kalerkantho


সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন

১৮৬ কোটি টাকার কাজ ‘ভাগাভাগি’

সিলেট অফিস   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



১৮৬ কোটি টাকার কাজ ‘ভাগাভাগি’

সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন, মিছিল ও ধর্মঘট পালনের পর অবশেষে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কার্যাদেশ দিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ১৮৬ কোটি টাকার এ কাজটি পরস্পর যোগসাজশে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযাগ, সমঝোতার কারণে তিনটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেনি। এর সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারাও জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ১৩ কোটি টাকা বেশি দর দিয়ে কাজটি ওই তিন প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেট কার্যালয় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই কাজটি দেওয়া হয়েছে।

সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জ। সিলেট সদর থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯১ কিলোমিটার। দীর্ঘ এ সড়কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বৃহত্তর সিলেটের গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার উপজেলা ছাড়াও পাশের জেলা মৌলভীবাজারের বড়লেখা। এ ছাড়া জকিগঞ্জ ও সুতারকান্দি স্থলবন্দরের কারণে দিন-রাত শত শত পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে এ সড়ক দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ আঞ্চলিক সড়কটির অবস্থা বেহাল। খানাখন্দে ভরা সড়কটির ৬৬ কিলোমিটার অংশের অবস্থা বেশি নাজুক। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন ভুক্তভোগীরা। এ দাবিতে পরিবহন ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল ও আন্দোলন করেছে স্থানীয়রা।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর শেষ পর্যন্ত সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। এর জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১৭৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর সড়কটির সংস্কার ও উন্নয়নকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল একই বছরের ২৩ অক্টোবর। সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলাসহ আটটি স্থান থেকে দরপত্র কেনার ব্যবস্থা রাখা হয়। তাতে ১০টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র তিনটি। দরপত্র জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা, ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ও শামীম এন্টারপ্রাইজ। শামীম এন্টারপ্রাইজ ছাড়া বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান সিলেটের স্থানীয়। এ অবস্থায় তিনটি প্রতিষ্ঠানকেই প্রাথমিক ব্যয়ের চেয়ে ১৩ কোটি টাকা বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। শিগগিরই এ ব্যাপারে চুক্তি সম্পাদনের কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মাত্র তিনটি দরপত্র জমা পড়া নিয়ে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রথম বৈঠকে কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তুললেও পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন তাঁরা। এরপর তিনটি প্রতিষ্ঠানের এ জোটকে কাজটি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক উন্নয়নের কাজটি ১৮৬ কোটি টাকায় তিনটি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা, ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ও শামীম এন্টারপ্রাইজ। গত ৭ ফেব্রুয়ারি তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, আগে থেকেই সমঝোতা হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁরা দরপত্রে অংশ নেননি। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, দরপত্র বিক্রির শুরুর আগে থেকেই আমরা জানতে পারি পুরো বিষয়টি লোক দেখানো হবে। কিন্তু কারা কাজটি পাবে তা সমঝোতার মাধ্যমে আগেই ঠিক করে রাখা আছে। এ সমঝোতা প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাও সম্পৃক্ত। সুতরাং আমরা দরপত্র কিনেও আর জমা দিইনি।

তাঁরা জানান, এ সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের মধ্যে যোগাযোগের কাজটি করেন ‘মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লুৎফর রহমান ও মেসার্স জামিল ইকবাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জাহেদ ইকবাল। এর মধ্যে জামিল ইকবাল হাওরে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় পলাতক আসামি। সড়ক ও জনপথ বিভাগসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, মেসার্স জামিল ইকবাল বেনামে এ জোটের সঙ্গে যুক্ত আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ঠিকাদার জানান, চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের ব্রাদার্সের প্রতিনিধিকে দরপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়।

এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সড়ক ও জনপথ সিলেট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে।’ দরপত্র জমা দিতে বাধা প্রদানের অভিযোগ সঠিক নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম কিছু আমার জানা নেই।’ মাত্র তিনটি দরপত্র জমা পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বড় কাজগুলো করার সামর্থ্য শুধু ৮-১০টির মতো প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। সেটা হয়তো কারণ হতে পারে।’

আনুমানিক ব্যয়ের চেয়ে ১৩ কোটি টাকা বেশিতে কার্যাদেশ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে ১৭৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছিল; কিন্তু এখন ২০১৮ সাল চলছে। এ সময়ে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। পাথরেরও দাম বেড়েছে। এসব বিবেচনায় ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।’ প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর হলেও এর আগেই সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ হবে বলে এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


মন্তব্য