kalerkantho


বাসস্টেশন ফাঁকা, ট্রেনে ভিড় কম

ঈদ যাত্রায় বৃষ্টির থাবা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বাসস্টেশন ফাঁকা, ট্রেনে ভিড় কম

গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে মা-মেয়ের ট্রেনযাত্রা। ছবিটি গতকাল চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে তোলা। ছবি : রবি শংকর

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বন্দরনগর চট্টগ্রামে জনজীবন বিপর্যস্ত। কখনো গুঁড়ি-গুঁড়ি, কখনো হাল্কা আবার ভারি বৃষ্টিপাতে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগ মুহূর্তে মানুষের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শেষ নেই। নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং জেলার কয়েকটি সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভাঙাচোরা সড়ক। আছে বিভিন্ন সড়কে যানজট। এসব কারণে নানা দুর্ভোগের মাঝেও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে বাড়ি যাচ্ছে মানুষ।

তবে এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে বাস-ট্রেনের আগাম টিকিট সংগ্রহ করা মানুষের বাড়ি যাওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু অন্যবার রমজান ঈদের আগ মুহূর্তে বাড়ি যাওয়ার জন্য মানুষের যে স্রোত নামত তা এবার দেখা যাচ্ছে না। অনেক বাসস্টেশন গতকাল বুধবার ফাঁকা ছিল। সেই সঙ্গে রেলস্টেশনেও ভিড় কম ছিল। গতকালও দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি কমলে আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার মানুষের ঢল নামতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের কর্মকর্তা এবং আন্তজেলা ও জেলা পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদ সামনে রেখে ইতোমধ্যে মানুষের যাত্রা শুরু হলেও মানুষের তেমন ভিড় নেই। গত তিন-চার দিনে চট্টগ্রাম থেকে সোয়া এক লাখ থেকে দেড় লাখের মতো মানুষ বাস ও ট্রেনে বাড়ি গেছেন। প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি ছিল। এবার যাত্রী কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে শেষ দিকে এসে বৃষ্টিপাত। বৃষ্টিপাত না কমলে অনেকে বাড়ি নাও যেতে পারেন। এছাড়া সড়কের অবস্থাও তেমন ভালো না।

এই পর্যন্ত কতো মানুষ ঈদ উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি গেছে জানতে চাইলে আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সচিব মনোয়ার হোসেন বুধবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত (গতকাল) বিভিন্ন বাস স্টেশনে গিয়ে দেখেছি ভিড় নেই। বাস ফাঁকা-ফাঁকা। যাত্রী স্বাভাবিক। এখনো ঈদের ভিড় দেখা যাচ্ছে না। গত দুই/তিন দিন ধরে মানুষের যাওয়া শুরু হলেও তা অন্যবারের চেয়ে অনেক কম। বৃষ্টিতে বিভিন্ন জায়গায় পানি ওঠেছে। মহাসড়কে বিভিন্ন জায়গায় যানজট আছে। রাস্তা ভাঙা। এসব কারণে হয়তো এখনো সড়কপথে তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি জানান, বৃষ্টি কমলে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার সড়কপথে অনেকে যেতে পারেন। সব মিলে মনে হচ্ছে আগামী দুদিন সড়ক পথে লক্ষাধিক যাত্রী বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে লক্ষাধিক যাত্রী গেছেন সড়কপথে। কিন্তু গতবার সড়কপথে তিন থেকে চার লাখ মানুষ ঈদে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়িতে গেছেন।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী মঞ্জু বলেন, ‘চট্টগ্রাম-রাঙামাটি, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে পানি ওঠেছে। এতে ঈদ উপলক্ষে যানবাহন চলাচলে কিছুটা সমস্য হচ্ছে। তবে এখনো উত্তর চট্টগ্রাম এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লোকজন বাড়ি তেমন যাচ্ছে না। অন্যবার পবিত্র শবেকদরের দুয়েকদিন আগ থেকে মানুষের অস্বাভাবিক ভিড় থাকত অক্সিজেন অস্থায়ী বাসস্টেশনে। কিন্তু এবার তা নেই। মনে হচ্ছে টানা বৃষ্টির কারণে লোক কম যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যবার ঈদের আগের ৪/৫ দিন প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ অক্সিজেন থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে গেলেও এবার এখন পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাচ্ছে। বৃষ্টি কমলে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বাসস্টেশনে মানুষের ভিড় হতে পারে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় সড়কে ভাঙা ও কাদাপানি। এতে শুধু যাত্রী নয়, শ্রমিকদের গাড়ি চালাতে কষ্ট হচ্ছে। ঈদে বাড়ি যাওয়ার যাত্রীদের একটা বড় চাপ থাকে তা এখনো হয়নি। শনিবার ঈদ হলে আগের দুই দিন সড়ক পথে যাত্রীদের এই চাপ হতে পারে। তবে মহাসড়কে এখনো তেমন যানজট নেই।’

এদিকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে ১০ দিন আগে আমরা ট্রেনের যে আগাম টিকিট দিয়েছিলাম এর যাত্রা তিন দিন আগে শুরু হয়েছে। তবে সড়কের চেয়ে রেলপথে এবার বেশি চাপ থাকবে মনে করেছিলাম। আজকে (গতকাল) আগাম টিকিটের ৪র্থ দিনের যাত্রা চলছে। কিন্তু তেমন ভিড় নেই। বৃহস্পতি ও শুক্রবার ট্রেনে যাত্রীর ভিড় হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম এবার ঈদে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে লক্ষাধিক মানুষ ট্রেনে করে বাড়ি যেতে পারে। আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। দেখা যাচ্ছে ঈদের ৬ দিনের আগাম টিকিটের যাত্রার প্রথম তিন দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী গেছেন। বুধবার ১৬-১৭ হাজার যেতে পারেন। সব মিলে এবার ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ৮০/৮৫ হাজার যাত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে পারেন। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ভিড় বেশি হবে। শুক্রবার চাঁদ দেখা না গেলে ওই দিন শনিবারের টিকিট দেওয়া হবে।’

আগামীকাল শুক্রবার চাঁদ দেখা গেলে পরদিন শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর চাঁদ দেখা না গেলে রবিবার ঈদ। কিন্তু ঈদের আগ মুহূর্তে এসে বৃষ্টির কারণে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে ঈদ উপলক্ষে বাড়ি যাওয়াদের। কিন্তু এর পরও থেমে নেই সড়ক, রেল, আকাশ ও নৌপথে যাত্রা। তবে এবারও সড়ক ও রেলপথেই প্রায় মানুষ বাড়ি যাচ্ছেন। নানা দুর্ভোগ ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারা মানুষের চোখে মুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক।

এ কে খান মোড়ে শ্যামলী বাসে ঢাকায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন বেশ কয়েকজন। কেউ পরিবার নিয়ে আবার কেউ একা। কেউ যাচ্ছেন বন্ধুর সঙ্গে। তাঁদের একজন ফরহাদ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ঈদ করব। মঙ্গলবার বিকেলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে যেতে পারিনি। তাই আজকে (বুধবার) যাচ্ছি। শুলকবহর বাসার সামনে পানি। পানি ভেঙে হেঁটে রাস্তায় এসে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে এখানে এসেছি। একটু কষ্ট হলেও বাড়ি যাচ্ছি তাতে ভালো লাগছে।’

ওই এলাকায় সৌদিয়া বাসের জন্য দাঁড়ানো জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তিন বন্ধু এবার এক সঙ্গে বাড়ি (রংপুর) যাচ্ছি। প্রথমে ঢাকা যাব। সেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে আবার বাসে করে বাড়ি যাব। বাড়িতে সবাই এক সঙ্গে ঈদ করব।’

শুধু তাঁরা নন, গতকাল নগরের বিভিন্ন বাসস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেকে বাড়ি যাচ্ছেন। তবে এখন সড়কে যানজট না থাকায় যথাসময়ে বাস চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। আবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঈদ উপলক্ষে মানুষ চট্টগ্রাম আসছেন। দূরপাল্লার বাসে চট্টগ্রাম এসে আবার অনেকে তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসছে নগর। আবার অনেকে শহরেও ঈদ করবেন। এছাড়া চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আগের তিন দিনের তুলনায় গতকাল বুধবার বিভিন্ন ট্রেনে ভিড় একটু বেড়েছে। বিকেলে চাঁদপুরগামী আন্তনগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনে ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। অনেকে ওই ট্রেনের ছাদে বসেও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

 



মন্তব্য