kalerkantho


২২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত নির্দোষ অমর অবশেষে কারামুক্ত

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১২ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



২২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত নির্দোষ অমর অবশেষে কারামুক্ত

মুক্তির পর কারাফটকে গতকাল গরিব জেলে অমর দাসকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নেজাম উদ্দিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

২০০৪ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-৭) অভিযানে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন স্বপন দাস ওরফে লেংড়া স্বপন নামে এক সন্ত্রাসী। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তিনি নিজের নাম ও ঠিকানা দেন চাচাতো ভাই অমর দাসের। আসামির দেওয়া ভুল নাম ঠিকানা ধরতে পারেননি অস্ত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও। শেষে পর্যন্ত অস্ত্র মামলার বিচার শেষে আদালত আসামিকে ২২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সেই সাজা পরোয়ানা তামিল করার পরই পুলিশ বুঝতে পারে, মূল অপরাধী লাপাত্তা, আর কারাগারে গেছেন নির্দোষ অমর।

সেই নির্দোষ অমরকে কারাগার থেকে বের করে আনতে আইনি লড়াই চালিয়েছেন সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নেজাম উদ্দিন। এ থানার পুলিশই অমরকে সাজা পরোয়ানামূলে গ্রেপ্তার করেছিল। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে গতকাল রবিবার দুপুরে অমর বের হয়েছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। তখন কারাফটকে অমরকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নেজাম উদ্দিন।

রবিবার দুপুরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাফটকে গিয়ে দেখা গেছে, মাঝবয়সী রোগাক্রান্ত লাল শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি কারাফটক থেকে বেরিয়ে আসছেন। সঙ্গে সঙ্গেই বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে অমরের কন্যাসন্তান। অমরের এক বোনও তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রীর চোখেও পানি। এরই মধ্যে অমরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হন সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নেজাম উদ্দিন। তিনি ফুলের তোড়া দিয়ে অমরকে বরণ করে নেন।

কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেলে অমর কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমি নির্দোষ, কখনো অস্ত্র হাতে গ্রেপ্তার হইনি। অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল স্বপন দাস। সেই আমার নাম ঠিকানা দিয়েছিল মামলায়। কিন্তু পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা সেই ঠিকানা

যাচাই-বাছাই না করেই আমার নামে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ফলে আদালতে বিচার শেষে আমার ২২ বছরের সাজা হয়। আমি গ্রেপ্তার হওয়ার পরই জানতে পারি, আমি নাকি অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। গ্রেপ্তারের পর প্রায় পাঁচ মাস কারাগারে ছিলাম। দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে

আদালত-জেল দৌড়ঝাঁপ করতে করতে।’

তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো কারাগার থেকে বের হতেই পারতাম না, যদি আমাকে সদরঘাট থানার ওসি নিজাম স্যার সাহায্য সহযোগিতা না করতেন।’ পুলিশ কেন আপনাকে সাহায্য করল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নির্দোষ, অসহায়। গ্রেপ্তারের পরই আমি ওসি স্যারকে সব খুলে বলেছিলাম। তখনই তিনি আমাকে বলেছিলেন, তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন। এর পর যদি আমি নির্দোষ সেটা তিনি বুঝতে পারেন, তাহলে আমাকে সাহায্য করবেন। পরে ওসি স্যার কথা রেখেছেন। কারাগারে এসে আমাকে নিয়মিত দেখেছেন, টাকা পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে যাওয়ার খরচও দিয়েছেন ওসি স্যার।’

জেলে অমর আরও বলেন, ‘আগে পুলিশ সম্পর্কে মনে খারাপ ধারণা ছিল, এখন সেই ধারণা কেটে গেছে। ওসি স্যার আমার জন্য যা করেছেন, তা আমি কখনোই ভুলতে পারব না।’ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বিচার চান কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি সঠিকভাবে মামলার তদন্ত করতেন, তাহলে আমার এই দুর্ভোগ হতো না, আমাকে কারাগারে যেতে হতো না। তাই আমি ২০০৪ সালে দায়ের করা অস্ত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বিচার চাই।’

ওসি নিজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অস্ত্র মামলার সাজা পরোয়ানা তামিল করার পরই বুঝতে পারি, মূল আসামি নন অমর। পরবর্তীতে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারকৃত মূল আসামি স্বপন দাসকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। ধৃত স্বপন নিজের অপরাধ স্বীকার ও অমরের নাম ঠিকানা ভুল দেওয়ার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। এর পরই অমরকে কারাগার থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আদালতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করা হয়। অমর দরিদ্র জেলে। মানবিক কারণে তাঁর পাশে ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত স্বপন দাস চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার ব্রাহ্মণডেঙা গ্রামের মৃত দেবেন্দ্র জলদাসের ছেলে। এই স্বপন অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর চাচাতো ভাই অমরের নাম ঠিকানা নিজের বলে চালিয়ে দেন।’

ঘটনার বিষয়ে ওসি নিজাম আরও বলেন, ‘সাজা পরোয়ানামূলে গত ৯ মে অমরকে পতেঙ্গা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অমর নিজেকে নির্দোষ দাবি করার বিষয়টি আদালতে অবহিত করা হয়। এরপর আদালতের অনুমতিক্রমে গত ১৩ আগস্ট স্বপন দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে স্বপন দাস নিজের অপরাধ স্বীকার করে। এর পর স্বপনের বিরুদ্ধে প্রতারণা মামলা দায়ের করা হয়।’

পরবর্তীতে অমর দাস ২২ বছরের সাজা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন উচ্চ আদালতে রিট করেন। রিট শুনানির পর আদালত নিরপরাধ অমর দাসকে ২২ বছরের সাজা থেকে মুক্তির আদেশ দেন। সেই আদেশের কপি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছার পরই অমর মুক্তি পেলেন।



মন্তব্য