kalerkantho


ধরা পড়লে বড়জোর শাস্তি হয় বদলি-প্রত্যাহার

হাইওয়ে পুলিশের ইয়াবা কারবার!

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



সীতাকুণ্ডে হাইওয়ে পুলিশের অনেক সদস্য ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। অভিযানে জব্দ ৬৬ লাখ টাকার ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে গত শুক্রবার বারআউলিয়া থানার দুই উপপরিদর্শকসহ মোট পাঁচজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগে ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯০ লাখ টাকার ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনায় কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ছয়জনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডে হাইওয়ে থানা পুলিশের অভিযানে প্রায়ই ইয়াবার চালান জব্দ হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে জব্দ করা ইয়াবার প্রকৃত সংখ্যা গোপন রেখে নামমাত্র সংখ্যা প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক মাসে সীতাকুণ্ড উপজেলার বারআউলিয়া ও কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ১১ সদস্য ইয়াবা কেলেংকারিতে জড়িয়ে শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ৮ থেকে ১১ মে পর্যন্ত বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার দুই উপপরিদর্শক ও তিন কনস্টেবলকে বদলি করা হয়েছে।

৭ মে রাত ৯টায় সীতাকুণ্ডের মাদামবিবিরহাট এলাকার মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছিলেন বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া ও সঙ্গীয় ফোর্স। তাঁর কাছে গোপনে খবর আসে শ্যামলী পরিবহনের বাসে (চট্টমেট্রো-ব-৫১-২১৫৫) ইয়াবার বড় চালান যাচ্ছে। তিনি বাসটিতে তল্লাশি চালালে ২১ হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ বহনকারী মো. মোস্তাকিন (৩৬) ধরা পড়েন। কিন্তু পুরো ঘটনাটি চেপে যান মহিউদ্দিন ও তাঁর সঙ্গীরা। সবাই মিলে জব্দ করা ৬৬ লাখ টাকার ইয়াবার চালানটি আত্মসাৎ করতে পাচারকারী মোস্তাকিনকে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এদিকে মোস্তাকিন যে ইয়াবা পাচার করছিল সেই খবর আগেই জানত মাদক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তাঁরা ঢাকায় তাঁকে পুনরায় আটক করেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো ইয়াবা না পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মোস্তাকিন স্বীকার করেন, বারআউলিয়া থানা পুলিশ ইয়াবা রেখে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। একথা জানার পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লার এসপি মো. নজরুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপর ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয় ইয়াবা পাচারকারী মোস্তাকিনকে। থানায় এনে তাঁকে এসআই মহিউদ্দিনের মুখোমুখি করা হলে তিনি মহিউদ্দিনকে এবং সেদিন যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাঁদেরকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় এসআই মহিউদ্দিনকে সাসপেন্ড এবং এসআই আদম আলী, কনস্টেবল মামুন, ইমাম হোসেন ও মোস্তফাকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে ১৫ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৩০ হাজার ইয়াবা আত্মসাতের চেষ্টা প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তিমূলক বদলি করা হয় সীতাকুণ্ডের কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সার্জেন্ট মো. জাহাঙ্গীর আলম, এটিএসআই মো. জামশেদ, কনস্টেবল মো. অলি উল্লাহ, মো. আনোয়ার, মো. সাজেদুল ইসলাম ও মো. গোলাম কবিরকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৫ ডিসেম্বর রাত আড়াইটার দিকে কুমিরা পুলিশ ফাঁড়ির এটিএসআই জামশেদ আলমের নেতৃত্বে পুলিশ জোড়ামতল যাত্রীছাউনির সামনে থেকে ঢাকামুখী একটি পিকআপ ভ্যান (ঢাকামেট্রো-ন-১৭-৩২৩২) গতিরোধ করে ৩০ হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ দুই পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে আসে। পরে কাভার্ড ভ্যানসহ তাঁদেরকে ফাঁড়িতে একরাত আটকে রাখা হয়। দেনদরবার শেষে পরদিন সংশ্লিষ্টরা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে আসামিদের ছেড়ে দেন। এভাবেই ধরা পড়া ইয়াবার অনেক চালান বিক্রি করে দিচ্ছে খোদ পুলিশই। আর অল্পদামে এসব ইয়াবা পেয়ে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে কিছু পুলিশ সদস্য।

বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘৭ মের ইয়াবা কেলেংকারির ঘটনার আগে বা পরে এ ধরনের আর কোনো ঘটনার কথা আমি জানি না।’ ৭ মের ঘটনার পর কেউ যাতে এসব করতে না পারে সেদিকে নজর রাখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা কেউ করলে কর্তৃপক্ষ তাকে যে ছাড় দেয় না তা তো প্রমাণিত।’

ওসি জানান, ইয়াবা নিয়ে সৃষ্ট ঘটনায় কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি পাঁচজনকে প্রত্যাহার করেছে। এসব ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে থাকে।

কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইয়াবা কেলেংকারি ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লার এডিশনাল এসপি মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘১৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনার তদন্তে ওই ফাঁড়ির ইনচার্জ সার্জেন্ট জাহাঙ্গীরসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল।’ তবে ৭ মে বারআউলিয়ায় সংঘটিত ঘটনার সময় তিনি ছুটিতে থাকায় এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।

বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার এসআই মহিউদ্দিনকেও ইয়াবা জব্দে নিয়ম লঙ্ঘন করায় সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে ঘটনার রাতে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লার এসপি মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে গত শুক্রবার একই ঘটনায় আরো চারজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এভাবে হাইওয়ে পুলিশ ইয়াবা কারাবরে জড়িয়ে পড়ছে কেন?-জানতে চাইলে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি এসপি মো. নজরুল।


মন্তব্য