kalerkantho


যাত্রা শুরু জাহাজ ভাঙা শিল্প দিয়ে

দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল এখন সীতাকুণ্ড

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। এলাকাটি হয়ে উঠেছে এখন দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। বিশেষ করে গত এক দশকে এখানে স্থাপিত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর একাধিক প্রতিষ্ঠান, যা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার সীতাকুণ্ড উপজেলা। চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তিতা, শ্রমিকের সহজলভ্যতা, জমির পর্যাপ্ততা, পাহাড়, মনোরম প্রকৃতিসহ শিল্প স্থাপনের উপযুক্ত পরিবেশের কারণে এ উপজেলা বহু আগেই শিল্প উদ্যোক্তাদের নজরে পড়ে। ফলে এখানে ফিবছর নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এলাকাবাসী জানায়, ১৯৬০-এর দশকে এখানে গড়ে উঠেছিল দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙা শিল্প। উপজেলার ফৌজদারহাটে ঝড়ে ভেসে আসা কুইন আল-পাইন নামের একটি জাহাজ ভাঙার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে এ শিল্পের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে এখানে দেড় শতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙা হয়। এ শিল্প থেকে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার। এ ছাড়া দেশের নির্মাণশিল্পের অন্যতম সরঞ্জাম রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহাসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু সরঞ্জাম পাওয়া যায় এ শিল্প থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখানে কাজ করছে অর্ধলক্ষ শ্রমিক।

গত এক দশকে সীতাকুণ্ডে নতুন করে যোগ হয়েছে আরো বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে অন্যতম বসুন্ধরা গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, জিপিএইচ গ্রুপ, বিএম গ্রুপ, কেএসআরএমসহ আরো বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্প গ্রুপের ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান নির্মাণাধীন রয়েছে বারৈয়াঢালা, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে। এ ছাড়া মুরাদপুর সাগর উপকূলে নতুন সমুদ্রবন্দর স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা এখন দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সূত্র মতে, সীতাকুণ্ডে শিল্পের অতি দ্রুত বিকাশের কারণে বেশ কয়েক বছর আগেই এ উপজেলাকে অকৃষি ভূমি উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। যেভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটছে তাতে আগামী এক দশকে সমগ্র উপজেলাটি শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সরেজমিনে শিল্পের এই ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি উপজেলার নির্বিতব্য শিল্পাঞ্চল বাড়বকুণ্ড সাগর উপকূল ঘুরে দেখা গেছে, এখানে অন্তত ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে। তার মধ্যে একটি পুরোদমে উত্পাদন শুরু করেছে। আরো পাঁচটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। অবশিষ্টগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, বাড়বকুণ্ডে বেশির ভাগই গ্যাস বিপণন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। বিদেশ থেকে গ্যাস এনে প্রতিষ্ঠানগুলোর রিজার্ভারে সঞ্চিত রেখে তা থেকে গ্যাস বোতলজাত করে সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাড়বকুণ্ড ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী বলেন, ‘সমগ্র উপজেলার মতো বাড়বকুণ্ডেও ব্যাপক হারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এখানে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে তেমনই গড়ে উঠছে ছোট ও মাঝারি অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও। সরকার সব সময় শিল্প স্থাপনে বিশ্বাসী। তাই আমিও এসব উদ্যোক্তাকে শিল্প স্থাপনে সহযোগিতা করছি। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে।’ মুরাদপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহেদ হোসেন বাবু বলেন, ‘মুরাদপুরে যদি বন্দর স্থাপন করা হয় তা শুধুই সীতাকুণ্ডের নয়, সমগ্র দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। এই প্রক্রিয়াকে আমিও সহযোগিতা করতে চাই।’ সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন বলেন, ‘আমি নিজেও শিল্প উদ্যোক্তা। তাই শিল্পকে সব সময় উৎসাহিত করি আমি। সীতাকুণ্ডে যেখানে যে যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে সবগুলোকেই আমরা সহযোগিতা করে দেশের অর্থনীতিকে আরো মজবুত করতে চাই।’ তিনি মনে করেন, সবার উচিত শিল্প উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।



মন্তব্য