kalerkantho


বে টার্মিনালে জুন থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি!

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বে টার্মিনালে জুন থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি!

নগরের পতেঙ্গায় বঙ্গোপসাগর তীর ঘেঁষা জমিতে অবশেষে শুরু হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘বে টার্মিনাল’ নির্মাণের কাজ। এ জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ৬৮ একর জমি ইতোমধ্যে বুঝে পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই জমি পেতে বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

প্রথম ধাপে ৬৮ একর জমিতে নির্মিত হবে একাধিক ইয়ার্ড। চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর বর্তমানে চালু থাকা এফসিএল কন্টেইনার বা কন্টেইনার খুলে খোলা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্থানান্তর করে বে টার্মিনালের ইয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। আগামী বছরের জুন থেকেই বে টার্মিনাল থেকে এফসিএল পণ্য সরবরাহ নিতে পারবেন আমদানিকারকরা।

জানতে চাইলে, চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী বছরের মাঝামাঝি থেকে এফসিএল কন্টেইনার বে টার্মিনাল থেকে সরবরাহ দেওয়া হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। জমি বুঝে পাওয়ার পরপরই আমরা সেখানে ইয়ার্ড নির্মাণকাজ শুরু করব।’

তাঁর মতে, এফসিএল কন্টেইনার ভর্তি পণ্য বে টার্মিনাল থেকে সরবরাহ করতে পারলে দিনে অন্তত ১৬ হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্দরের ভেতর প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হবে। ১৬ হাজার ট্রাক, সাথে চালক-সহকারী এবং কর্মরত শ্রমিকদের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে থেকে সরাতে পারলে বন্দরের বিশাল স্থান খালি হবে যা আমাদের দক্ষতাকে এখনকার চেয়ে অনেক গুণ বাড়াবে। আর বন্দরভিত্তিক এসব ট্রাকের কারণে নগরবাসীকে আর যানজট সইতে হবে না। কারণ এসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য নিয়ে টোল রোড দিয়ে সরাসরি মহাসড়কে চলে যেতে পারবে।

বন্দরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বার্থ অপারেটর, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও টার্মিনাল অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, ‘বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সবচে ভালো পন্থা হচ্ছে এই বে টার্মিনাল। বন্দরের কি গ্যান্ট্রি ক্রেন বাড়ানোর চেয়েও ভালো হতো যদি এই টার্মিনাল দ্রুত চালু করা যেতো। কারণ কি গ্যান্ট্রি ক্রেন যোগ হলেও ইয়ার্ডের পেছনে প্রচুর খালি স্থান না থাকায় খুব বেশি সুফল মিলবে না।’

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত পতেঙ্গা থেকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছন হয়ে রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরতীর ঘেঁষে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় এই বে টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারার বিশাল সুবিধা কাজে লাগাতেই ২০১৪ সালে এই উদ্যোগ শুরু হয়। ৯০৭ একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালে কিন্তু জমি বুঝে নিতে বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চার বছর সময় লাগল বন্দরের। আজ মঙ্গলবার ৬৮ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা দিচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে। নৌ  পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের উপস্থিতিতে এই টাকা হস্তান্তর করা হবে।

জানা গেছে, ৯০৭ একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ে তোলা হলেও পর্যায়ক্রমে সাগর থেকে পাওয়া আরও কয়েক হাজার একর জমি এই বে টার্মিনালে যুক্ত হবে পর্যায়ক্রমে। ফলে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বর্তমান আকারের চেয়ে অনেক বড় হবে এই বে টার্মিনাল।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে সর্বোচ্চ ১৮০০ একক ধারণক্ষমতার কন্টেইনারবাহী জাহাজ ঢুকতে পারে আর বে টার্মিনালে একসাথে ৫ হাজার একক কন্টেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। বন্দরে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ার সুযোগ পায় কিন্তু অবস্থানগত সুবিধার কারণে বে টার্মিনালে দিনে-রাতে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে ও ছেড়ে যেতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯টি জাহাজ ভিড়তে পারে আর বে টার্মিনালে একসাথে ৩০-৩৫টি জাহাজ ভিড়তে পারবে।

শুধু তাই নয়, বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পৌঁছতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে হয় এর বিপরীতে বে টার্মিনাল জেটিতে ভিড়তে লাগবে মাত্র এক কিলোমিটার। এছাড়াও বে টার্মিনালে পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে চলে যেতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়তন ৩৩০ একর আর বে টার্মিনালের আয়তন তিনগুণ বড় ৯০৭ একর। বন্দর জেটিতে সাড়ে নয় মিটার এবং ১৯০ মিটারের বড় জাহাজ ঢুকতে পারে না। বহির্নোঙর থেকে পণ্য লাইটার বা স্থানান্তর করে ছোট জাহাজে জেটিতে আনতে হয়। কিন্তু ১০-১২ মিটার গভীরতার জাহাজ সরাসরি বে টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল বলেন, ‘অবস্থানগত কারণে বিশাল সম্ভাবনাময় এই বে টার্মিনাল। কন্টেইনার, খোলা ও ট্যাংকার সব ধরনের জাহাজ জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর না করে সরাসরিই বে টার্মিনালে ভিড়তে পারবে। পণ্য আমদানিতে প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও জেটি না থাকায় সক্ষমতা ফুরিয়ে যাচ্ছে। সেই চাপ সামাল দিতে দ্রুত এই বে টার্মিনাল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ যত দ্রুত এই টার্মিনালে জেটি নির্মাণ করা যাবে অন্য কোনো স্থানে সেভাবে সম্ভব নয়।’

 

 



মন্তব্য