kalerkantho


হবিগঞ্জ

মরে যাচ্ছে সুতাং

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একসময় সারা বছর বড় বড় যাত্রী ও মালবাহী নৌকা চলত সুতাং নদীতে। নদীর পানিতে লোকজন ফসল ফলাত। নদীতে মিলত নানা মাছ। লাখাই উপজেলার বেলেশ্বরী এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুণ্যস্নান করত। এখন আর সেই চিত্র নেই। যৌবন হারিয়েছে নদীটি। পানি দূষিত হয়ে কালো রং ধারণ করেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদী মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। পুণ্যস্নানও হয়নি কয়েক বছর। নদীর অনেক এলাকা দখল হয়ে গেছে। সুতাংয়ের এই পরিণতির অন্যতম কারণ হবিগঞ্জ সদর উপজেলার অলিপুর ও মাধবপুর উপজেলায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন। শিল্পবর্জ্যের প্রভাবে নদীটি আজ বেহাল।

সোমবার বিকেলে লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান সুতাং নদীর বুল্লা অংশ পরিদর্শন করেন। তিনি নদীর পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পেয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শিল্পবর্জ্যের দূষণ থেকে সুতাংকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক তাফাজ্জল সোহেল জানান, অলিপুরে দুটি কারখানার বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে সুতাং নদী। কৃষিকাজে সেচব্যবস্থার নামে ‘শৈলজুড়া’ খালটি জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালে পুনঃখনন করে ওই দুই কারখানার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। এতে কারখানা দুটির বর্জ্য সহজেই খালের মাধ্যমে সুতাং নদীতে ফেলা হচ্ছে। আর এই শিল্পবর্জ্যের দূষণে নদীতে তেমন মাছই পাওয়া যায় না। নদীর পানি ব্যবহারকারীরা পড়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। মারা যাচ্ছে হাঁস, মুরগি, গবাদিপশু। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগসহ নানা অসুখে। মাঠে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সোহেল জানান, সুতাং নদীর চুনারুঘাট অংশে তিনটি সিলিকা বালুমহাল থেকে সরকার বছরে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। লাখাই উপজেলার বোরো ধানের প্রধান সেচের উৎস এই নদী। অন্যান্য এলাকায়ও সেচের কাজে ব্যবহৃত হয় এর পানি।

শায়েস্তাগঞ্জ ও মাধবপুর উপজেলায় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার বর্জ্য সুতাং নদীকে দূষিত করে চলেছে। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের আবেদন ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন হচ্ছে নিয়মিতই। কিন্তু দূষণ রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বর্ষাকালে দূষণের মাত্রা ও প্রভাব চোখে না পড়লেও শুষ্ক মৌসুমে তা স্পষ্ট হয়। শুষ্ক মৌসুমে নদীর জল গাঢ় কালো রং ধারণ করে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে দূষণে নদীটি দেশি মাছসহ শামুক, কাঁকড়া, বিভিন্ন জলজপ্রাণিশূন্য হয়ে পড়ছে। এর পানি সেচ ও গৃহস্থালি কাজের অনুপযোগী। দূষণে লাখাইয়ের পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নদী ও নামের উত্পত্তি : সুতাং নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উত্পত্তি হয়ে চুনারুঘাট উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। পরে উপজেলার সুতাং বাজারের উত্তর দিক হয়ে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাড় ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে। এরপর শায়েস্তাগঞ্জের সুতাং বাজার ঘেঁষে বেলেশ্বরী এলাকা হয়ে লাখাই উপজেলার মধ্য দিয়ে ঝনঝনি নামে মেঘনার শাখা নদীতে মিশেছে। একসময় সুতাং নদীর পাড়ে বাস ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাদের মতে, নদীটি সুতার মতো আঁকাবাঁকা হয়ে বয়ে চলার কারণে এর নাম সুতাং। শত শত বছর আগের নদী এটি। কিংবদন্তি আছে, শায়েস্তা খাঁ বহু দেশ বিজয়ের উদ্দেশে বারবার সেনা পাঠাতেন সুতাং নদী দিয়ে। সেনারা সুতাংয়ে এসে রাত যাপন করত। তখন যুদ্ধে নিহত সেনাদের লাশ সুতাংয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। সুতাং থেকে বেশ কয়েকটি ছড়া (খাল) তৈরি হয়েছে। যেমন তেলখা, গাদা, দেউন্দি ও বদরগাজী ছড়া। এসব ছড়ার সাদা বালু এ অঞ্চলের মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণের কাজে লাগে। ছড়ার বালু বেচে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে।

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জিএম হাসান মো. মঞ্জুরুল হক জানান, তাঁর এখান থেকে কোনো বর্জ্য নদীতে যায় না। তাঁদের বিশাল ইটিপি প্লান্ট (তরল বর্জ্য শোধনাগার) আছে। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের লোকজন ও সাংবাদিকরা তাঁদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তারেক মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, নদী দূষণের ব্যাপারটা তাঁরা জেনেছেন। শিগগিরই ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।



মন্তব্য