kalerkantho


সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ

সংকট পিছু পিছু

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সংকট পিছু পিছু

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীনিবাসগুলোর এখন এমনই হাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংকটের শেষ নেই সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে। সংকট নিয়েই চলছে বৃহত্তর সিলেটে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান।

১৯৩৯ সালে সিলেটের প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টায় জমিদারবাড়িতে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নারী শিক্ষার প্রসারে তৎকালীন জমিদার বাবু ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার ইডেন কলেজের পর পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় মহিলা কলেজ এটি। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কলেজটি বেসরকারিভাবেই পরিচালিত হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে কলেজটিকে সরকারীকরণ হয়। কিন্তু ছাত্রী স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে ১৯৫০ সালে কলেজটিকে বেসরকারি ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার। তখন ছাত্রীসংখ্যা কমে আট-এ নেমে এসেছিল। দীর্ঘদিন পর ১৯৮০ সালে কলেজটি আবারও সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। চার একর জমির এই কলেজটি এখন আট হাজার ছাত্রীর কলরবে মুখর। দীর্ঘদিনের পথচলায় কলেজটি অনেক গুণীজনের জন্ম দিয়েছে। অথচ সময়ের ব্যবধানে সংকট-সীমাবদ্ধতায় এই কলেজ যেন এখন জীর্ণ জমিদারবাড়ির মতো। বাইরের অবয়ব থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই কতটা সংকট নিয়ে চলছে এর শিক্ষা কার্যক্রম।

শিক্ষক ও লোকবল সংকট : কলেজে ছয়টি বিষয়ে স্নাতক পাস কোর্স চালু আছে। ডিগ্রি পাস কোর্সের ক্ষেত্রে একজন করে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক এবং দুজন প্রভাষকসহ চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১৩ জন। বাকি ১১টি পদই শূন্য। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষক থাকার কথা ১২ জন করে। সে হিসেবে আটটি বিষয়ে ৯৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন ৪৪ জন। ৫২টি পদ সৃজনই হয়নি। বিজ্ঞান বিষয়ে পাঁচজন প্রদর্শক পদের মধ্যেও একটি পদ শূন্য। কলেজে কোনো বিষয়েই প্রিলিমিনারি কোর্স চালু নেই। তাই ডিগ্রি পাসে উত্তীর্ণদের এখানে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ নেই। কলেজের গ্রন্থাগারের জন্য একজন গ্রন্থাগারিকের পদ থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্য কর্মচারীদের ১১টি পদের বিপরীতে আছেন পাঁচজন। বাকি ছয়টিই শূন্য। কাজ চালাতে হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক লোক নিয়োগ দিয়ে।

বিভাগ চালুর দাবি : বিপুল চাহিদা থাকার পরও কলেজে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বিভাগ চালু হয়নি আজও। বিশেষ করে গণিত, পদার্থ, রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যার মতো বিষয়গুলোতে স্নাতক কোর্স নেই। এমনকি গার্হস্থ্য অর্থনীতির মতো বিষয়েও কোর্স চালু করা হয়নি। সাধারণত এই মানের কলেজগুলোতে প্রতিটি বিষয়ে ১৫০ আসন থাকলেও এখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৭৫টি আসন আছে।

একাডেমিক ভবন সংকট : কলেজে শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটেনি। এ ছাড়া বর্তমান ভবনগুলোর কয়েকটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাত্রীদের অভিযোগ, ‘বৃষ্টি হলে ছাদ থেকে পানি ঝরে বই-খাতা, জামা ভিজে যায়। টানা বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষ গুমোট হয়ে যায়।’ তারা আগামী বর্ষার আগেই শ্রেণিকক্ষ সংস্কারের দাবি জানায়। শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, কলেজের প্রতিটি ভবনের টয়লেটগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। পুরনো হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংস্কারের অভাবে একটিও ব্যবহারের উপযুক্ত নেই। নিরুপায় হয়ে ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত, অপরিচ্ছন্ন টয়লেটগুলো ব্যবহার করতে হয় ছাত্রীদের। খাবার পানির সংকটও তীব্র। সংকট সমাধানে গভীর নলকূপ স্থাপন জরুরি

আবাসিক হলে দ্বিগুণ ছাত্রী : সিলেটসহ পাশের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার জেলার মেয়েরা এই কলেজে পড়তে আসে। অথচ আবাসিক হলের সংখ্যা মাত্র তিনটি। সব মিলিয়ে আসনসংখ্যা মাত্র ৩৬০টি। সর্বশেষ ৩২টি আসনের বিপরীতে ২৪০টি আবেদন পড়েছে। টিভি রুমেও গাদাগাদি করে থাকছে ছাত্রীরা। হলগুলোর অবস্থাও করুণ, বিশেষ করে পুরনো হলটির। জায়গায় জায়গায় দেয়ালের আস্তর উঠে গেছে।  বেশির ভাগ জানালাই ভাঙা, সেগুলো আবার কাঠ বা টিন দিয়ে স্থায়ীভাবে আটকানো।

পরিবহনব্যবস্থা অপ্রতুল : কলেজের আট হাজার ছাত্রীর বিপরীতে আছে ৫১ আসনের একটি বড় বাস এবং ২৫ আসনের একটি মিনিবাস। পুরনো এসব বাস প্রায়ই বিকল থাকে। ফলে ছাত্রীদের যাতায়াত করতে হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। শহরতলির টুকেরবাজার এলাকা থেকে ক্লাস করতে আসেন সীমা বেগম। তিনি বলেন, ‘প্রথমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আম্বরখানা, তারপর সেখান থেকে রিকশায় অথবা বন্দরবাজারগামী অটোরিকশায় করে কলেজ পর্যন্ত আসতে হয়। অটোরিকশা পেতে দেরি হলে অনেক সময় কলেজে এসেও ক্লাস ধরা যায় না।’ ভুক্তভোগী ছাত্রীদের দাবি, অন্তত একটি বড় বাস ও দুটি মিনিবাস দেওয়া হোক। 

মাত্র দুই মাস আগে কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিয়েছেন অধ্যাপক মুহ. হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি। সংকটগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু, চালু থাকা স্নাতক বিষয়গুলোতে আসনসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।’



মন্তব্য