাই মিলে শহরের বাইরে দূরে কোথাও ক্ষণিকের আস্তানা গেড়ে বসছেন অনেকে। শহরের অদূরে কোনো রিসোর্ট বা হোটেল ভাড়া করে সেখানেই চলছে মেহেদি, গায়ে হলুদ, এমনকি বিয়ের উৎস্পব। কয়েক দিনব্যাপী এই উৎস্পবগুলোতে সবাই একসঙ্গে থাকায় আনন্দের কমতি তো থাকেই না, পাশাপাশি বেড়ানোও হয়ে যায়।

যদি আপনি ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করতে চান তাহলে বেছে নিন এমন কোনো ভেন্যু, যা হবে আপনার শহর থেকে খানিকটা দূরে। তবে অতিথিদের কথা ভেবে বেশি দূরের কোনো ভেন্যু বেছে না নেওয়াই ভালো; তাহলে দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন অতিথিরা। চেষ্টা করুন অনুষ্ঠানের এক দিন আগে সবাই মিলে ভেন্যুতে পৌঁছতে, তাহলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও পাওয়া যাবে। অতিথির সংখ্যার ওপর বিচার করে ভেন্যু ঠিক করুন। যদি আপনার অনুষ্ঠানের কোনো নির্দিষ্ট থিম রাখতে চান, ভেন্যু ঠিক করার সময় সেটাও মাথায় রাখতে হবে।

সাজসজ্জা

গায়ে হলুদের ভেন্যুর সাজ যেমন এখন আর রঙিন কাপড় কিংবা ফুলে সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি প্রচলিত হলুদ রঙের পাশাপাশি অন্য রঙের ব্যবহারও হচ্ছে প্রচুর। গায়ে হলুদে হলুদ রঙের সাজ তো হবেই, পাশাপাশি যেকোনো উজ্জ্বল রং ব্যবহার করে অতিথিদের তাক লাগানোর সুযোগ ছাড়া চলবে না কিন্তু!

সব কিছুর আগে ভাবতে হবে আপনার অনুষ্ঠানের ভেন্যুটা কেমন। অনেক সময় কোনো হোটেল বা রিসোর্টের আঙিনায় আয়োজন করা হয় হলুদের অনুষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান দিনের বেলা হলে সবুজ ঘাস বিছানো আঙিনায় উজ্জ্বল গোলাপি, হালকা সবুজ, গেরুয়া, এমনকি ময়ূরনীল রঙের ব্যবহার দারুণ চোখে লাগবে। ইদানীং হলুদের মঞ্চ তৈরি না করে অনেকে বর-কনের বসার জন্য আরামদায়ক সোফার ব্যবস্থাও করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে বর-কনের আসনের চারপাশ নানাভাবে সাজানো যেতে পারে। পুরনো দিনের গ্রামের বিয়ের ঢঙে রঙিন কাগজের ব্যবহারও চোখে পড়ে এখন।

গায়ে হলুদ মানেই যেন গাঁদা ফুল! তবে নানা রঙের ফুল আর রঙিন কাপড়ের আবেদন এখন কম নয়। কাপড়ের বেলায় আগে যদিও সিল্কজাতীয় চকচকে কাপড়ের শামিয়ানার ব্যবহার দেখা যেত, এখন তার স্থান দখল করেছে ঝরঝরে নেট ও জর্জেট। সঙ্গে নানা ধরনের ঝালর কিংবা পাতার ব্যবহারও চোখে পড়ছে।

গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান অনেকে রাতে করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে আলোকসজ্জার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিন। সিরিজ বাতি দিয়ে বিল্ডিং সাজানোর প্রচলন শুরু হলেও আজকাল লোকজন ঝুঁকছে আধুনিক ধাঁচের আলোকসজ্জার দিকে।

আউটডোরে অনুষ্ঠান করলে সিরিজ বাতির মতোই লাইন ধরে সাজানো ছোট ছোট বাল্ব, কিংবা ল্যান্টার্ন হতে পারে ভালো অপশন। রাতের অনুষ্ঠানে সাধারণত উজ্জ্বল রংগুলো অবহেলিত থেকে যায়, তাই রঙিন ল্যান্টার্ন আপনার অনুষ্ঠানে বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করবে। আর অনুষ্ঠান যদি ভেতরে হয়, সে ক্ষেত্রে নানা ডিজাইনের ঝালর ও ঝাড়বাতির ব্যবহার হলুদের সাজে আনবে নতুন মাত্রা। রাতের অনুষ্ঠানে উজ্জ্বল রঙের পাশাপাশি জমকালো রং, যেমন—সোনালি, রুপালি ইত্যাদি দারুণ মানাবে।

খাবারদাবার ও গিফট

গায়ে হলুদের খাবারের তালিকায় তেহারি কিংবা বিরিয়ানি তো থাকেই, তবে অতিথিদের জন্য এই সময়টুকু আরেকটু মুখরোচক করতে আরো কিছু হালকা খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। তাই আজকাল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে চটপটি, ফুচকা, গরম গরম জিলাপি, ঝালমুুড়ির মতো মজাদার সব খাবারের ব্যবস্থাও দেখা যায়।

অনেকে অতিথিদের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ছোট ছোট উপহারের ব্যবস্থাও করেন।  বর-কনের ছবিসহ ছোট কার্ড, শোপিস কিংবা সাজানোর মতো কোনো জিনিস হতে পারে অতিথির জন্য উপহার।

গান-বাজনা, আরো যত আয়োজন

ডিজে ডেকে নাচ-গানের পাশাপাশি আজকাল বর-কনেকেও পছন্দের কোনো গানের ওপর পারফরম করতে দেখা যায়। এ ছাড়া বর-কনের   বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোনদের পারফরম্যান্স তো থাকেই। পারফরম করার বেলায় নাচের জায়গা কতটুকু হবে সেটা বুঝে নাচের দল ঠিক করুন, তাহলে ছোট জায়গায়ও নাচতে সমস্যা হবে না। প্রেমের বিয়ে হলে অনেকেই আবার বর-কনের প্রেমকাহিনি তুলে ধরেন পারফরম্যান্সের মাধ্যমে।

পারফরম্যান্স তো গেল, এবার ডিজের পালা। হলুদের অনুষ্ঠানে নাচ জমিয়ে তুলতে চাইলে ডিজেকে আগেই দিয়ে রাখুন পছন্দের গানের তালিকা। কম বয়সীদের পাশাপাশি মুরব্বিরাও যেন নাচে অংশ নিতে পারেন, সে রকম গান তালিকায় রাখলে ভালো হয়।

প্রিয়জনের হলুদের অনুষ্ঠানে একটু রং খেলা না হলে যেন জমেই না উৎস্পব। এ ক্ষেত্রে রং খেলার জন্য ভেন্যুর বাইরের আঙিনায় আয়োজন করা যায়। রং কেনার সময় গাঢ় রংগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, তাহলে রং খেলার পরও অতিথিদের সবাইকে দেখাবে উজ্জ্বল ও রঙিন। রং খেলার জন্য আলাদা পোশাক থাকলে আরো ভালো। বিয়ের মৌসুম আসতে আসতে শীত পড়ে যায়, এমন সময় রং খেলার পর গোসল করা অনেকের জন্যই বিড়ম্বনার। এ ক্ষেত্রে রঙের পরিবর্তে খেলতে পারেন নানা রঙের ফুলের পাপড়ি দিয়ে। অনেকেই মিউজিক্যাল চেয়ার, পিলো পাসিং, ট্রুথ অর ডেয়ারের মতো মজার মজার খেলার মাধ্যমে জমিয়ে রাখেন বিয়ের আগের এই দিনটি।

হলুদের গয়না ও পোশাক

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে হলুদের    সাজ-পোশাকেও। কনের কানে-গলায় গাঁদা ফুলের গয়না এবং হলদে সুতি শাড়ির দিন এখন আর নেই। আজকাল হলুদে অনেকেই শাড়ির পরিবর্তে লেহেঙ্গা, আনারকলির মতো পোশাক বেছে নিচ্ছেন। ছেলেদের ক্ষেত্রে আজও পাঞ্জাবির চল দেখা যায়, তবে ডিজাইনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বর-কনের পোশাকের রঙেও এখন দেখা যায় সবুজ, গোলাপি, লাল, এমনকি সাদার ব্যবহার। পুঁতি ও ফিতার ফুলের নকশা করা গয়নার পাশাপাশি অনেকে ইদানীং কুন্দন, মুক্তা কিংবা রুপার গয়নাও পরছেন। তাজা ফুলের কদর অবশ্য কমেনি, এ ক্ষেত্রে গাঁদা ফুলের পরিবর্তে লিলি, কসমস, এমনকি অর্কিডের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। হলুদের আগেই হয়ে যায় মেহেদি অনুষ্ঠান, তাই কনের হাতে মেহেদি তো থাকেই। মেহেদিতেও আজকাল দেখা যায় নানা রঙের ব্যবহার। হলুদের পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে অনেকে গ্লিটার দিয়েও নকশা করে নেন হাতের ওপর। হলুদের অনুষ্ঠানে চুল কিভাবে বাঁধবেন ভাবছেন? পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে সিদ্ধান্ত নিন চুলের স্টাইল কেমন হলে ভালো দেখাবে। হলুদের পোশাক, ভেন্যু ও থিম অনুযায়ী চিন্তাভাবনা করে চুলের স্টাইল নির্বাচন করা ভালো।

হলুদের অনুষ্ঠানের আনন্দ বাড়িয়ে তুলতে সবাই মিলে কাজ করুন। আজকাল যেহেতু বর ও কনে একসঙ্গেই হলুদ মাখতে বসেন, তাই আনন্দও হয় দ্বিগুণ।

 



মন্তব্য