kalerkantho


বন্যা : কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বন্যা : কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি

ফেনীর মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে বণিকপাড়া গ্রামে (বামে) এবং চকরিয়ার কাকারায় মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়কের এবড়োখেবড়ো অবস্থা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গতকাল বুধবার বন্যা পরিস্থিতির কোথাও উন্নতি হয়েছে, কোথাও আরো অবনতি হয়েছে। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধির পাঠানো খবরে :

চকরিয়ায় লণ্ডভণ্ড সড়ক :  সমতল এলাকা থেকে পানি নেমে যেতে শুরু করছে। ভেসে ওঠছে রাস্তাঘাটের ক্ষতচিহ্ন। বন্যার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার গ্রামীণ অবকাঠামো। সরেজমিন দেখা গেছে, প্রপার কাকারা থেকে মেনিবাজার পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়ক, ছিকলঘাট-কৈয়ারবিল সড়ক, চিরিঙ্গা-বরইতলী-মগনামা সড়ক, চিরিঙ্গা-জনতা মার্কেট-বেতুয়াবাজার সড়ক, পৌরসভার আবদুল বারী পাড়া সড়কের অবস্থা বেশি করুণ। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এসব সড়ক।

কাকারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত ওসমান জানান, লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

চকরিয়া-পেকুয়া উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান চৌধুরী মানিক বলেন, ‘বন্যার পানি পুরো কৈয়ারবিলকে আঘাত করেছে। সড়কগুলো বড় বড় গভীর খাদে পরিণত হয়েছে।’

এলজিইডি চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী রণি সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো পুরোপুরিভাবে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে পানি নেমে যায়নি। একদিকে নামছে আবার ভাটির দিকের ইউনিয়নগুলোতে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই সমতল ইউনিয়নগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো যাতে অতি দ্রুত চলাচল উপযোগী করা যায় সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রেরণ করা হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক তথা গ্রামীণ অবকাঠামো যাতে অতি দ্রুত চলাচল উপযোগী করা যায় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি।’  

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘দুই বছর আগে সংঘটিত কয়েকদফা ভয়াবহ বন্যায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো যথাযথভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করায় মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল। কিন্তু এবারের বন্যার প্রথম ধাক্কায় সেই সড়কগুলো ফের লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। তবে ঈদের পর পরই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চলাচল উপযোগী করতে যথাসাধ্য চেষ্টা থাকবে। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রী পর্যন্ত তদবির করব।’

বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি : মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টিপাত থেমে যাওয়ায় বান্দরবান পার্বত্য জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। বুধবার প্রায় পুরো স্বাভাবিক হয়ে গেছে জনজীবন।

বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বাজালিয়া অংশ থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে। ফলে বুধবার সকাল থেকে এ সড়কে সরাসরি যানবাহন চলাচল করছে।

জেলা পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়ায় বান্দরবান বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রীবাহী বাস এবং মালবাহী ট্রাকসহ সব ধরনের গাড়ি ছাড়ছে। এদিকে বান্দরবান-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের বালাঘাটা স্বর্ণমন্দির এলাকায় ডুবে যাওয়া ডাইভারশন সড়ক  থেকে পানি নেমে যাওয়ায় ওই সড়ক দিয়েও যানবাহন চলাচল করছে।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন জানিয়েছেন, বর্ষণ থেমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি ঘটলেও যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সার্বক্ষণিক সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

দীঘিনালায় অবনতি : খাগড়াছড়ি জেলা সদরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এখনো পুরো জেলায় দেড় হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে এ পর্যন্ত ২১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া ও নদী-ছড়া দখলকারীদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাগড়াছড়ি প্রশাসন।

সোমবার দিবাগত রাতের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি সদরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পৌরসভা ও জেলা সদরের কয়েক হাজার বাড়িঘরে পানি ওঠে। অবিরাম বর্ষণ কমে যাওয়ায় গতকাল বুধবার থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো মুসলিমপাড়া, খবংপুড়িয়া, কালাডেবা, গঞ্জপাড়ার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রয়েছে। চেঙ্গীনদীতে পানি ধীরে ধীরে কমছে।

সড়কের উপর পানি থাকায় মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি-ফেনী-ঢাকা সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলেও বুধবার সকাল থেকে যানবাহন চলাচল করতে শুরু করেছে। তবে, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। খাগড়াছড়ি-পানছড়ি, দীঘিনালা-লংগদু ও দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কে সরাসরি গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে।

ফেনী নদীতে পানি ফুঁসে ওঠায় জেলার রামগড়ের বিভিন্ন এলাকায় পানি ওঠেছে। সেখানে ৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন অন্তত ৩০০ পরিবার। ফেনী নদীর পানি কমছে খুব ধীরে। এখনো নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িগুলো পানির নিচে। রামগড়ের ফেনীরকূল এলাকায় রামগড়-ফেনী সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন মিয়া জানান, বন্যার্তদের জন্য প্রশাসন যথাসাধ্য সাহায্য করছে। শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় নেওয়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৫০ জনের মাঝে খিচুরি ও ডিম বিতরণ করেছে সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি সদর জোন। জোনের লে. আহসানের নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। উজানের পানি নেমে আসায় উপজেলার কোথাও কোথাও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলার মেরুং, ছোট মেরুং, হাসিনসনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার অন্তত ১৫টি উঁচু জায়গায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন দেড় হাজারের মতো মানুষ। পানি বৃদ্ধির কারণে দীঘিনালার অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি ওঠায় দীঘিনালার সাথে মেরুং, রাঙামাটির লংগদুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। কবাখালী এলাকায় সড়কে পানির কারণে বাঘাইছড়ি, সাজেকের সাথেও যানবাহন চলাচল করছে না।

মুহুরী নদীর ৪ স্থানে ভাঙন : ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজীতে অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে মুহুরী নদীর ৪ স্থানে ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ৭ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এগুলো হল ফুলগাজীর ঘনিয়ামোড়া, উত্তর দৌলতপুর, উত্তর বরইয়া, দক্ষিণ বরইয়া, পরশুরামের উত্তর শালধর, দুর্গাপুর ও বাঁশপদুয়া। মঙ্গলবার রাত থেকে মুহুরী নদীর পানি

বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, বুধবার সকাল থেকে ১৫.৭০ সেন্টিমিটারে মুহুরী নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগের রাতে ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল। মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের উত্তর শালধর গ্রামের মহসীন মেম্বারের বাড়ির পাশে এবং রাতে  দুর্গাপুর গ্রামের আবদুর রহমানের বাড়ির পাশে মুহুরী নদীর ২টি স্থানে ভাঙনের ফলে চিথলিয়া ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়।

চিথলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানান, শালধর ও দুর্গাপুর গ্রামে মুহুরী নদীতে দুটি স্থানে ভাঙনের কারণে চিথলিয়া ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারনে মুহুরী নদীর পানি বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মঙ্গলবার রাতে দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।

ফেনীস্থ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী কোহিনুর আলম জানান,  ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর ও বরইয়ায় দুটি অংশে বেড়িবাঁধে ভাঙনে ৫ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।

 



মন্তব্য