kalerkantho


বহিরাগতদের দাপটে সাগরে ইলিশ ধরতে পারছেন না স্থানীয়রা

সীতাকুণ্ডে শতাধিক জেলে বেকার

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



উপজেলার ভাটিয়ারী সাগর উপকূল এলাকা থেকে ইলিশ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে একদল বহিরাগত মত্স্য ব্যবসায়ী। তাঁরা স্থানীয় জেলেদের মাছ শিকারে বাধা দিচ্ছেন। এ নিয়ে মত্স্যজীবীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ করা হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। ফলে ইলিশের মৌসুমেও বেকার এখানকার শতাধিক জেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী মৌজার সাগর উপকূলীয় সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাটিয়ারী ও সলিমপুর এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। এতে নিজ এলাকায় ভাটিয়ারীর জেলেরা মাছ শিকার বন্ধ রাখলেও ওই সুযোগ নিয়ে সেখান থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছেন বহিরাগত মত্স্য ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে ভাটিয়ারীর জেলে সম্প্রদায় উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করলে সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. কামরুজ্জামান ওই এলাকা পরিমাপ করে তুলাতলী মৌজার সীমানা নির্ধারণ করে দেন। এ সময় তিনি যাঁরা যে এলাকার জেলে তাঁদেরকে সেখানে মাছ ধরার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর নির্দেশের তোয়াক্কা না করে সেখানে মাছ ধরতে থাকা জেলেদের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়।

সম্প্রতি সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. ইফতেখার হাসান, ওসি (তদন্ত) মো. মোজাম্মেল হক, ভাটিয়ারী ও সলিমপুরের ইউপি চেয়ারম্যান এবং উভয় এলাকার জেলে ও মত্স্য ব্যবসায়ীদের নিয়ে সাগরপাড়ে বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিন্তু যেসব বহিরাগত জেলে ও মত্স্য ব্যবসায়ী এতদিন ভাটিয়ারী এলাকায় অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকার করে আসছিলেন তাঁরা এ এলাকা ছাড়তে রাজি নন। ফলে মিটিং ভেস্তে যায়। পরে পুলিশও সবাইকে নিজ এলাকার মধ্যে মাছ ধরার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এরপরও বহিরাগতরা ভাটিয়ারী তুলাতলীর সাগরে মাছ ধরতে থাকায় উত্তেজনা রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে ভাটিয়ারী মির্জাগর জেলেপাড়ার বাসিন্দা ভানু জলদাস বলেন, ‘সাগরে জেলেরা নিজ নিজ এলাকায় মাছ ধরে থাকে। সেই হিসেবে আমরা আমাদের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী মৌজায় মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু এখানে বহিরাগত কিছু জেলে ও অপেশাদার মত্স্য ব্যবসায়ী অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকার করছে। তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে অনুমোদনবিহীন বেহুন্দি জাল বসিয়ে মাছ শিকার করছে। আমরা মাছ ধরতে গেলে উল্টো হামলা চালাচ্ছে। কেড়ে নিচ্ছে নৌকা, জাল। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও কেউ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে নিজ এলাকায় মাছ ধরার সুযোগ না পেয়ে আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। ইলিশের মৌসুমেও দুর্দিন চলছে আমাদের পরিবারে।’

এ পাড়ার জেলে সর্দার বাদল জলদাশ বলেন, ‘ওরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এলাকায় অনুপ্রবেশ করে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখন এসি ল্যান্ড সরকারিভাবে আমাদের সীমানা বুঝিয়ে দিয়ে তাদেরকে এখানে মাছ না ধরতে নিষেধ করেছেন। সীতাকুণ্ডের ওসিও তাদেরকে আমাদের এলাকা থেকে সরে গিয়ে নিজ এলাকায় মাছ ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা কারো কথা শুনতে চায় না। এছাড়া তারা নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে মাছ শিকার করায় সাগরের ছোট মাছও ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু আমরা এসবের প্রতিকার পাচ্ছি না।’

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ওই এলাকার ইউপি সদস্য মো. মাঈনউদ্দিন বলেন, ‘কিছু বহিরাগত মাছ ব্যবসায়ী অন্য এলাকার জেলেদের ব্যবহার করে এখান থেকে মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ায় আমার এলাকার জেলেরা খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। এ নিয়ে প্রশাসনের সকল দপ্তরে অবগত করা হলেও সুফল মিলছে না।’

ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘তুলাতলী মৌজা ভাটিয়ারী ইউনিয়নের অন্তর্গত। নিয়ম অনুযায়ী এখান থেকে ভাটিয়ারীর জেলেরাই মাছ শিকার করতে পারে। এতদিন সীমানা নির্ধারণ করা না হওয়ায় সলিমপুর এবং বাইরের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা এখান থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে যেত। এখন সরকারিভাবে ভূমি অফিস সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়াার পর তাদেরকে নিজ এলাকায় গিয়ে মাছ শিকার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা এখান থেকে মাছ ধরছে। আমরা বৈঠকে বসার পরও তারা মানছে না।’

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভাটিয়ারী ও সলিমপুরের জেলেদের মধ্যে অশান্তি বিরাজ করছে। এ নিয়ে আমিও বৈঠক করেছি। কিন্তু সলিমপুরের জেলেরা ওই জায়গাটি তাদের মাছ ধরার সীমানা দাবি করছে। তাই মীমাংসা হচ্ছে না।’

সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. ইফতেখার হাসান বলেন, ‘সলিমপুর ও বাইরের এলাকার কিছু মাছ ব্যবসায়ী এতদিন ভাটিয়ারীর তুলাতলী মৌজা থেকে মাছ শিকার করত। এখন সীমানা নির্ধারণের পর জানা গেছে জায়গাটি ভাটিয়ারীর। সরকারিভাবে এ জায়গা ভাটিয়ারীর বলে উল্লেখ করায় এখানে ভাটিয়ারীর জেলেরা মাছ ধরবে এটাই নিয়ম। কিন্তু সলিমপুরে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মাছ ব্যবসায়ী এসব কথা মানতে রাজি নয়। এ কারণে সেখানে অশান্তি লেগে আছে। তারা ইউএনও ও পুলিশের নির্দেশ মানছে না। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 



মন্তব্য