kalerkantho

দুর্গোৎসবে কঠোর নিরাপত্তা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



দুর্গোৎসবে কঠোর নিরাপত্তা

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মজুমদারখীলে পূজামণ্ডপে চলছে প্রতিমার সাজসজ্জা। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ১৫ অক্টোবর শুরু হওয়া হিন্দু সমপ্রদায়ের শারদীয় দুর্গাপূজায় নাশকতা চালাতে পারে দুর্বৃত্তরা-এমন আশঙ্কা সামনে রেখে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম নগরের প্রায় তিন হাজার পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ। জাতীয় নির্বাচনের এ বছরে অনুষ্ঠিত দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ফেসবুক ব্যবহার করে যাতে কোনো মহল গুজব ছড়াতে না পারে, সেই বিষয়টিও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলার পূজা প্রস্তুতির বিষয়ে মতবিনিময় সভা করেন। সভায় তিনি রেঞ্জের প্রায় দুই হাজার ৭৬০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান নগরের ২৫৫টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিশ্চিত করার বিষয়টি জানিয়েছেন। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম রেঞ্জের পূজা উদযাপন পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা। এতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলার পুলিশ সুপার এবং সব জেলার পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি-সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাঁরা নিজ নিজ জেলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সভায় অবহিত করেন।

পরে ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘দুর্গাপূজা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি নেই। তবে নির্বাচনের বছর হওয়ায় কেউ যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে, সেই বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে এবং পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদেরও এই বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুষকৃতকারী বা কোনো অপশক্তি যাতে কোনো ধরনের অঘটন ঘটিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করতে না পারে, সেই বিষয়ে সব প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ।’

সভায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা বলেন, ‘রেঞ্জের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় সর্বাধিক এক হাজার ৫১০টি পূজামণ্ডপ আছে। এর বাইরে ছোট মণ্ডপ আছে আরো ৩০০টির মতো। সব মণ্ডপের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষ কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে ফেসবুকে নজরদারি চলছে। যারা ফেসবুক থেকে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করবে, তাদের আইনের আওতায় আনতে করণীয় নির্ধারণ ও দ্রুত ওই সব ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য পেতে পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।’

সভায় চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত বলেন, ‘অন্য বছরের পূজা আয়োজনের চেয়ে এ বছরের পূজা আয়োজনে কিছুটা ভিন্নতা আছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ কারণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমরা আশা করব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেবে।’

চাঁদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের প্রতিনিধি বলেন, ‘প্রতিমা মণ্ডপে নেওয়া থেকে চারদিনের উৎসব শেষে বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। গুজব ছড়িয়ে যাতে প্রতিমা ভাঙচুর করতে না পারে, সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

একইভাবে কক্সবাজার থেকে আসা প্রতিনিধি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিমা বিসর্জনের বড় উৎসব হয় কক্সবাজার সৈকতে। সেখানে সরকারের মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকেন। তবে অতীতে কখনো সেখানে প্রতিমা বিসর্জন বা পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো সামপ্রদায়িক ঘটনা ঘটেনি। এবারও এমন ঘটনার আশঙ্কা করছি না।’ তিনি জানান, এবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

জবাবে ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপনের জন্য পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জেও সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ যেন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা ফেসবুকে গুজব ছড়াতে না পারে, সেই লক্ষ্যে

পুলিশ কাজ করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ধর্ম যাঁর যাঁর, উৎসব সবার। এ লক্ষ্যে পূজায় সব সমপ্রদায়ের লোকজন উৎসবে যোগ দেবেন। কিন্তু কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।’

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে আজান ও নামাজের সময় মাইক বন্ধ রাখা, প্রতিমা মণ্ডপে নেওয়া থেকে বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তায় করণীয়, পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই পুলিশের মনিটরিং সেলে যোগাযোগ করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কানি বা গুজবমূলক কিছু লক্ষ করলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে অবহিত করা, সম্ভব হলে সব মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা লাগানো, জেনারেটরের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা এবং নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদারের মতো বিষয়গুলো রয়েছে।

এ ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় সব মণ্ডপে পুলিশ, আনসার, গ্রাম-পুলিশ নিয়োজিত থাকা, সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বপালনসহ পাঁচ স্তরের পুলিশি নিরাপত্তার বিষয়ে সভায় অবহিত করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরের ২৫৫টি মণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় আড়াই হাজার ফোর্স মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান। মহানগরেও নিরাপত্তার স্বার্থে সব মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা, আলোকসজ্জা এবং বিসর্জনের দিন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

দুর্গাপূজায় চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মো.মাহাবুবর রহমান।

তিনি জানিয়েছেন, এবার নগরে ২৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। এ সব পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ, র্যাব, আনসার মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া গুজব ছড়ানো ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার।



মন্তব্য