kalerkantho


বাঁশখালী উপকূলে সরকারি জমি বিক্রির চেষ্টা!

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



জেলা প্রশাসনের নীরবতার সুযোগ নিয়ে এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সহায়তায় বাঁশখালী উপজেলার একটি চক্র প্রায় ৯০ একর সরকারি জমি বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে! চক্রটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশ গোপন রেখে উপজেলার খুদুকখালী মৌজার ছনুয়া উপকূলীয় এলাকায় এসব জমি বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে এসব সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে গত বছরের ২২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশ কার্যকর করার জন্য গত ১১ মার্চ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবরে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরও জমি উদ্ধারে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

জানা গেছে, বাঁশখালী উপজেলার খুদুকখালী মৌজার সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি নারিকেলবাগান করার শর্তে বিভিন্ন দাগে ৯০ একর জমি ২৫ বছরের জন্য ইজারা নেন ‘ফ্রেন্ডস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ওই জমি ভূমি জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে শীর্ষ মোহাম্মদ ও বসির আহমদ ইজারা নেন। ১৯৬৬ সালে ইজারা নেওয়া জমিতে নারিকেলবাগান না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লবণমাঠ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করেন। ইজারার শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগে জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ১৯৬৭ সালেই জমির ইজারা বাতিল করেন। জেলা প্রশাসনের ইজারা বাতিল নির্দেশের বিরুদ্ধে ইজারা গ্রহীতারা ভূমি আপিল বোর্ডে আপিল করেন। ভূমি আপিল বোর্ড ইজারাদারকে লবণমাঠ না করে নারিকেল বাগান করার নির্দেশ দিয়ে ইজারা বহাল রাখেন।

জমি ইজারা রক্ষা ও জমির মালিকানা নিজেদের করে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় নানান ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয় ফ্রেন্ডস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন মালিকপক্ষ। তারা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা আরডিসির স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে জমির স্থায়ী বন্দোবস্তির খতিয়ানও সৃষ্টি করে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অবহিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে সরেজমিন তদন্ত করা হয়।

ফ্রেন্ডস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন মালিকপক্ষ কর্তৃক জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে ওঠে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ১৯৮৭ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার মো. পারভেজ মজুমদার ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠান। 

এর পর সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ভূমিসংস্কার কমিশনের একজন উপসচিব স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে পাঠানো হয়।

চিঠিতে জালিয়াতির মাধ্যমে জমির খতিয়ান ও হোল্ডিং সৃষ্টি করার কারণে জমির ইজারা বাতিল এবং যারা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তৎকালীন দুর্নীতি দমন বিভাগে বিষয়টি জানানোর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে ইজারা প্রদত্ত ভূমির অতিরিক্তসহ বন বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী এসব জমি বন বিভাগকে হস্তান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাব জরুরিভিত্তিতে নথিভুক্ত করার জন্য এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৯৮৮ সালের ৬ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবরে পাঠানো হয়।

বাঁশখালী খুদখালী মৌজার বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি ইজারা দেওয়া ও বাতিল নিয়ে বিভিন্ন সময় ইজারাদার ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়। শেষপর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারি জমির ইজারা বাতিল করে জেলা প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়ে উক্ত জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ দেন।

এদিকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নিজেদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ৮ মাস অতিবাহিত হলেও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে এসব জমি উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে সোমবার দুপুরে টেলিফোনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত আছি। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



মন্তব্য