kalerkantho


হানিফ গ্রেপ্তারের পর খুলে গেল

চার হত্যা মামলার জট অন্তরালে অস্ত্রদাতা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চার হত্যা মামলার জট অন্তরালে অস্ত্রদাতা

নগরের সদরঘাট ও কোতোয়ালী থানা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ২০১৩ সাল থেকে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি এতোদিন। সম্প্রতি মোটা হানিফ নামে একজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দাবি করছে, ওই চার খুনের সঙ্গে সে জড়িত। কিন্তু হানিফ কোথায় অস্ত্র পেত?-এমন প্রশ্নের জবাব পুলিশ পেলেও অস্ত্র সরবরাহকারী ‘বড় ভাই’ এর নাগাল পায়নি পুলিশ।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গ্রেপ্তারকৃত হানিফ দাবি করেছে, সে হত্যাকাণ্ডের আগে অস্ত্র আনত মাদারবাড়ি এলাকার জহির উদ্দিন বাবর নামে একজনের কাছ থেকে।

জানা গেছে, জহির বাবর সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই পুলিশ তাকে ধরে না। জহিরের অস্ত্রভাণ্ডার আছে বলে পুলিশও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু জহিরকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেই। শুধু খুনের মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করেই পুলিশ স্বস্তিবোধ করছে!

চার হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ও এজহারভুক্ত আসামি হানিফকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নেজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হানিফ ও তার সহযোগী ফোরকানকে গ্রেপ্তারের পর চারটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য বের করা সম্ভব হয়েছে। হানিফ চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’

হানিফ ও তার সহযোগী ফোরকান দুজনই কুমিল্লা জেলার অধিবাসী হলেও চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করত। তবে গত শুক্রবার রাতে ঢাকা থেকে হানিফকে এবং কুমিল্লা থেকে ফোরকানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চার খুনের জট : হানিফের নেতৃত্বে চার খুনের ঘটনা ঘটে নগরে। কিন্তু খুনের প্রধান আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় মামলার তদন্ত শেষ করা যায়নি। এ অবস্থায় হানিফ পুলিশকে জানিয়েছে, সে ২০১৩ সালে সদরঘাট থানার শাহজাহান হোটেলের সামনে গণি হত্যাকাণ্ড, ২০১৬ সালের মামুন, জাহিদ ও ইদ্রিস হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আর তার সহযোগী ফোরকান ইদ্রিস হত্যায় জড়িত।

হানিফ পুলিশের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, কিছু দিন আগেও সে নগরে ছিল। পরে সে পালিয়ে ঢাকা চলে যায়। একের পর এক খুন কেন করছে?-পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে হানিফ দাবি করেছে, এলাকার আধিপত্য ও পূর্ব শত্রুতার জেরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ধরাছোঁয়ার বাইরে অস্ত্রদাতা : পুলিশের দাবি হানিফ ঠাণ্ডা মাথার ভাড়াটে খুনি। এ কারণে সে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হানিফকে গ্রেপ্তার করায় চার খুনের ঘটনার জট খুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে সদরঘাট থানার ইদ্রিস, জাহিদ ও মামুন হত্যাকাণ্ড। এছাড়া কোতোয়ালী থানার মামুন হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত আসামি হানিফ।

কোতোয়ালী থানার মামুন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. নূরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হানিফ এজহারভুক্ত আসামি। তাকে মামুন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

পুলিশ কর্মকর্তারা হানিফকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি দাবি করলেও হানিফের অস্ত্রদাতার সন্ধান করছে না। নগরের সদরঘাট থানার মাদারবাড়ি এলাকার সাহেবপাড়ার বাসিন্দা জহির উদ্দিন বাবরই হানিফকে অস্ত্র সরবরাহ করত বলে হানিফ দাবি করেছে। কিন্তু জহিরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। তার অস্ত্রভাণ্ডারে কী পরিমাণ অস্ত্র আছে, সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণাও দিয়েছে হানিফ। এরপরও জহির উদ্দিন বাবরকে গ্রেপ্তার বা অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ নেই।

হানিফের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কিনা?-এমন প্রশ্নের জবাবে সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নেজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৩ সালের একটি এবং ২০১৬ সালের তিনটি হত্যাকাণ্ডের ক্লু বের হয়েছে হানিফকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। শুক্রবার রাতেই অভিযান শেষ হয়েছে। শনিবার তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। হানিফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের দায় স্বীকার করেছে। এখন অস্ত্রের বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।’

আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হানিফ  অস্ত্রদাতা হিসেবে জহির উদ্দিন বাবরের নাম প্রকাশ করেছে জানানোর পর ওসি বলেন, ‘আমাদের আগে তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করতে হবে। এরপরই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জহির উদ্দিন বাবর সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার কাছে একাধিক ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র আছে বলে হানিফ ও ফোরকান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। কিন্তু পুলিশই জহিরকে ধরতে উদ্যোগ নেয়নি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এলাকার নিয়ন্ত্রণ তো হানিফ বা ফোরকানের দরকার পড়ে না। তারা ভাড়াটে খুনি। দরকার পড়ে বড় ভাইদের। সদরঘাটের বড় ভাইদের একজন জহির উদ্দিন বাবর। হানিফ ও ফোরকান দুজনই পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বড় ভাই সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিয়েছে। কিন্তু পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারে তাত্ক্ষণিক অভিযান না চালিয়ে কৌশলে অস্ত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কথিত ওই বড় ভাইকে।’


মন্তব্য