kalerkantho


মাতামুহুরী ট্র্যাজেডি

মৃত্যুর আগে বন্ধুদের উদ্দেশে খুদে ফুটবলারের হৃদয়ছোঁয়া চিঠি

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মৃত্যুর আগে বন্ধুদের উদ্দেশে খুদে ফুটবলারের হৃদয়ছোঁয়া চিঠি

পিইসি, জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস প্রাপ্তির পর ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায়ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় চট্টগ্রাম শহরের নামকরা একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল আমিনুল হোসাইন এমশাদ। এ জন্য চকবাজারে বাসাও ভাড়া নেন তার বাবা আনোয়ার হোসাইন। সেই বাসায় উঠার কথা ছিল গতকাল সোমবার। কিন্তু দীর্ঘদিনের সহপাঠীদের ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে যেতে হবে, এই কষ্ট মেনে নিতে পারছিল না চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র এমশাদ। তাই ১৪ জুলাই সকালে সহপাঠী বন্ধুদের উদ্দেশে নিজের খাতার বেদনাবিধূর একটি চিঠি লিখে রাখে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া সেই চিঠি খুঁজে পেয়ে মা নার্গিস আক্তার, বাবা আনোয়ারসহ পরিবার সদস্যরা ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন ক্ষণে ক্ষণে। গতকাল সোমবার এমশাদের বাড়ির উঠানে গেলে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। সবাই সেই চিঠি পড়ে চোখের জল ফেলছেন।

গত ১৪ জুলাই বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মাতামুহুরী ট্র্যাজেডিতে মারা যাওয়া চকরিয়া গ্রামার স্কুলের শিক্ষার্থী আমিনুল হোসাইন এমশাদ সহপাঠী বন্ধুদের উদ্দেশে চিঠিতে লেখে, ‘জানি না হায়াত কত দিন আছে। হয়ত আজ আছি কাল নেই। তবু যতদিন বাঁচব তোদের সবাইকে সাথে নিয়ে বাঁচব। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১২টি বছর তোদের সাথে আছি। হয়ত আর দেখা হবে না। কিন্তু আমি তোদের কোনো দিন ভুলব না। এসএসসির পরেও তোদের সাথে যোগাযোগ থাকবে। তোরাও আমার সাথে যোগাযোগ রাখিস। তা না হলে খুব একা হয়ে যাব। ছেলেদের মধ্যে ১ম বেঞ্চের ৪ জন আমার বয়ফ্রেন্ড। আর গার্লফ্রেন্ডের মধ্যে রিতু। কোথাও চলে গেলে যাই হোক না কেন যোগাযোগ বন্ধ করিস না। ১২ বছর তোদের সাথে অনেক ঝগড়া করেছি, খুব মজা পাইছি। ১২ বছর তোদের সাথে খুব সুন্দরভাবে কাটিয়েছি। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো আমার জীবনে আর কোনোদিন আসবে না। আমি নিয়মিত নামাজ ও কুরআন পড়ি। আর চেষ্টা করব তা ধরে রাখার জন্য। এসএসসির পরে তোদের জন্য একটা বার্থ ডে ট্রিট থাকবে, চিন্তা করিস না।’ মর্মস্পর্শী এই চিঠিটি দেখে ইমরানুল হোসাইন নামে একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘আসলে যারা মারা যায় তারা কেন জানি আগে থেকেই মৃত্যুর বিষয়ে জানতে পারে। এমশাদের এই চিঠিটি এরই নিদর্শন বহন করে!!!’

চকরিয়া পৌরশহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসাইন বন্ধুদের উদ্দেশে পুত্র এমশাদের লেখা সেই চিঠি হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কোনোদিন কল্পনাও করিনি বুকের ধন দুই মানিককে চিরতরে কেড়ে নেওয়া হবে। হে আল্লাহ, এখন আমি কাকে নিয়ে এই দুনিয়াতে বেঁচে থাকব। আমার আগে কেন আমার দুই ছেলেকে কেড়ে নিলে। আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না।’

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় একসঙ্গে দুই ছেলেকে হারানোর পর থেকে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন মা নার্গিস আক্তার। আত্মীয়-স্বজনেরা চেষ্টা করেও তাঁকে কিছুই খাওয়াতে পারছেন না। শুধু বলছেন, ‘আমার মানিকজোড়কে এনে দাও। আমার কি অপরাধ ছিল, এভাবে কেন তাদের কেড়ে নিল আল্লাহ।’

এমশাদ ও মেহরাবের চাচা ব্যবসায়ী জমির হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাতামুহুরী নদীর চরে দুই ভাইপোর জানাজা এবং কবরস্থানে দাফন শেষে বাড়িতে চলে আসি আমরা। এসেই দেখি আমাদের ভাবি (এমশাদ ও মেহরাবের মা) ছেলেদের বই-খাতা ঘাঁটছিল। এ সময় এমশাদের একটি খাতায় তার হাতের লেখা চিঠি পেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেন এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তখন দৌঁড়ে গিয়ে ভাবিকে উদ্ধার করতেই তাঁর হাতে পাই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার মতো সেই চিঠি। ওই চিঠি পড়ে আমরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।’

চকরিয়া গ্রামার স্কুল পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক হারুণুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পিইসি ও জেএসসির ফলাফলে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে বিদ্যালয়ের সুনাম বয়ে এনেছিল আমিনুল হোসাইন এমশাদ। দুই পরীক্ষায় সে বৃত্তিও পেয়েছিল। তার ছোট ভাই মেহরাব হোসাইনও পড়ালেখায় বেশ মেধাবী।’

কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সমবেদনা : মাতামুহুরী ট্র্যাজেডিতে নিহত আমিনুল হোসাইন এমশাদ ও মেহরাব হোসাইনের বাবা-মাসহ পরিবার সদস্যদের সমবেদনা জানাতে চকরিয়া পৌরশহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসাইনের স্টেশনপাড়াস্থ বাড়িতে যান কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। এ সময় তিনি পরিবার সদস্যদের সমবেদনা জানান। গতকাল সোমবার রাত আটটার দিকে তিনি আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাত, চকরিয়া থানার ওসি মো. বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ও চকরিয়া পৌরশহর চিরিঙ্গার আনোয়ার হোসাইনের দুই ছেলে আমিনুল হোসাইন এমশাদ এবং অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও পৌরশহরের হাসপাতাল পাড়ার মো. শওকত আলীর  ছেলে ফরহাদ বিন শওকত, চকরিয়া গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইয়্যিদ জাওয়াদ আর্ভি ও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জলি ভট্টাচার্য ও কক্সবাজার সদরের ব্যবসায়ী কানু ভট্টাচার্যের ছেলে তুর্ণ ভট্টাচার্য মাতামুহুরীর চরে ফুটবল খেলা শেষে নদীতে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে আটকে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয় নদীতে তল্লাশি চালিয়ে।



মন্তব্য